ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বন্দর বাঁচাতে চাই দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য

বন্দর বাঁচাতে চাই দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য
×

চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি

রুস্তম আলী খোকন

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৫:৩৬ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৬:২৮

গত ১৭ নভেম্বর সোমবার ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটো বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে– ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে স্বাক্ষরিত ওই দুই চুক্তি অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের একটি কোম্পানি ঢাকার পানগাঁও বন্দর পরিচালনা করবে এবং ডেনমার্কের কোম্পানি চট্টগ্রামের লালদিয়া চরে একটি বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। 

চুক্তির শর্তগুলো প্রজাতন্ত্রের মালিক সাধারণ মানুষের কাছে লুকানো হয়েছে, অবলম্বন করা হয়েছে কঠোর গোপনীয়তা। তবে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গায় নির্মিত পানগাঁও টার্মিনালটি মাত্র ১২১ কোটি টাকার বিনিময়ে সুইজারল্যান্ডের কোম্পানি মেডলক এসএ ২২ বছরের জন্য পেয়েছে (প্রথম আলো, ১৭ নভেম্বর), অথচ ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পানগাঁও টার্মিনালটি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ১৫৬ কোটি টাকায় নির্মাণ করেছিল। ঠিক কী কারণে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত বন্দরটি বিদেশিদের কাছে লিজ দেওয়া হলো, তা জানানোর প্রয়োজনও বোধ করেনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। বন্দরটি চালু ছিল এবং এটিকে ঘিরে বড় রকমের কোনো বিতর্কও ছিল না। 

চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়া চরে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় একটি আধুনিক বন্দর নির্মাণের জন্য ৬৪ একর জমি দখলমুক্ত করে সামগ্রিক পরিকল্পনা করে রেখেছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেখানে ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান এপি মোলার মায়ের্স্ক ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিযোগ করবে। ৩০ বছর তারা এটি পরিচালনা করবে।

যে সরকার এ চুক্তি করছে, তাদের এ ধরনের চুক্তি করার নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার আছে কিনা– তা নিয়েও আছে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম বন্দরে এখন চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু আছে। চুক্তিগুলো হলে ৩৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৬০ শতাংশ চলে যাবে বিদেশিদের কাছে। চারটি টার্মিনালের একটি এনসিটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ড্রাইডক। ডিসেম্বরে সেটি চলে যাবে বিদেশিদের হাতে। 
বন্দর তুলে দেওয়ার মূল যুক্তি অদক্ষতা ও দুর্নীতি। এই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে ৩০ বছর ধরে। অনেক আগে থেকেই আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের দৃষ্টি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের ওপর। বারবার হানা দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল এ সরকার আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষাকারী। তাই চুক্তিগুলো এত গোপনে এবং দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে।
প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে এ মাসের ৪ তারিখে। আর এটি যাচাই-বাছাই ও দরকষাকষি করে প্রধান উপদেষ্টা তাতে স্বাক্ষর করেছেন ১৬ নভেম্বর। ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মামলার বিচারের রায় দেওয়ার তারিখ ছিল। দেশব্যাপী ছিল টানটান উত্তেজনা। সেই দিনটিকেই সরকার চুক্তির জন্য বেছে নিয়েছিল। সন্দেহ করা হচ্ছে, জণগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ নিতেই মাত্র ১৩ দিনে চুক্তিটি করা হয়েছে। 
দিনটিকে অস্থির করে রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বত্রিশ নম্বরের বাড়ির অবশিষ্ট অংশ ভাঙচুরের একটি নাটকও নাকি সাজানো। এমন আলোচনা রয়েছে চুক্তিবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে। ১৭ নভেম্বর সারাদিন ফেসবুকে তারা পোস্ট দিয়ে চেষ্টা করেছে জাতিকে জানাতে– ‘দেশের বন্দর আজ তুলে দেওয়া হচ্ছে বিদেশিদের হাতে’। দুর্বল বামপন্থিরা চেষ্টা করছে বন্দর রক্ষার জন্য। চট্টগ্রামের জনগণ মাঠে নেমেছে। তবে অতীতের গণবিরোধী সরকারগুলোর মতোই এ সরকার তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি।
বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস বন্দরের ওপর ৩০ বছর আগে থেকেই মার্কিনিদের দৃষ্টি আছে। সে দৃষ্টি অর্থনৈতিক, সামরিক স্বার্থে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থও আছে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থে গ্যাস রপ্তানির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জাতীয়  সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের নেতা প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে সেই সময়ে বামপন্থিদের সহযোগিতায় বিক্ষোভ, হরতাল, লংমার্চের মতো কঠোর কর্মসূচি নেওয়া হয়। সেই সরকার গ্যাস রপ্তানি থেকে পিছিয়ে আসে।

সেই সময়ে তেল-গ্যাস বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্বটি আমি পালন করতে বাধ্য হয়েছি, সংগঠনের সদস্য সচিব ড. গোলাম মহিউদ্দিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় এ গুরুদায়িত্বটি পাঁচ বছর আমাকে পালন করতে হয়েছিল। ২০০২ সালের ২৪-৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত  ২৬৩ কিলোমিটারের লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।  চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক, সুশীল সমাজ এগিয়ে এসেছিল সেই সময়ে। আজ সেই ঐক্য অনুপস্থিত। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মশাল মিছিল হচ্ছে। বামপন্থিরা জাতীয়ভাবে চেষ্টা করছে। সফল হবে কিনা জানি না।

অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি নিয়ে জনগণের সঙ্গে ছলচাতুরি করেছে। কয়েক মাস আগে নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ‘দেশের স্বার্থ হানি করা কোনো গোপন চুক্তি সরকার করবে না, চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবকিছু জানা যাবে।’ বাস্তবে হলো উল্টো।
এ মুহূর্তে ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। বিএনপি এখন পর্যন্ত একটি বিবৃতিও দেয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের ভেতর সামন্ত ও ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা কাজ করে। তারা বিদেশিদের ওপর দেশের জনগণের চাইতে বেশি নির্ভরশীল। তারা মনে করে, ক্ষমতায় যেতে এবং থাকতে ইউরোপ, আমেরিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় সম্পদ রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক জনগণের ঐক্য জরুরি। ঘোর অন্ধকার কেটে একসময়ে সূর্য ওঠে। সূর্য সেনের চট্টলায় বিক্ষোভ হচ্ছে। এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে সারাবাংলায়। সূর্য সেনের বাংলায় সূর্য উঠবেই।

রুস্তম আলী খোকন: লেখক, সংগঠক
 

আরও পড়ুন

×