জন্মদিন
গণমানুষ ও মানবতার শিল্পী ফকির আলমগীর
ফকির আলমগীর
সুরাইয়া আলমগীর
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:১১
গণনায়ক মানবতার গায়ক মেহেনতী মানুষের কণ্ঠস্বর গণশিল্পী ফকির আলমগীর এর জন্মদিন আজ। ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ফরিদপুরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এ প্রথিতযশা শিল্পী সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি; ছোটবেলা থেকেই হয়তোবা তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যাপিত জীবনের পথ বড় দুর্গম, কণ্টকময়। তাকে এ দুস্তর পথ পাড়ি দিতেই হবে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। কালা মৃধা গোবিন্দ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে মায়ের মমতা মাখা আঁচল ছেড়ে গাঁয়ের হালট ছেড়ে চলে আসেন ইট-পাথরের নগরী ঢাকা শহরে। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। ভর্তি হন ঐতিহাসিক জগন্নাথ কলেজে। পল্টনের সেই বাঁশি বিক্রেতা হ্যাজাক বাতির আলোয় বাঁশির মনোমুগ্ধকর সুর তাঁকে আকৃষ্ট করে। গ্রামের ছেলে ফকির আলমগীর বাঁশির সুরে আকৃষ্ট হন, তুলে নেন হাতে বাঁশের বাঁশরী। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে শিল্পী হওয়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছে।
চির তরুণ, চির সবুজ এই শিল্পীকে ক্লান্তি কখনো পরাভূত করতে দেখিনি। চুয়াল্লিশ বছর তাঁর সাথে কাটিয়েছি জীবনের দীর্ঘ সময়। দেখেছি সত্যবাদী, শুদ্ধতার, সততার এক অনন্য মানুষের স্বরূপ। সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুম থেকে গান কণ্ঠে তুলে নেমেছেন রাজপথে, ফকির আলমগীর জাতশিল্পী-দ্রোহে নজরুল, দেশাত্মবোধে জীবনানন্দ দাশ, প্রেমে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় চে-গুয়েভারা। পল্লীনির্ভর বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলে সে সংস্কৃতির শরীরে ও মর্মে লেগে আছে লোকায়ত
মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ,বেদনা,স্বপ্ন,সংগ্রামের আবেগ। লোকজীবন কেন্দ্রিক বাঙালি সংস্কৃতি, হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষকে ঋদ্ধ করেছে। তাদের দেখিয়েছে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কর্ষণ যেমন পতিত জমিকে করে তোলে ফসলের জন্য উর্বর, তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে করে তোলে উন্নত রুচি ও উৎকৃষ্টময় চিত্তের অধিকারী। তেমনি ফকির আলমগীর লোকায়ত লোক গানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে ধারণ কর শত শত সখিনা, শব মেহেরদের দুঃখভরা বেদনার জীবনের আর্তি তাঁর গানে মানুষের মনে এক বেদনার আবহ সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেন। চাকরী করেছেন বাংলাদেশ কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনে। গেয়েছেন গণ সংগীত, চাকুরী করেছেন গণসংযোগে। এই গণ মানুষের শিল্পী সাধারণ মানুষের মাঝে, অমর হয়ে থাকবেন তার সৃষ্টি সৃজনশীলতার মাঝে। তুমি কি আবার আসিবে বই প্রকাশের তাগিদ নিয়ে ছুটবে বইমেলা প্রাঙ্গনে প্রাণের স্পন্দনে। এই দুইটি লাইন তোমাকে নিয়ে লিখা কবিতা অপেক্ষায় লিখেছিলাম । লিখতে গিয়ে অঝোর ধারায় জল নেমে এসেছিলো এই দুটি পাথর চোখ থেকে। ফকির আলমগীর খুব পরিশ্রমী একজন শিল্পী ছিলেন। শত- প্রতিকূলতায় তাঁকে দমে থাকতে দেখিনি। কাজ পাগল মানুষ, গাঁয়ের অজোপাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা ফকির আলমগীর জিরো থেকে হিরো হয়েছিলেন, সেটা সম্ভব হযেছে তার আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, মেধা আর একাগ্রতার জন্য।
১৯৭৬ সালে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন প্রগতিশীল গণসংগীতের দল ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী। বাংলাদেশর সকল গণসংগীত এর দল নিয়ে গঠন করেছেন-গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ফকির আলমগীর। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা একাডেমীর একজন ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য ,পল্লীমা সংসদের আজীবন সদস্য। প্রায় পঁচিশটি বই লিখেছেন। অনেক অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি রয়ে গেছে। ২০১৯ এ পবিত্র হজ ব্রত পালন করেছেন, পবিত্র হজ্জব্রত উপলক্ষ্যে গবেষনা ধর্মী বই ইহরাম থেকে আরাফাত মৃত্যুর ১০ দিন আগে অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো।
২০২১ সালের ২৩ জুলাই সকল স্বজন, পরিবার-পরিজন, ভক্তশ্রোতাকে কাঁদিয়ে, অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বলতে গেলে হঠাৎ করেই চলে যান না ফেরার দেশে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। তখন করোনা ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করেছে সারা দেশে। পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশেই এর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে ছিল মহামারী আকারে। আতঙ্কিত মানুষ। সারা দেশে চলছে লকডাউন। ভয়ার্ত মানুষ,নির্বিকার! বন্দী জীবন সেই পরিস্থিতিতেই ফকির আলমগীর লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন পুরো দমে। ভার্চুয়ালি যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন লাইভ প্রোগ্রামে। হঠাৎ তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে যান পৃথিবী ছেড়ে।
আজ ফকির আলমগীর এর ৭৬ তম জন্মবার্ষিকীতে তাকে আমরা স্মরণ করছি।
সুরাইয়া আলমগীর: প্রয়াত ফকির আলমগীরের সহধর্মিনী; সভাপতি, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী
- বিষয় :
- ফকির আলমগীর
- জন্মদিন
