অন্যদৃষ্টি
ফিরছে এসিড সন্ত্রাস?
মাহামুদুল হক
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৩ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে এক সময় এসিড সন্ত্রাস ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ আতঙ্কগুলোর একটি। বিশেষ করে প্রেম প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক বিরোধ কিংবা যৌতুকের দাবিতে নারীর মুখে ছোড়া হতো এসিড। দীর্ঘ আন্দোলন, কঠোর আইন, গণমাধ্যমের সোচ্চার ভূমিকা এবং এনজিওগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের ফলে সেই জঘন্য অপকর্ম অনেকটা থেমে গিয়েছিল।
কিন্তু ৮ নভেম্বর সমকালের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এসিড সন্ত্রাস-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মনে হচ্ছে, আমরা হয়তো সেই অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে এসিড হামলার শিকার হয়েছেন সাতজন নারী, যাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় কম হলেও নতুন করে তা বাড়ছে।
‘এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২’ ও ‘এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২’ পাস হয় অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২৫ বছরেও আইনের বিধিমালা না হওয়ায় তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন– কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। এসিড উৎপাদন, পরিবহন, মজুত, বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা নিয়ে তিন মাসে অন্তর সভা করার কথা জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলের। সভা কি হচ্ছে নিয়মিত? জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো কি কার্যকর আছে? এসব কার্যক্রম নিয়মিত সক্রিয় থাকলে এসিড সহিংসতা ভয়ংকররূপে ফিরে আসত না।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে কিংবা অর্থের অভাবে মামলা চালাতে না পারা ভিকটিমের মতো হাজারো আক্রান্ত নারীর বিচার-প্রাপ্তি মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে। কয়েকজন আইনজীবী আমাকে জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল এজাহার, সাক্ষীর অনুপস্থিতি আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসিড-সংক্রান্ত মামলাগুলো স্থবির হয়ে পড়ে। উচ্চ আদালতে পৌঁছালে বিচারিক ধারা আরও ধীর হয়। এ ছাড়া পুরোনো মামলাগুলোর ওপর নজরদারি প্রায় বন্ধ হওয়ায় এসিড সহিংসতা প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যত স্থবির।
সমাজের মানসিক কাঠামোও এ অপরাধকে টিকিয়ে রাখছে। নারীকে ভোগ্যপণ্য ভাবা; তাকে ‘না’ বলার অধিকার না দেওয়া এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভ– এসবই এসিড হামলার প্ররোচনা দেয়। যতদিন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না আসবে, ততদিন নারীর বিরুদ্ধে এসিড সন্ত্রাস বন্ধ হবে না।
এক সময় প্রতিটি জেলা ও থানা পর্যায়ে সচেতনতামূলক পোস্টার, স্কুল ক্যাম্পেইন ও জনসভা হতো। এখন সেসব নেই। প্রশাসনের তৎপরতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজও উদাসীন হয়ে পড়েছে। অথচ যখন সবাই একসঙ্গে কাজ করেছিল– সরকার, গণমাধ্যম, এনজিও, জনগণ, তখনই এসিড সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। ২০০২ সালে ৪৯৬টি ঘটনা থেকে ২০১১ সালে সে সংখ্যা কমে ৯১তে নেমে এসেছিল। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগেই সফলতা এসেছিল।
আজ প্রয়োজন সেই ঐক্যের পুনর্জাগরণ ও আইনের কঠোর বাস্তবায়ন। তদন্ত, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া স্পষ্টীকরণসহ আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন, এসিড বিক্রয় ও পরিবহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ। অনুমতিবিহীন রাসায়নিক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
আমরা একসময় এই এসিড দানবকে পরাজিত করেছিলাম। এখন যদি তা ফিরে আসে, তবে দায় কেবল অপরাধীর নয়; রাষ্ট্র, সমাজসহ সবার। আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই, তবে সচেতনতা ছিল। তাও থেমে গেছে। মানবিকতা ছিল; নিঃশেষ হচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে এখনই দরকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সক্রিয় মনিটরিং এবং নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার সামাজিক সংস্কৃতি। অন্যথায় নতুন প্রজন্মের নারীর মুখ আবারও ঝলসে উঠবে সেই নারকীয় আগুনে, যা একদিন আমরা ভাবতাম– নিভে গেছে চিরতরে।
মাহামুদুল হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
[email protected]
