সমাজ
শিক্ষাঙ্গনে অহং-ক্ষমতার যে রূপ দেখছি
ঈশিতা দস্তিদার
ঈশিতা দস্তিদার
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
অহংবোধ ও ক্ষমতার সম্পর্ক জটিল ও দ্বিমুখী। একদিকে ক্ষমতা অহংবোধকে শক্তিশালী করতে পারে, কারণ এটি ব্যক্তিকে আত্মসম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি দেয়; যা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীনও হতে পারে। অন্যদিকে শক্তিশালী অহংবোধওয়ালা ব্যক্তিরা ক্ষমতা অর্জনের জন্য ক্রমাগত আগ্রহী হয়ে ওঠে; যা অন্যদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য বিস্তারে উৎসাহ দেয় তাদের।
উদাহরণ হিসেবে ডাকসুর নবনির্বাচিত সদস্য সর্বমিত্র চাকমার কথা ধরা যাক। তিনি এসেছেন এমন এক জনপদ থেকে, যেখানে বহু বছর ধরে তাঁর জাতির মানুষেরা ভূমির অধিকার নিয়ে লড়ছেন। নিজ জনপদে ক্রমাগত উচ্ছেদ আতঙ্কে বসবাস করছেন তারা। অথচ সেই জনগোষ্ঠীরই সদস্য সর্বমিত্র ডাকসুর ‘সমাজসেবাবিষয়ক’ সম্পাদকের সহযোগী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছিন্নমূল হকার, দোকানদার, ভবঘুরেদের উচ্ছেদ করছেন। ডাকসু বা প্রক্টরিয়াল কমিটির এ উচ্ছেদ অভিযানের বৈধতা আছে কিনা, সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রক্টরিয়াল কমিটির এক সভার ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে জনৈক শিক্ষক ‘ছাত্র এবং কর্মচারী’র মধ্যকার বিভাজন স্পষ্ট করছেন, ছাত্রদের পক্ষাবলম্বন করে উচ্ছেদ অভিযানের পক্ষে ‘যৌক্তিক’ তর্কালাপ করছেন।
স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর দেশের সব সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সোচ্চার থেকেছেন, ব্যতিক্রম ছিল না গত বছরের জুলাইও। অথচ নবনির্বাচিত ছাত্র সংসদকে দেখা গেল না দেশের চলমান সংকট নিয়ে কথা বলতে। জনমত উপেক্ষা করে লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো রা নেই। দেশব্যাপী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজার-দরগায় হামলা-ভাঙচুর, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ, মোরাল পুলিশিং, বাউল-ফকিরদের জোরপূর্বক চুল-দাড়ি কর্তন অথবা অতিসম্প্রতি ঘটে যাওয়া মেট্রোরেলের অনাকাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড নিয়েও তাদের সোচ্চার হতে দেখা গেল না। অথচ ‘ঢাবিয়ান’ বা দেশের ‘সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের’ শিক্ষার্থী হিসেবে এক ধরনের অহংবোধের পরিচয় দিয়ে তাদের ভবঘুরের উদ্বাস্তু জীবন ও সংসারের ব্যক্তিগত সামগ্রীর ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে দেখা গেল।
ভবঘুরে, ছিন্নমূলদের তবে গোপনীয়তার দরকার নেই? নাকি গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত পরিসর দাবি করার মতো মানবিক যোগ্যতা তাদের নেই? জনবিচ্ছিন্ন এমন উচ্ছেদ অভিযান আসলে কাদের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, কেনইবা হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ পরিবেশ আনার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক উন্মুক্ততাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না তো?
