শ্রদ্ধাঞ্জলি
বেগম খালেদা জিয়া চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন
মাহ্বুব উল্লাহ্
প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৮ | আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গতকাল মঙ্গলবার প্রত্যুষে বেগম খালেদা জিয়া পৃথিবী ও তাঁর আপনজনদের মায়া ত্যাগ করে পরলোকের পথে যাত্রা করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হলো, যা খুব সহজে পূরণ করা সম্ভব হবে না। যত দিন যাবে, দেশবাসী ততটাই বুঝতে পারবে, কী অমূল্য সম্পদ হারিয়েছে। তাঁর জীবন দেশবাসীকে সংহত, ঐক্যবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন আপসহীন নেত্রী। নীতির প্রশ্নে, দেশের প্রশ্নে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, জনঅধিকারের প্রশ্নে তিনি কখনোই আপস করেননি। তিনি নিছক একজন গৃহবধূ থেকে দেশবরেণ্য দেশনেত্রীতে পরিণত হন। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অতুলনীয়। তিনি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে লড়াই করে যান। এরশাদের অধীনে তিনি কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। রাজপথে মিছিলে অংশগ্রহণ করে তিনি তাঁর সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। অথচ তাঁর পাশেই আরেকজন নেত্রী একদিকে আন্দোলনের কথা বলেছেন, অন্যদিকে এরশাদের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। যে কারণে আমরা দেখতে পাই ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেছিলেন। যার ফলে এরশাদের শাসন কিছুটা হলেও বৈধতা পেয়েছিল। এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো, এক দিন আগে তিনি বললেন, এই নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করবে তারা হবে জাতীয় বেইমান। কিন্তু পরদিনই তিনি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এ ধরনের পথভ্রষ্টতা, নীতিভ্রষ্টতা থেকে অনেক যোজন দূরে ছিলেন। সে জন্যই তিনি দেশের মানুষের কাছে একজন জনপ্রিয় নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি জীবনে যত নির্বাচন করেছেন, কোনো নির্বাচনেই পরাজিত হননি। যখন এক ব্যক্তি একই সময়ে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করতে পারতেন, সে সময় তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব আসনেই জয়ী হয়েছিলেন। এই পাঁচটি আসন কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলে ছিল না। বরং সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এর পরও দেশের মানুষ তাঁকে ভোট দিয়েছিল। তাঁকে আন্তরিক সমর্থন দিয়ে বিজয়ী করেছিল সাধারণ মানুষ। আবার যখন নিয়ম চালু করা হয়েছিল– তিনটি আসনের বেশি একসঙ্গে নির্বাচন করা যাবে না, তখনও তিনি একসঙ্গে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবটাতে জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে তাঁর পাশাপাশি আরেকজন নেত্রী নির্বাচনে হারার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এভাবেই বেগম খালেদা জিয়া একজন অসম্ভব জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে বহুকাল মনে রাখবে।
ব্যক্তিগতভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে জানা ও দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। শেষবার তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, এর আগে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থা হয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, সাক্ষাৎটা হয়নি। এর মধ্যেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, হাসপাতালে ভর্তি হন; শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। আমার মনে আছে, তাঁকে কেউ সুপরামর্শ দিলে তিনি তা শুনতেন এবং আমলে নিতেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের নামে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করা হয়েছিল; দেশকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল; দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা হয়েছিল; সে সময় আমরা কয়েকজন দলবহির্ভূত মানুষ, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত মানুষ, যারা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম, তাঁর করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিতাম। এমনই এক পর্যায়ে আমরা যখন দেখলাম, দেশে এমন একটা অচলাবস্থা তৈরা করা হয়েছিল, যে অচলাবস্থা জনগণ পছন্দ করছে না। তারা প্রচণ্ড ভোগান্তির শিকার হয়েছে। জনগণ তখনও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারায়নি। তবে তারা এ অবস্থা থেকে মুক্তি চাচ্ছিল।
