ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

আস্থার সেতু ভাঙল কোথায়

আস্থার সেতু ভাঙল কোথায়
×

ফাইল ছবি

জুয়েল হাসান

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:১৯

রাষ্ট্র মানে শুধু ইট-পাথরের দালান, প্রশাসনিক কাঠামো বা সংবিধানের কালো অক্ষর নয়। রাষ্ট্র মানে মানুষের বিশ্বাস, আস্থার সূক্ষ্ম সেতু, যেটি নাগরিক আর শাসকের মাঝে অদৃশ্য অথচ শক্ত বন্ধন তৈরি করে। এই আস্থা ভেঙে গেলে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নিছক এক প্রাতিষ্ঠানিক দেহ, যেখানে প্রাণ আছে কিন্তু হৃদস্পন্দন নেই। একটা শিশুর মতো কল্পনা করা যাক, সে ভরসা করে মায়ের কোলেই আশ্রয় খোঁজে, অথচ যদি হঠাৎ সেই কোলে নিরাপত্তা না পায়, তবে তার পৃথিবী ভেঙে পড়ে। রাষ্ট্র আর নাগরিকের সম্পর্কও সেই রকম– রাষ্ট্র যেন এক বিশাল মাতৃকোল, আর নাগরিকেরা সেই কোলের সন্তান। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কোথায় ভেঙে গেল সেই আস্থার সেতু?

আমাদের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, মানুষ স্বপ্ন বুনেছে স্বাধীনতার, ন্যায়বিচারের, সমতার। কিন্তু স্বপ্নের আকাশে উড়তে চাওয়া পাখি বারবার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে। রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে গণতন্ত্রের, কিন্তু নাগরিক পেয়েছে শাসনের কঠিন চাবুক। রাষ্ট্র বলেছে সুশাসনের কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে দুর্নীতি, বৈষম্য আর অবিশ্বাসের আগুন। তখনই নাগরিকদের অন্তরে প্রশ্ন জাগে, যে সেতু দিয়ে আস্থা ্রবাহিত হওয়ার কথা ছিল, সে সেতু কি ভেঙে গেছে? এই প্রেক্ষাপটেই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে– রাষ্ট্র ও নাগরিক: আস্থার সেতু কোথায় ভেঙে গেল? এটা শুধু কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং এক গভীর মানবিক অনুসন্ধান।

রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সামাজিক চুক্তি। ইতিহাসে দার্শনিক রুশো, হবস কিংবা লক, যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে নাগরিকের সম্মিলিত চাহিদা থেকে। মানুষ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার জন্য রাষ্ট্র নামের কাঠামো তৈরি করেছে। তাই রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই তাত্ত্বিক আদর্শ বহু ক্ষেত্রেই ভেঙে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। স্বাধীনতার পর জনগণ চেয়েছিল ন্যায়ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র, যেখানে দুর্নীতি, বৈষম্য আর দমননীতি থাকবে না। কিন্তু সময়ের প্রবাহে নাগরিকদের প্রত্যাশা বারবার ভেঙে গেছে। গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কার্যত দেখা গেছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, দলীয় স্বার্থ, দুর্নীতি আর জবাবদিহির অভাব। আস্থার সেতু ভাঙার বড় কারণগুলো কয়েকটি দিক থেকে বোঝা যায়।

দুর্নীতি ও বৈষম্য: কর দিয়ে নাগরিক দেখে সেই টাকায় ক্ষমতাবানদের বিলাসিতা গড়ে ওঠে।  ন্যায়বিচারের অভাব: দুর্বল অপরাধী শাস্তি পায়, কিন্তু শক্তিশালী অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা: ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হলে নাগরিকের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। সেবার ঘাটতি: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, রাস্তা-সবক্ষেত্রেই ব্যর্থতা আস্থা ধসায়। এমন অবস্থায় নাগরিক রাষ্ট্রকে আর মাতৃস্বরূপ মনে করে না, বরং দূরের এক যন্ত্র মনে করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রও অভিযোগ তোলে, মানুষ আইন মানে না, দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। এই দ্বন্দ্বে সম্পর্ক ভেঙে যায়। তবে ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্র যখন আন্তরিকভাবে নাগরিকের পাশে দাঁড়িয়েছে, দুর্যোগে সেবা দিয়েছে, তখনই আস্থার সেতু আবার গড়ে উঠেছে। তাই এ সম্পর্ক ভাঙন সত্ত্বেও পুনর্গঠন সম্ভব।

কোনো নদী তার স্রোত হারালে যেমন শুকিয়ে যায়, তেমনি রাষ্ট্র তার আস্থার স্রোত হারালে শুকিয়ে যায় মানুষের বিশ্বাস। অথচ রাষ্ট্রের আসল শক্তি অস্ত্র বা সম্পদ নয়, আসল শক্তি হলো মানুষের আস্থা। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রকে স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও মানবিক হতে হবে। নাগরিককে পেতে হবে সেবা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা। অন্যদিকে নাগরিককেও দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে ভালোবাসার, রক্ষার। কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছেন, মানুষের কাছে ফিরে আসতে হবে, মানুষের কাছে যেতে হবে। রাষ্ট্র যদি মানুষের কাছে ফিরে আসে, নাগরিকও রাষ্ট্রকে বুকে টেনে নেবে। আর তখনই আমরা বলতে পারব রাষ্ট্র ও নাগরিক: আস্থার সেতু ভাঙেনি, বরং দৃঢ় হয়ে আছে হৃদয়ের গভীরে।

জুয়েল হাসান: প্রকৌশলী 
 

আরও পড়ুন

×