প্রতিষ্ঠান, পরিবার, জাতি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ও মানুষকে ক্ষমতাবান করে তুলতে পারে। আবার উচ্চম্মন্যতার অহং; যা কিনা ব্যক্তিকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। সম্প্রতি আশুলিয়ায় ঘটে যাওয়া দুই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষ, ভাঙচুর, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনার সূত্রপাতের মূলেও রয়েছে এ অহংবোধ ও অসহনশীলতা। সামান্য থুতু নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল একটা গোটা ক্যাম্পাস। যারা হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর করে ক্যাম্পাসের সম্পদ বিনষ্ট করে, তারাও সবাই মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরেরই সন্তান। তারপরও তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, ছিন্নমূল হকার বা ভবঘুরেদের সঙ্গে বচসা, মারধর আর ভাঙচুরে লিপ্ত হচ্ছে।
ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে থাকে না, বরং এটি সমাজের সর্বত্র বিদ্যমান। এক বছর ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং চলমান ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’ অবস্থার সঙ্গে ঘটমান বাস্তবতা ও সহিংসতার যোগসূত্র সহজেই অনুমেয়। মননে আমরা প্রত্যেকেই শাসনকর্তা হয়ে উঠছি, প্রবল আত্মঅহং আমাদের ভিন্ন মত, সংস্কৃতি, ধর্ম, জাতি, ভাষা সবকিছুর ব্যাপারে অসহিষ্ণু করে তুলছে। আমরা পরস্পর পরস্পরকে অস্বীকার করতে চাই, দেখেও না দেখার ভান করি বা এড়িয়ে চলি। এভাবে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছি, অসহনীয় হয়ে উঠছে আমাদের জীবনযাপন।
ক্ষমতার ধারণা, সম্পর্ক এবং প্রয়োগ ব্যক্তির অহংকে দেখার মনন তৈরি করে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো দেখিয়েছেন, কীভাবে ‘শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা’ শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তা গঠনে ভূমিকা রাখে, যা ক্ষমতাকে অদৃশ্যভাবে সমাজের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করে। হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে সব হকার, ভবঘুরেদের ঢালাওভাবে মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকচক্রের অংশ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে তাদের ‘নির্মূল’ করার আহ্বান জানানো আসলে ক্ষমতার ধারণা ও চর্চাকেই উপস্থাপন করে। এ ছাড়া কিছুদিন পরপর রাষ্ট্রকৃত উচ্ছেদ অভিযানগুলোও (নিউমার্কেট এলাকায় হকার উচ্ছেদ, ব্যাটারিচালিত মোটররিকশা উচ্ছেদ) এ কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার জন্ম দিতে পারে, নয় কি?
ক্ষমতা এবং জ্ঞান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং ফুকোর মতে, ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র (যেমন রাষ্ট্র) থেকে আসে না, বরং এটি সমাজের সকল স্তরে এবং সম্পর্কের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। ক্ষমতা হলো একটি সম্পর্ক, যা ক্রমাগত প্রযুক্ত হচ্ছে এবং এটি কোনো একক সত্তার সম্পত্তি নয়। ক্ষমতা নির্দিষ্ট জ্ঞান তৈরি করে এবং এই জ্ঞানকে ব্যবহার করে ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো আরও বলেন, ক্ষমতা ব্যক্তির শরীর এবং মনের ওপর সরাসরি কাজ করে। শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতা যেমন স্কুল বা কারাগারে, শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যাসের মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণ ও অহংকে নির্দিষ্ট পথে চালিত করে, আবার এর ফলে ব্যক্তি নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখতে শুরু করে। প্রত্যেকেই আমরা ক্ষমতার অংশ হতে চাই এবং তার চর্চা করি, যে কোনো উপায়ে যে কোনো পরিসরে। জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়ে নিজভূমি থেকে স্থানচ্যুত মানুষেরাও যখন উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হয়ে যায়, তখন নিপীড়িতের নিপীড়ক হয়ে ওঠার ক্লেশ বোধগম্য হয়। তবে ফুকো এও বলেছেন, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে প্রতিরোধও অবশ্যম্ভাবী।
ড. ঈশিতা দস্তিদার: নৃবিজ্ঞানী ও লেখক
- বিষয় :
- সমাজ
- ঈশিতা দস্তিদার
- শিক্ষাঙ্গন
- ক্ষমতা