সে অচলাবস্থার বাস্তবতার আলোকে আমরা বেগম খালেদা জিয়াকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলাম। তখন তিনি বললেন, সাধারণত গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটায় সামরিক বাহিনী। অথচ সামরিক বাহিনীর অফিসাররাই আমাকে বলেছেন, এইবার ক্যু করেছে সিভিলিয়ানরা। অর্থাৎ জনতার মঞ্চ আন্দোলন করে সিভিল ব্যুরোক্রেসিকে অবশ করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। আমরা তাঁকে পরামর্শ দিলাম, সাদামাটাভাবে আপনি পদত্যাগ করবেন না। আপনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েই জনতার আদালতে হাজির হোন। তিনি তাই করলেন। ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া তাঁর পল্টন অফিসের সামনে জনসভা করলেন। সেখানে বিশাল জনসভা হয়েছিল। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সেখানে যোগ দিয়েছিল। সে জনসভার সাফল্য দেখে তিনি ঘোষণা দিলেন, আগামী দিনও একই জায়গায় আমি পরিকল্পনা জানাব; দেশ সম্পর্কে আমার চিন্তাভাবনার কথা বলব। তিনি সেভাবেই করলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় আমরা দেখতাম, আদর্শগত বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের খুব একটা বিরোধ হতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বা অন্য বিষয়ে চিন্তা করতাম, দেখতাম তিনিও আমার সঙ্গে একমত। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংকট থেকে উত্তরণে কী করণীয় বা কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে পরামর্শ তিনি শুনতেন। তিনি একজন ‘অ্যাপ্রোচেবল লিডার’ ছিলেন। তাঁর কাছে সময় চাইলে সময় দিতেন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাঁর শোনার এক অপরিসীম ধৈর্য ছিল। যখন স্বৈরশাসন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে কিংবা এক-এগারোর সরকারের সময়ে তিনি আমাকে পত্রিকায় বেশি বেশি লেখার উৎসাহ দিতেন। তিনি আমাকে বেশি বেশি লিখতে বলতেন। বলতেন– আপনি যত বেশি লিখবেন, আমাদের জন্য ততই ভালো হবে। যতটুকু সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল, আমি লিখেছি। বিভিন্নভাবে প্রতিবাদমূলক লেখা লিখেছি।
সেদিক থেকে বেগম খালেদা জিয়ার একটা ঘনিষ্ঠতা আমি অর্জন করেছিলাম। যখন আমি মাহফুজ উল্লাহ রচিত ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’, যেটা ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়েছিল, তার বাংলা অনুবাদ করে সেটা দেওয়ার জন্য আমরা তাঁর কাছে গেলাম। সে সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মাহফুজ উল্লাহর পত্নীও উপস্থিত ছিলেন। সে অনুবাদের কাজটা আমাকে দেখভাল করতে হয়েছে। সেটা শুনে তিনি বললেন, সত্যিকারের এক্সপার্ট ব্যক্তিই এ কাজটা করেছে। তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন। স্বাস্থ্যগত অবস্থা খারাপ থাকার পরও তাঁর জীবনীর বাংলা ভার্সনটি পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব দশা, অসুস্থতা, রোগভোগ প্রভৃতি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছিল, যা তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ছিল– তিনি যেন সেই পতন দেখে যেতে পারেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধু মানুষের কাছেই প্রিয় ছিলেন না; স্রষ্টার কাছেও হয়তো প্রিয় ছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া মনেপ্রাণে গণতন্ত্রী ছিলেন। গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যা যা করণীয়, সেটা করার চেষ্টা করে গেছেন। হয়তো কোনো কোনো সময় ভুল করেছেন। ভুল করলেও পরবর্তী সময়ে ভুল ধরিয়ে দিলে তাতে তিনি বিরক্ত হতেন না। বরং বলতেন, সময় থাকতে আপনারা বলেননি কেন? আমাকে স্মরণ করিয়ে দেননি কেন? গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি যেমন আপসহীন নেত্রী, তেমনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও তিনি আপসহীন ছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একেবারেই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক নেত্রী। তিনি একটা কথা বারবার বলতেন, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই আমার শেষ ঠিকানা। এই দেশে জন্ম আমার, এই দেশেই মৃত্যু হবে। এ রকম দেশপ্রেমী উচ্চারণ আমাদের কোনো নেতা-নেত্রীকে করতে দেখিনি। এখন তো অনেকেই বিদেশমুখী। বিদেশে ঘরবাড়ি করে, বিদেশেই থাকাকে ভালো মনে করে। তিনি সেটা করতেন না। এক-এগারোর সরকার তাঁকে সৌদি আরবে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছিল। তিনি এর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে পাঠাতে ব্যর্থ হয়। এর মধ্য দিয়েই বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের মানুষের প্রতি যে মমত্ববোধ, তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের মানুষের মনের জগতে, স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। তাঁকে দেশের মানুষ ভুলবে না। তাঁকে দেশের মানুষ শেষ বিদায় জানাবে অশ্রুসজলভাবে, বিপুলভাবে, যা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
মাহ্বুব উল্লাহ্: অর্থনীতিবিদ; সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
