শিক্ষাঙ্গন
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল থেকে সতর্কতা ও শিক্ষা
ফয়সাল কবীর শুভ
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত তিন মাসে বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু, সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। নির্বাচনগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ছাত্রশিবিরের উত্থান। অনেকের কাছেই সরল বয়ান দাঁড়িয়েছে– ছাত্রদল পিছিয়ে পড়ছে; এগিয়ে যাচ্ছে শিবির। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন সেই বয়ানকে খানিকটা চ্যালেঞ্জ করে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি, জিএস ও এজিএস– এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছাত্রদলের প্রার্থীরা যথাক্রমে প্রায় ৪৩ শতাংশ, ২১ শতাংশ এবং ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, যা প্রথম দেখায় খুব বড় সাফল্য মনে নাও হতে পারে। কিন্তু ডাকসু, জাকসু, রাকসুর সাম্প্রতিক ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, এই পারফরম্যান্স ছাত্রদলের জন্য নগণ্য নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশেও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত।
প্রথমত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিকভাবে হলভিত্তিক রাজনীতি তুলনামূলক দুর্বল। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্যাম্পাসে হলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠিত প্রচারের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে; জবিতে তার সুযোগ সীমিত। ফলে ৫ আগস্টের আগে বা পরে অনেক ক্যাম্পাসে শিবির যে কৌশলে হলকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এর ফলে ভোটের মাঠ এখানে তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক থেকেছে।
দ্বিতীয়ত, যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই, বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক প্রোফাইল গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশে পড়াশোনার দিকে ঝুঁকছে। ফলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, যাদের প্রধান লক্ষ্য সরকারি চাকরি। এই বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক আচরণেও প্রভাব ফেলে। আদর্শের পাশাপাশি তারা হিসাব করে দেখে– কোন পথে গেলে ঝুঁকি কম, ভবিষ্যৎ কিছুটা নিরাপদ।
এ ছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি অংশ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষে বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতিতে থাকে। তাদের বড় অংশ দূরে থাকে ভোট প্রক্রিয়া থেকে। ফলে ভোটার উপস্থিতির ধরনও একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির দিকে ঝুঁকে যায়।
তৃতীয়ত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্যাম্পাসে ভিসি ও প্রক্টরিয়াল পদে জামায়াতপন্থিদের প্রভাব বেড়েছে– এমন বিশ্বাস কাজ করছে। সরকারি চাকরির ভেরিফিকেশন ও প্রশাসনিক সনদে প্রক্টরিয়াল অফিসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ– এটি শিক্ষার্থীরা জানে। এই বাস্তবতা শিবিরকে এক ধরনের সুবিধা দিয়েছে, যা ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলেছে।
চতুর্থত, আমাদের সমাজের পুরোনো প্রবণতা– যারা ক্ষমতার আশেপাশে থাকে, সাধারণ মানুষ বা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বাস্তব সুবিধার আশায় তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটি আদর্শের প্রশ্ন নয়, বাস্তবতার প্রশ্ন। ক্যাম্পাস রাজনীতিতেও এই ‘ক্ষমতার নিকটবর্তী হওয়া’র প্রবণতা কাজ করে। শিক্ষার্থীরা সাধারণ নির্বাচনের মতো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে না। তারা দেখে কারা অপেক্ষাকৃত সুসংগঠিত এবং ক্ষমতার কাছাকাছি; তাদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ঝঞ্ঝাটমুক্তভাবে পার করে একটা চাকরি ম্যানেজ করলেই হয়।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের সময়েও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। অনেক বিএনপি সমর্থক অভিযোগ করতেন, সুসংগঠিত কাঠামোর কারণে জামায়াত সুযোগ বেশি নিচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ছদ্ম সম্পর্ক ভেঙে গেছে। এখন জামায়াত ও বিএনপিকে আলাদা পথে চলতে হচ্ছে। এতে বিএনপি ও ছাত্রদলের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে– কে প্রকৃত সমর্থক, আর কে সুযোগসন্ধানী।
এই প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো– সংগঠন পুনর্গঠন করা এবং অন্যান্য প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ইস্যুভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে কল্যাণমুখী ছাত্র রাজনীতি সামনে আনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অন্তত ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে ভোটের পার্থক্য দেখিয়ে দেয়– শিক্ষার্থীরা পুরো প্যানেল ব্লক ভোট দেয়নি; বরং পোস্টভিত্তিক বিচার করেছে। এটি ছাত্রদলের জন্য যেমন সতর্ক সংকেত, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য শেখার সুযোগও।
ড. ফয়সাল কবীর শুভ: গবেষক ও বিশ্লেষক
- বিষয় :
- শিক্ষাঙ্গন
