শিক্ষাঙ্গন
বিদ্যালয়ে গান না রাজনীতি?
আদনান মনোয়ার হুসাইন
আদনান মনোয়ার হুসাইন
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের স্কুলগুলোয় আসলে কী থাকবে? লেখাপড়া যতটুকু যেমন আছে তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আর কী রাখতে চাই? আমাদের সন্তানেরা সংগীত শিখবে, নাকি রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিনবে, সাধারণ শরীরচর্চা শিখবে, নাকি মার্শাল আর্ট ও আগ্নেয়াস্ত্র চালানো শিখবে? অপশনগুলো উদ্ভট মনে হলেও খুব কাছাকাছি সময়ে কিছু ঘটনা, কিছু সিদ্ধান্তে এমন প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে দুজন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। গত ২৮ আগস্ট সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের নতুন বিধিমালা জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর মাঠে নামে ধর্মভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। তারা সংগীত শিক্ষকের পদ বাতিলের দাবি তোলে। ২ নভেম্বর পদ দুটি বাদ দিয়ে সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালা জারি করা হয়। ৪ নভেম্বর সমকালের খবরে বলা হয়, কয়েকটি রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের বিরোধিতার মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর ওইদিন রাতে সরকারি একটি ব্যাখ্যা মেলে। সচিব কমিটির বরাত দিয়ে তাতে বলা হয়, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। এত অল্পসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে কার্যকর কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এতে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে (সমকাল, ৪ নভেম্বর ২০২৫)।
উদ্যোগটি ছিল ২০২০ সালের, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের। পরিকল্পনা ছিল, ওই দুই বিষয়ে দুই হাজার ৫৮৩ জন করে মোট পাঁচ হাজার ১৬৬টি শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা হবে। সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আড়াই হাজার ক্লাস্টারে সমসংখ্যক (একেকটি ক্লাসে একজন করে) শারীরিক শিক্ষা ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এই শিক্ষকরাই ক্লাস্টারভুক্ত বিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে একেকদিন একেকটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্লাস নিতেন। ছেলেভোলানোর মতো করে এখন যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রশ্ন ওঠে–গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কি যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়? শিক্ষাক্ষেত্রে একই গোষ্ঠীর কাছে বারবার নতিস্বীকার অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু আখেরে তা শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা আপসকামী–কারও জন্যই মঙ্গলজনক হয়ে ওঠেনি। বরং নিত্যনতুন চাপের খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছে।
দুই.
গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জানা যায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় দেশের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী আট হাজার ৮৫০ জনকে জুডো, কারাতে, তায়কোয়ান্দ ও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেবে। ২৮ কোটি টাকার এ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বিকেএসপির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২২ নভেম্বর দুই হাজার ৩০০ জনকে দিয়ে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। অস্ত্র প্রশিক্ষণ বিষয়ে ১ নভেম্বর বিবিসি বাংলাকে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, এই প্রশিক্ষণে সরাসরি বুলেট ফায়ারিং শেখানোর ইচ্ছা থাকলেও গুলির অনুমোদন, বাজেট ও অবকাঠামো জটিলতার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।
দেখা যাচ্ছে, যে বৈষম্যের কথা বলে প্রাথমিকে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক বাদ গেল, সেই যুক্তি এখানে প্রযোজ্য হয়নি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। তাদের মধ্যে শুধু ৯ হাজার জনকে বিশেষ একটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া কি বৈষম্য নয়?
তিন.
মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গত ২৭ অক্টোবর সকালে অ্যাসেমব্লি চলাকালে মাগুরা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মতিন ও মাগুরা-২ আসনের প্রার্থী এম এ বাকের সেখানে আসেন। নিউজ২৪-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২ নভেম্বর সম্প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াত প্রার্থীরা শিশুদের সামনে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, দলীয় প্রতীকের পরিচয় করিয়ে তা মুখস্থ করিয়ে নিচ্ছেন। তাদের কাছে দোয়া চাচ্ছেন। নেতাদের সহায়তা করার অভিযোগ ওঠে প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ে রাজনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ৩ নভেম্বর বিক্ষোভ করে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ঘটনার বিচার দাবি করে।
ঘটনাটি নানা দিক থেকেই যথেষ্ট উদ্বেগের। এখনই যদি দলটির নেতারা এমন করেন, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলে তারা যে দেশব্যাপী এ ধরনের কাণ্ড আরও ঘটাবেন না, তার কী নিশ্চয়তা? মাগুরার শিশুদের ধন্যবাদ দিতে হয়, তারা প্রতিবাদ করাতে বিষয়টি জানাজানি হয়েছে। আড়ালে আবডালে নানা কৌশলে প্রতীক পরিচিতির মতো তৎপরতা শিক্ষাঙ্গনে আরও চলছে কিনা, সে প্রশ্নও থেকে যায়।
শিশুকে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার বৈশ্বিক একটি সাধারণ চর্চা রয়েছে। অবশ্য আলোচ্য দলটির বিরুদ্ধে শিশুদের লক্ষ্য করে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অভিযোগ বেশ পুরোনা। স্কুলে ভালো ফল করা কিংবা নিয়মিত পাড়ার মসজিদে যাওয়া ছেলেটিকে ‘নার্সিং’ করে দলে ভেড়ানোর তাদের কৌশল এখন ওপেন সিক্রেট। রাজনীতিতে ন্যূনতম একটি স্ট্যান্ডার্ড সবারই মান্য করা উচিত।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে জোরালো হাইপ তৈরি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক রীতিতে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালানো ছাত্র সংগঠনগুলোকে নানা অভিযোগে বিদ্ধ করে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তোলা হচ্ছিল। পরে বলা হলো, আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়াতে মনে হয় এখন আর এ নিয়ে দিনে কি রাতে, যখন তখন মিছিল-মিটিং হতে দেখা যাচ্ছে না।
কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি সংকুচিত করতে চাইছেন, তাদেরই কেউ স্কুলশিশুদের মধ্যে রাজনীতি ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। যখন তখন রং পাল্টানোর এ নীতির কারণে শঙ্কা জাগে ভবিষ্যতে আরও সুযোগ-সুবিধা পেলে শিক্ষাঙ্গন নিয়ে তারা আর কী কী করবেন! শিক্ষা ও শিক্ষার্থী নিয়ে কার কী পরিকল্পনা, নির্বাচনের আগে সেটি দলগুলোর সুস্পষ্ট করা উচিত।
আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী
বার্তা সম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষাঙ্গন
- আদনান মনোয়ার হুসাইন
- বিদ্যালয়
