ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদা কালো

আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি বনাম ‘শোন অ্যারেস্ট’

আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি বনাম ‘শোন অ্যারেস্ট’
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ক্ষমতায় বসেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। সম্ভবত সে কারণেই দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় দিনের মধ্যে– ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যাতে কেউ মামলাবাজির শিকার হয়ে ভোগান্তিতে না পড়েন সেটি নিশ্চিত করা হবে’ (সমকাল, ২৩ ফেব্রুয়ারি)। কিন্তু ঘোষণার মাত্র তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন নিয়ে যা হলো, তাতে একটু ধাক্কা খেলাম।

সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, হত্যার অভিযোগসহ পৃথক পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ছয় মাসের অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এর পরপরই সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আরেকটি হত্যা মামলায় নতুন করে ‘শোন অ্যারেস্ট’ বলা হয় তাঁকে। 

আইভী অবশ্য ওই অন্তর্বর্তী জামিনে এমনিতেও মুক্তি পেতেন না। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে আরও পাঁচটি মামলায় জামিনের শুনানি তখন আপিল বিভাগে অপেক্ষা করছিল। গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁকে গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায়ও হাইকোর্ট থেকে গত বছরের ৯ নভেম্বর জামিন পান আইভী; কিন্তু আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন শুনানির পর ওই জামিন স্থগিত এবং আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানো হয়। সেই আবেদনগুলোই শুনানির অপেক্ষায় আছে। (প্রথম আলো, ২৬ ফেব্রুয়ারি)

তখন দেশে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার; কারণে-অকারণে নাগরিকদের জেলে পোরা হতো। জামিন নিয়েও আদালতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচিত সরকার একই পথ ধরবে কেন? ‘আইনের শাসনে বিশ্বাসী’ সরকার আপিল বিভাগের আইনি পথে ভরসা না পেয়েই আইভীকে ‘শোন অ্যারেস্ট’ করে পূর্বসূরির দেখানো বিতর্কিত পথে হাঁটল? ‘পূর্বসূরি’ বলতে শুধু অন্তর্বর্তী সরকার নয়; আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই ‘শোন অ্যারেস্ট’ আগের সব রেকর্ড ভেঙেছিল। এর যন্ত্রণা ভুক্তভোগী বিএনপি নেতাদেরই সবচেয়ে বেশি মনে থাকার কথা।

আইভী নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, ঠিক। তবে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেছেন বলে শুনিনি। নারায়ণগঞ্জ মহানগরে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থেকেই তিনি ২০০৩ থেকে গত বছর গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত টানা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তো আইভীর জয়ের পথ মসৃণ করতে বিএনপিও নিজ দলীয় মেয়র প্রার্থীকে শেষ মুহূর্তে বসিয়ে দিয়েছিল। সেই আইভীর বিরুদ্ধে বিএনপির সরকার এতটা খড়্গহস্ত!
আইভীর বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলাগুলোর সারবস্তু নিয়ে মন্তব্য করব না। তবে প্রথম মামলাগুলো দেওয়া হয়েছে আইভীকে গ্রেপ্তারের পর। তদুপরি তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার দেওয়া পাঁচ মামলা সম্পর্কে আইভীর আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু বলেছেন, ‘এই পাঁচ মামলার এজাহারে আইভীর নাম নেই, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন, তদন্তেরও কোনো অগ্রগতি নেই– এসব যুক্তিতে আইভীর জামিন চাওয়া হয়। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দিয়ে আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তী জামিন দিয়েছেন’ (প্রথম আলো, ২৬ ফেব্রুয়ারি)।

কাকতালীয় কিনা জানি না, তবে আইভীর সর্বশেষ জামিনের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে নোট দেওয়া হয়েছে বলে যেদিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আশিকুজ্জামান নজরুল জানিয়েছিলেন, সেদিনই তাঁর অধস্তনদের উদ্দেশে লেখা রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের চিঠি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই চিঠিতে তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের যেসব নেতাকর্মী জামিনে মুক্তির পর দলকে শক্তিশালী, সংগঠিতকরণ এবং মাঠ পর্যায়ে তৎপরতা প্রদর্শন করতে সক্ষম তাদের জামিন হওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য নির্দেশনা জারি করেছেন। সমকালের কাছে ওই ডিআইজি চিঠির বিষয়টি স্বীকার করলেও এর উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগ নয়– এমন দাবি করেন। কিন্তু সেই দাবি কেউ বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। 
শুধু আইভী নন; জাতীয়ভাবে ন্যূনতম পরিচিত কোনো আওয়ামী লীগ নেতাই, আজ পর্যন্ত জামিন পাননি। তাদের মধ্যে বহুজন আছেন, যারা আইভীর মতোই বিনা বিচারে মাসের পর মাস কারাগারে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা দলগুলোর অনেক নেতাকে একই ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে। এমনকি কোনো দল না করে আওয়ামী লীগকে সমর্থনের জন্যও অনেক লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী ঢালাও হত্যা মামলার শিকার হয়ে দেড় বছর ধরে জেলে আছেন। তাদের অনেকে জামিন আবেদনে শুনানির সুযোগও পাচ্ছেন না।

ইতোমধ্যে জামিনের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী কারা হেফাজতেই প্রাণ হারিয়েছেন। এ নিয়ে দেশেবিদেশে সমালোচনাও হচ্ছে। আগের হিসাব বাদ দিই, সদ্য বিদায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে হেফাজতে থাকা অবস্থায় মোট ১৩ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যেখানে ৫ হাজতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) গত ১ মার্চ এ তথ্য দিয়েছে। 

এরই মধ্যে নতুন করে চলছে ধরপাকড়। যদিও তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে অনেক কম। গত ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে গিয়ে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ কযেকজন আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। যেখানে সরকার নিজেই বলছে, ৫ আগস্টের পর দায়েরকৃত মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে নিরীহ আওয়ামী লীগ কর্মীদের রেহাই দেওয়া হবে, সেখানে নতুন করে গ্রেপ্তার কী বার্তা দেয়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে-পরে বহুবার প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছেন। রাজনীতিসচেতন সবাই এটিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। কারণ মূলত ওই অসুস্থ রাজনীতিই বিপুল সম্ভাবনার বাংলাদেশকে পেছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে। আর সুস্থ রাজনীতি কেবল বর্তমান সংসদের সরকারি ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সদ্ভাব থাকলেই টেকসই হবে না। এখানে সব দল ও মতের মানুষের জায়গা হতে হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা হতাহত হয়েছেন তাদের জন্য ন্যায়বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তা করার নামে একটা দলকে, জনসংখ্যার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ যে দলের সঙ্গে আছে, রাজনীতির বাইরে রাখাটাও ন্যায়নীতি, বিশেষত কাণ্ডজ্ঞানের পরিচায়ক নয়। চিন্তা বা আদর্শের দিক দিয়ে দলটি যে ধরনের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের বাদ দিলে গণতন্ত্রেরই বা থাকে কী! সর্বোপরি আইনের শাসন বরাবরই সর্বজনীন; কস্মিনকালে তা সিলেকটিভ বা শাসকের পছন্দনির্ভর নয়।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
 

আরও পড়ুন

×