ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য

নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন

নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন
×

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২

সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের আয়েশা বেগম যখন প্রতিদিন ভোর ৪টায় কলস কাঁখে দুই মাইল দূরের লবণমুক্ত পানির একমাত্র পুকুরটির দিকে হাঁটা শুরু করেন, তখন তাঁর কাছে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা এক ধূসর মরীচিকা। আয়েশার মতো উপকূলের হাজারো নারীর কাছে এক গ্লাস মিষ্টি পানি কেবল তৃষ্ণা মেটানো নয়, বরং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। আবার রাজধানীর কড়াইল বস্তির শিশুটির কাছে একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার আজও বিলাসিতা। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্থায়ী তকমা পেতে যাচ্ছে, তখন এই মৌলিক চাহিদার লড়াই আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস) অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ এখন বেসিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এসেছে। তবে পরিসংখ্যানটির গভীরে রয়ে গেছে প্রকট বৈষম্য। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির (ওয়াশ) এই সংকট কেবল প্রকৌশলগত নয়; একটি গভীর মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রশ্ন– আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞায় কি আয়েশা বেগমদের এই দীর্ঘ পথচলা শেষ হওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি আছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, ওয়াশ পরিষেবাগুলোতে এক ডলার বিনিয়োগ করলে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৪.৩ ডলার পর্যন্ত রিটার্ন বা সুফল ফেরত আসে। যখন একটি পরিবার নিরাপদ পানি পায়, তখন তাদের পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায় মাসিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ বেঁচে যায়। কোনো শ্রমিক সুস্থ থাকলে তাঁর উৎপাদনশীলতা বাড়ে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ওয়াশ খাতকে স্রেফ খরচের খাত হিসেবে না দেখে একে ‘অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাড়ায় একটি পানির উৎস তৈরি করতে যে খরচ; সমতলে তা অনেক কম। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে নোনাপানির সমস্যার কারণে নারীরা গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু সমতলের হিসাবে বাজেট বরাদ্দ দিলে পাহাড় বা উপকূলের মানুষ চিরকাল পিছিয়ে থাকবে। যেখানে সংকট বেশি (যেমন উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা বা নদীভাঙন-কবলিত চরাঞ্চল), সেখানে বরাদ্দের অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

নারীর মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সামাজিক নীরবতা ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে আমাদের অর্থনীতিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্যানিটেশন ও প্যাড ব্যবহারের সুবিধার অভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রীরা মাসে তিন থেকে চার দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। বছরে এই অনুপস্থিতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-৪৫ দিন। এটি তাদের ঝরে পড়ার হার ত্বরান্বিত করে। পোশাকশিল্পে যদি নারী কর্মীদের জন্য মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে তাদের অনুপস্থিতির হার হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনশীলতা ৫-৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ইশতেহারে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে বিনামূল্যে বা সুলভে স্যানিটারি সামগ্রী নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। এটি কেবল স্বাস্থ্যসেবা নয়; লিঙ্গ সমতার এক অপরিহার্য শর্ত।

ওয়াশ খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করলে লাখ লাখ ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ সৃষ্টি সম্ভব। সরকার যদি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের স্যানিটেশন সরঞ্জাম উৎপাদন বা পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তির স্থানীয়করণে প্রণোদনা দেয়, তবে হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হবে। নীলফামারী বা কুষ্টিয়ার মতো জায়গায় যদি পয়োবর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠে, তবে স্থানীয় যুবকরা সেখানেই সম্মানজনক জীবিকা খুঁজে পাবে। 

আমাদের সাধারণ টিউবওয়েল নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো চাই। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততারোধী প্রযুক্তি এবং খরাপ্রবণ এলাকায় ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের একটি নির্দিষ্ট অংশ তাই ওয়াশ খাতের গবেষণায় ব্যয় করা যায়। একটি টিউবওয়েল বসানো সহজ, কিন্তু সেটি সচল রাখা কঠিন। যদি প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে একটি ‘ওয়াশ তহবিল’ থাকে এবং স্থানীয় মানুষ সেখানে সামান্য চাঁদা দেয়, তবে কোনো টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে পড়ে থাকবে না। এই মডেলটি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ (কমপক্ষে ১০ শতাংশ) ওয়াশ খাতে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। 
নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াশ অন্তর্ভুক্ত হওয়া কেবল সময়ের দাবি নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। 

অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ: পলিসি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি লিড, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×