ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খাদ্যে দূষণ

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা আমলে নিন

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা আমলে নিন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারজনিত জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যক্রম গ্রহণ এবং খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রবিবার যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হইয়াছে, উহাকে আমরা স্বাগত জানাই। সোমবার প্রকাশিত সমকালের এই সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বৈঠকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ হইতে কিছু তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়, যেইগুলি শুধু নিরাপদ খাদ্যের অপ্রতুলতাই নহে, এই কারণে জনস্বাস্থ্য কতটা ভয়ংকর ঝুঁকির সম্মুখীন, তাহাও তুলিয়া ধরে। তাহাদের মতে, খাবারে চার প্রকার দূষণ থাকিতে পারে, যেইগুলি হইল ভারী ধাতু, কীটনাশক-জীবনাশক-এর অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা ও জৈবদূষক। সংস্থাটি গত অর্থবৎসরে ১৭১৩টি এবং এই বৎসর ৮১৪টি নমুনা পরীক্ষা করিয়াছে, যেইখানে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা/সিসা ক্রোমেট পাওয়া গিয়াছে। মোট ১৮০টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে সিসা শনাক্ত হইয়াছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএমইএ সুইডেনের যৌথ গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে ৮৭টি পানি ও ২৩ মৎস্যের নমুনা সংগ্রহ করিয়া ৩০০ প্রকারের ঔষধ, ২০০ প্রকার কীটনাশক, ১৬ প্রকারের পিএফএএস শনাক্ত করা হইয়াছে।

প্রসংগত, সিসা মানবদেহে প্রবেশ করিয়া মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি, হাড় ও দাঁতে জমা হয়। শিশুর হাড় নরম হওয়ায় সিসা সরাসরি মস্তিষ্কে চলিয়া যায়। ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। কীটনাশকের ক্ষতিও ব্যাপক, যাহা মানবদেহে ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ ও প্রজনন সমস্যার মতো জটিলতার জন্ম দিতে পারে; মাটি ও পানিদূষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য হ্রাসেরও কারণ ঘটাইতে পারে। পিএফএএস হইল একই রকমের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কতগুলি রাসায়নিক, যেইগুলিকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়; কারণ পরিবেশ বা মানবদেহে প্রবেশ করিবার পর এইগুলি সহজে ভাঙে না। ফলে ক্যান্সার, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি এবং প্রজনন সমস্যার ন্যায় গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করিয়া থাকে। অন্যদিকে হাঁস-মুরগির খামারগুলিতে অনিয়ন্ত্রিত ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। মুরগিকে খাওয়ানো অ্যান্টিবায়োটিক সাত হইতে ২৮ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকিয়া যায়। ফলে ২৮ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে মুরগিকে বাজারজাত করা হইলে সেই মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকিতে পারে। যাহার ফলে সংশ্লিষ্ট শরীরে উক্ত ঔষধের কার্যকারিতা নষ্ট হইতে পারে। 

বৈঠকে ইউনিসেফের এক জরিপের বরাত দিয়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে সাড়ে তিন কোটি শিশু সিসার সংক্রমণে আক্রান্ত এবং ৫ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বার মধ্যে সিসার সংক্রমণ পাওয়া গিয়াছে বলিয়া যে তথ্য জানাইয়াছে, তাহাও গভীর উদ্বেগজনক বলিয়া মনে করি। আমরা জানি, এহেন পরিস্থিতি রজনীকালেই সৃষ্টি হয় নাই। দশকের পর দশক নিরাপদ খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা বিষয়ে সরকারের ঔদাসীন্যেরই ফল ইহা। দীর্ঘ সময় দেশে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি তত্ত্বাবধান কে করিবে– এই সংক্রান্ত কোনো সংস্থা ছিল না। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার সংস্থা, বিএসটিআই, স্থানীয় প্রশাসন, র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলি নিজেদের মতো করিয়া অনুভব করিত। উহারা মাঝেমধ্যে এই বিষয়ে এইখানে-সেইখানে অভিযানও চালাইত। কিন্তু নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সকলই অবশেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইত। এই প্রেক্ষাপটেই বিগত সরকার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ইহাতে পরিস্থিতির ইতরবিশেষ ঘটিয়াছে– এমন দাবি করা যাইবে না। 

এই কারণেই রবিবারের বৈঠককে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করি। এই বৈঠকের একটি বিশেষ দিক হইল, এইখানে শুধু সমস্যার ধরন বা কারণ লইয়াই আলোচনা হয় নাই; প্রতিকারের পথও সন্ধান করা হইয়াছে।
প্রতিবেদনমতে, প্রধান উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট সকলকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খাদ্যদূষণ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রস্তাব লিখিত আকারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়াছেন। সেই সকল সুপারিশের মধ্যে জরুরি বিষয়গুলির বাস্তবায়ন তৎক্ষণাৎ আরম্ভ করিবার কথাও তিনি বলিয়াছেন। আমাদের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট সকলে এতদ্বিষয়ে আন্তরিকতার সহিত সক্রিয় হইবেন।

 

আরও পড়ুন

×