শিক্ষাঙ্গন
সাত কলেজ জটিলতার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান দরকার
শেখ নাহিদ নিয়াজী
শেখ নাহিদ নিয়াজী
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ডিসিইউ) নামে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির সরকারি পরিকল্পনার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি সরকারি কলেজ এখন চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো–প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো, খসড়া অধ্যাদেশ এবং ২০২৪-২৫ সেশনের জন্য বিলম্বিত ক্লাস শুরু নিয়ে মতবিরোধ। ২০২৪-২৫ সেশনের জন্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তা এবং হতাশার মধ্যে পড়েছে; কারণ নভেম্বরের শেষের দিকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও শুরু হয়নি। এর ফলে প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে ভোগান্তিতে পড়েছে। সাত কলেজের শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ বা কর্মজীবনের অগ্রগতি নিয়ে তাদের বিক্ষোভের ফলে এই সংকট জটিলতর হয়ে পড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাতটি কলেজের অধিভুক্তির সিদ্ধান্তকে সেই সময় অনেক শিক্ষাবিদ খারাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মত দিয়েছিলেন। সময়মতো পরীক্ষা অনুষ্ঠানের অনিশ্চয়তা এবং ফলাফল বিলম্বিত হওয়ার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের বিবেচনায় ছিল। তা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ, সাত কলেজ পরিচালনা এবং সার্বিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের অভাবের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেখা দেয় এবং সরকার কলেজগুলোকে পৃথক করে ঢাকা সেন্ট্রাল (কেন্দ্রীয়) বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাতটি কলেজের অধিভুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়, কিন্তু অধ্যাদেশ এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় নতুন প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষকে প্রশাসক হিসেবে রেখে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে এই কলেজগুলো পরিচালিত হচ্ছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও একটি সুস্পষ্ট, কার্যকর এবং সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি।
সাত কলেজের অনেক শিক্ষক প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, কারণ তারা আশঙ্কা করছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর তাদের ক্যারিয়ারের অগ্রগতি এবং পদোন্নতি ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তা ছাড়া এটি সিভিল সার্ভিস রুলের মধ্যে তাদের বিষয়-নির্দিষ্ট পদগুলোকে বাদ দিতে পারে। ডিসিইউর প্রস্তাবিত কাঠামো সম্পর্কে শিক্ষার্থী এবং বিশেষজ্ঞদেরও মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে এর কার্যকারিতা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত করার শঙ্কা নিয়ে কথা বলছেন। এই সংকট এই কলেজগুলোর পরিচালনা-সংক্রান্ত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেছে।
একদিকে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন যে সাতটি কলেজে পড়ানো অনেক অনার্সের (স্নাতক সম্মান) বিষয় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নতুন ব্যবস্থার অধীনে নারীর জন্য শিক্ষা সংকুচিত হতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা খসড়াটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল। যদিও এই বছর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এখন ডিসিইউর শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, শিক্ষকদের (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার) এখনও প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে শিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শিক্ষকদের দাবি, অধ্যাদেশে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ডিসিইউর অধীনে সব স্তরের শিক্ষকদের (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার) অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
অন্যদিকে এই কলেজগুলোর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা বলছে যে প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে যদি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এইচএসসি স্তরের শিক্ষার্থীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরাও কলেজের সামনে বিক্ষোভ করেছে, কারণ তাদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ বা উপেক্ষার
শিকার হবে।
এই কলেজগুলো তাদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে থাকে, তাই এটি অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন। যেহেতু একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা খুবই সময়সাপেক্ষ, তাই সরকারকে একটি ‘ফেডারেটেড স্কুল মডেল’ বাস্তবায়ন করতে হবে; যেখানে সাতটি কলেজ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে ‘বিতরণকারী স্কুল’ হিসেবে কাজ করবে। নতুন অধ্যাদেশের অধীনে ডিসিইউর নতুন প্রশাসনের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যাতে কলেজগুলোকে বিভিন্ন একাডেমিক স্কুলে (যেমন– স্কুল অব সায়েন্স, স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স, স্কুল অব বিজনেস ইত্যাদি) ভাগ করে পাঠদান-শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। এ মুহূর্তে সরকারের উচিত হবে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে একটি বৈঠক করা; যাতে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট করা যায়, পরিষেবা-নিয়ম নির্ধারণ করা যায় এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পথ যাচাই করে স্থায়ী সমাধান করা যায়।
সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সাতটি কলেজে শিক্ষক পদের জন্য নতুন নিয়োগ বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। অথবা সরকার সম্পূর্ণ নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে এবং কলেজগুলোকে একটি আলাদা বা একক বিশ্ববিদ্যালয়ে একীভূত করা থেকে সরে আসতে পারে। সরকারের দিক থেকে প্রতিটি কলেজের অনন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি এবং ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে তাদের পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার জন্য আরও যুক্তিসংগত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
এখন অবশ্য বেশ কিছু শিক্ষাবিদ এবং উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞ সমস্যা সমাধানের জন্য সাতটি কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছেন, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্তির আগে এটিই ছিল তাদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই সংকট বা অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকারকে ইতিবাচকভাবে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে পারেন এবং নেতৃত্ব দিতে পারেন। যেনতেনভাবে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই আরেকটি অর্থহীন প্রচেষ্টা হবে। বরং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নত করার ব্যাপারে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষাঙ্গন
