ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাদা কালো

যুক্তফ্রন্ট যত গর্জালো তত বর্ষালো না কেন

যুক্তফ্রন্ট যত গর্জালো তত বর্ষালো না কেন
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশেষত ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই ছিল মধ্যবামের সঙ্গে মধ্যডানের লড়াই। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগ পরিচিত হয়ে আসছে মধ্যবাম শক্তি হিসেবে। আর তাকে চ্যালেঞ্জ করতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বেছে নিয়েছিলেন মধ্যডান পন্থা। সেই লড়াই অন্তত আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আর থাকছে না। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে নির্বাহী আদেশে নির্বাচনের বাইরে রাখায় লড়াইয়ে থাকছে কেবলই মধ্যডান ও ডানপন্থি দলগুলো। যদিও গত ২ জানুয়ারি বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সে ‘লড়াই’য়েও কার্যত পানি ঢেলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দেশে একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জাতীয় নির্বাচনের পরে এবং সরকার গঠনের আগে আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে পারি কিনা, সে বিষয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের পর কিন্তু শপথ গ্রহণের আগে আমরা আবার একসঙ্গে বসব’ (সমকাল)।

ওদিকে, গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় বাম দলগুলোর উদ্যোগে গত ২৯ নভেম্বর গঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিল। বাস্তবে ওই জোট মাত্র ১৫৩ আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে। এর মধ্যেও মাত্র ১০০টি আসনে যুক্তফ্রন্টের একক প্রার্থী; বাকি ৫৩টি আসনে একাধিক শরিক দলের প্রার্থী রয়েছেন (সমকাল, ৩ জানুয়ারি ২০২৬)।

বিগত দশকগুলোতে অধিকাংশ সময় আলাদা অবস্থানে থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বামপন্থিরা এ দেশে বরাবরই জনগণের উদারমনা অংশের প্রতিনিধিত্ব করেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব সময়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে সামরিক স্বৈরাচার, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অধিকাংশ আন্দোলনেও একসঙ্গে লড়েছে। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ সংবিধানের চার মূলনীতি– বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সুরক্ষায় আলাদা অবস্থানে থেকেও এ দলগুলোর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সবার জানা। 

অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াত এবং তাদের অন্য ডানপন্থি মিত্ররা বরাবরই গণতন্ত্র ছাড়া সংবিধানের বাকি তিন মূলনীতির বিরোধিতা করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, দলটির নেতৃত্বের মধ্যেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। কিন্তু সম্ভবত এতদিনকার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে পার্থক্য সৃষ্টির মনোভাব থেকে দলটি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নিজস্ব এক বয়ান তৈরি করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা মুক্তিযুদ্ধকে ‘রাষ্ট্রের ভিত্তি’ বলছে বটে, তবে সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের বক্তব্যের সঙ্গেও তাদের অবস্থান একেবারে বিপরীত। 

এ প্রেক্ষাপটেই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাম দলগুলোর শক্তিশালী অবস্থান লিবারেল বা মুক্তিযুদ্ধের আবেগ-অনুভূতির ধারকদের যতটা ভোটের মাঠে টানতে পারত, বিএনপির পক্ষে ততটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দলটিকে এবারও তার চিরাচরিত রক্ষণশীল বা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধারার সমর্থকগোষ্ঠীর ওপরেই নির্ভর করতে হবে। 

প্রসঙ্গত, গত কয়েক মাস ধরে নানা ঘটনায় রক্ষণশীল মুসলিম জাতীয়তাবাদী সমর্থকগোষ্ঠীর নেতৃত্বে জামায়াতের অভিষেকের সম্ভাবনা দেখা গেলেও তারেক রহমান দেশে ফেরার পর এবং খালেদা জিয়ার প্রয়াণ-পরবর্তী পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দেয়। জামায়াত নেতৃবৃন্দও সম্ভবত সেটা বুঝতে পেরে দ্রুত সাদা পতাকা উড়িয়ে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে হাজির হয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সমঝোতায় লিবারেল ভোটের বাজারে বাম দলগুলোর পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে? অবশ্য চলমান মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের কতজন প্রার্থী টেকেন, সে প্রশ্নও আছে। ইতোমধ্যে তাদের একক প্রার্থী আছে এমন আসনেও মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীদের আপিল করতে হয়েছে। অর্থাৎ জোটের একক প্রার্থীর সংখ্যা ১০০-এর নিচে নামলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। 

যুক্তফ্রন্ট নেতারা বলেছেন, মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে ২০ জানুয়ারি প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলবে। কিন্তু সে সমঝোতা কতুটুকু সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়। এমন না যে, আসনগুলোতে একক প্রার্থী দিলে যুক্তফ্রন্ট জিতে যেত। এটা জেনেও নিজেদের মধ্যে কীসের এত প্রতিযোগিতা, তা বোঝা সত্যিই কষ্টকর। 
অভিজ্ঞতা বলে, জোটচর্চা এবং নির্বাচনী লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আন্তরিকতার ঘাটতি থাকলেই কেবল এমন সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটে। উল্লেখ্য, কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি ছাড়া জোটের আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলেরই শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে দাঁড়াননি। এতেও নির্বাচনকে তারা কতটা কম গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয়।

সত্য, জামানতের টাকা এবং নির্বাচনী ব্যয় অত্যধিক বেড়ে গেছে। যার কারণে গরিব মানুষের কোনো দলের পক্ষে নির্বাচনে টিকে থাকা মুশকিল। নানাবিধ তথ্য ও কাগজপত্র চেয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াও জটিল করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এসবের কোনোটাই অকস্মাৎ ঘটেনি। বরং এ-সংক্রান্ত জাতীয় সংলাপে বাম দলগুলোও সোৎসাহে অংশগ্রহণ করেছে। ক্রাউড ফাউন্ডিংয়ের নামে কত আনকোরা দল কত কিছু করছে! বামপন্থিরা তা পারছে না কেন?

বস্তুত, যুক্তফ্রন্ট গঠনের মধ্যেই তার খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। প্রথমত, যে জোট গঠনের কথা ছিল গণঅভ্যুত্থানের পরপর, তা করতে প্রায় সমমনা হয়েও দলগুলোর এক বছরের বেশি সময় লেগেছে। দ্বিতীয়ত, যেখানে প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন নিপীড়িত জাতিগত, ধর্মীয় ও পেশাজীবীদের এক মঞ্চে নিয়ে আসা; অন্তত ২০২৪ সালেই সিপিবি ও বাসদের নেতৃবৃন্দের দেওয়া একাধিক বক্তব্যেও তার স্বীকৃতি ছিল, সেখানে এ নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগই চোখে পড়েনি। বস্তুত প্রায় সাইনবোর্ড-সর্বস্ব কিছু বাম দলকে জোটে আনতে এরা যত ঘাম ঝরিয়েছে; নিপীড়িত জাতি ও ধর্মের সংগঠনগুলোর পেছনে সে চেষ্টার একাংশও দেখা যায়নি।

এ ধরনের সংগঠন শুধু ভোট নয়, লড়াইয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এরা নিজ নিজ কমিউনিটির স্বার্থ দেখে এবং সে সুবাদে কমিউনিটির সঙ্গে এদের সম্পর্কও সাধারণ নিবিড় থাকে। অভিজ্ঞতা বলে, এরা বরাবরই সেক্যুলার বা লিবারেল শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন সময় বাম দলগুলো এসব সংগঠনের সমালোচনাও করেছে। অথচ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট শক্তির শূন্যতা বাম দলগুলো চেষ্টা করলে কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারত।

অবশ্য বিশেষত গণঅভ্যুত্থানের পর জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যখন নির্যাতিত হয়েছে, তখন খুব কম ক্ষেত্রেই বাম দলগুলো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি শুরুর দিকে দলগুলোকে দুর্ভাগ্যবশত, সরকারের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে এসব নিপীড়নের ঘটনা অস্বীকার করতেও দেখা গেছে। এখনও যে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে মাজারে হামলা চলছে; হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে সন্ত্রাসী কায়দায় নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে, বাম দলগুলো কি তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে?

আমার প্রত্যাশা, বামপন্থিরা বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন। সমালোচনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে দুর্বলতাগুলো দূর করে নিপীড়িত শ্রেণি ও মানুষের শক্তি হয়ে উঠবেন।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী 
সম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×