ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যুদ্ধের ঘনঘটায় মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের বিপদ  

যুদ্ধের ঘনঘটায় মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের বিপদ  
×

রুচি কুমার

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৬:১০ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৬:১১

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালানোর পর উপসাগরীয় অঞ্চল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক প্রচারণার মাঝে একটি জনগোষ্ঠীর কথা আড়ালে রয়ে যায়। তারা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী শ্রমিক, যারা এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করে। অথচ উপসাগরীয় অঞ্চলে বেসামরিক হতাহতের অধিকাংশই তাদের অন্তর্ভুক্ত। এসব শ্রমিকরা সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারে কাজ করছেন। 

বিগত অর্ধশতাব্দীজুড়ে উপসাগরীয় অঞ্চল অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে এই অঞ্চলের কর্মশক্তি কয়েক লক্ষ থেকে বেড়ে বর্তমানে আনুমানিক ২.৫ থেকে ৩.০ কোটি অভিবাসী শ্রমিকে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বাসিন্দা। প্রকৃতপক্ষে, উপসাগরীয় অঞ্চলের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক। আবুধাবির জনসংখ্যার ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং দুবাইয়ের জনসংখ্যার ৮৫ থেকে ৯২ শতাংশই অভিবাসী। 
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান এস. ইরুদায়া রাজন কেরালা থেকে ‘দ্য জুগারনাট’ তথা জগন্নাথ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এই সাতটি দেশ— ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সেইসাথে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মধ্যে– ছয়টি উপসাগরীয় অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘দেশগুলো এই অঞ্চলের অর্থনীতির স্তম্ভ হিসেবে ভূমিকা রাখছে, এবং যদি তারা চাপের মধ্যে থাকে, তবে তার প্রভাব এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও প্রভাব ফেলবে।’
তিনি এসময় বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলটি দক্ষিণ এশীয়বাসীর শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘চল্লিশ বছর আগে সেখানে বালি ছাড়া কিছুই ছিল না। আজ এই দেশগুলোর প্রতিটি ভবন অভিবাসী শ্রমিকদের রক্ত ও ঘামে দাঁড়িয়ে আছে।’ আর ধনী প্রবাসী কিংবা অন্য কোনো কারণে এই অঞ্চল ত্যাগ করা এখন কোনো বিকল্প কিছু নয়।

এর একটি কারণ হলো কাফালা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, শ্রমিকরা কার্যকরভাবে তাদের নিয়োগকর্তাদের কাছে জিম্মি থাকে। নিয়োগকর্তা শ্রমিকের অভিবাসন অবস্থা, চাকরির চুক্তি ও আবাসন বা বসবাসের অনুমতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। একারণে তিনি অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার ব্যাপারের হস্তক্ষেপ করতে পারেন। প্রায়শই, নিয়োগকর্তারা বা যে দালালরা তাদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তারা শ্রমিকদের পাসপোর্ট নিয়ে নেয়। তার কাজের অবস্থা বা তার সাথে পাসপোর্ট আছে কিনা, এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বিক্রান্ত নামের একজন অভিবাসী বিস্তারিত জানাতে ভয় পাচ্ছিল। উল্টো সে প্রশ্ন করে বললো– ‘আপনি এগুলো জেনে কী করবেন?’ ‘যা হওয়ার তা-ই হবে।’

দুর্ভাগ্যবশত, উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক হতাহতের পরিসংখ্যানে এই বিষয়টিই ফুটে উঠেছে। এখন পর্যন্ত নিহত এক ডজনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে অন্তত ছয়জন দক্ষিণ এশীয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে দুজন পাকিস্তানি নাগরিক, তিনজন বাংলাদেশি, একজন ভারতীয় এবং একজন নেপালি।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের ৫৫ বছর বয়সী সালেহ আহমেদ, যিনি ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করছিলেন। তার ছেলে আবদুল হক স্কাই নিউজকে জানান, এই সময়ে তিনি দেশে থাকা ছয়জনের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য হোটেল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে গাড়ি ধোয়া ও ঘাস কাটা পর্যন্ত সব ধরনের কাজ করেছেন। আহমেদ যখন পানি সরবরাহ করছিলেন, তখন একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তার গাড়ির ওপর এসে পড়ে। তার ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা যুদ্ধ সম্পর্কে জানতেন না, নইলে তিনি বাইরে যেতেন না। আমরা ক্ষুধার্ত মানুষ, আমাদের কিছুই নেই।’

অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য চলাচলের এই স্বাধীনতা নেই। কাজ না করলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি দিন তাদের দৈনিক মজুরির ওপর প্রভাব পড়ে। অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করেন সৌর দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, ‘এই শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। তাই যখন সংঘাত শুরু হয় অথবা ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাদের এই পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ অনেক কমে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাফালা ব্যবস্থার অধীনে শ্রমিকরা অত্যন্ত খুব কমই সিদ্ধান্তগ্রহণের এখতিয়ার রাখেন। অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়লে তাদের আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং বিপদ থেকে পালিয়ে গেলেও কারাদণ্ড, নির্বাসন কিংবা অন্য কোনো শাস্তি হতে পারে।’

সৌর দাশগুপ্ত আরও বলেন, যদিও কাতারের মতো দেশগুলো বেশিরভাগ শ্রমিকের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতিতে সংস্কার এনেছে, তবুও অনেককে তাদের নিয়োগকর্তাদের আগে থেকে জানাতে হয়। তিনি বলেন, ‘এতে যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থায় শ্রমিকরা সবচেয়ে কম সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা রাখে, এসময় তাদের ইচ্ছার কোনো মূল্য থাকে না। পুরো পরিস্থিতি স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে।’ এ কারণে এত বিপুল সংখ্যক দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তার মতে, ‘এই শ্রমিকরা বন্দর, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো উন্মুক্ত জায়গাতে সম্মুখসারির হয়ে কাজ করতে গিয়ে এবং বোমাবর্ষণকালে আশ্রয়কেন্দ্রবিহীন জনাকীর্ণ এলাকায় বসবাসকালে তারা নিহত হয়েছেন।’

অনেক অভিবাসী শ্রমিকই জানেন যে, কাফালা ব্যবস্থার কারণে নির্যাতন বা এমনকি দাসত্বের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে যাওয়ার জন্য ঋণ গ্রহণের কারণে তাদের কাজ খোঁজা এবং দেশে টাকা পাঠানোর চেষ্টা থেকে দূরে থাকারে সুযোগ নেই। এর অন্যতম কারণ, তাদের নিজ দেশে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নেপালে মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৫০০ ডলারের সামান্য নিচে অবস্থান করে। সৌর উল্লেখ করেন, ‘দেশে থাকা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অনেকেরই তীব্র মজুরির প্রয়োজন রয়েছে।’
৩২ বছর বয়সী নার্গিস দুবাই আসার জন্য ৩ হাজার ডলারেরও বেশি ঋণ নিয়েছেন। প্রবাস জীবনে তিনি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে, তিনি আবার তার ৮ বছর বয়সী মেয়েকে বাংলাদেশের একটি গ্রামে স্বামীর কাছে রেখে এসেছেন। তার পরিবার জীবিকা নির্বাহের জন্য তার আয়ের উপর নির্ভরশীল। নার্গিস বলেন, ‘আমি ফিরতে পারব না। এই চাকরি ছেড়ে ফিরলে আমার স্বামী আমাকে মেনে নেবে না। বোমাগুলো ভীতিকর হলেও আমার উপর নির্ভরশীল মানুষ আছে।’

নার্গিসের মতো বিক্রান্তেরও উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ পেতে গিয়ে ঋণের জালে আটকা রয়েছেন। তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দা। সাতজনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হওয়ায় তিনি কয়েক বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে একটি চাকরি পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি নিরাপদ, সুন্দর দেশ, এবং আমি বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য যথেষ্ট উপার্জন ও সঞ্চয় করতে পারছি।’

রাজন নামের এক প্রবাসী বলেন, যদিও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে, ‘নেপাল ও বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেরই’ একাধিক উদ্ধারকারী ফ্লাইটের খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ৫০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন, কিন্তু ওই অঞ্চল থেকে মাত্র ৩ জনকে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। শ্রীলঙ্কা থেকে বলা হয়েছে যে, তাদের ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৮০৪ জন অভিবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা এখানকার কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ১৭ লাখ নেপালি বাস করেন, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছেন প্রায় ৭ লাখ। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তাদের নাগরিকদের সেখানেই থেকে যেতে উৎসাহিত করছে, যেখানে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ভারতীয় এবং ৩৫ লাখ পাকিস্তানি। আমরা যে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের বেশিরভাগই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষারত। কিন্তু এই যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে তাদের ওপর, যারা উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো চাঙ্গহা রাখতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে; অন্যদিকে দেশগুলো যাদের শোষণ করে। অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী শ্রমিকদের কথাই বলছি।

‘দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা আজিজের ভাষ্য হল, আমার দেশে আমার করার মতো কিছুই নেই।’ তার পরিবার তার জন্য শঙ্কিত, কিন্তু সে ফিরতে রাজি নয়। ‘আমার এখানে কাজ আছে। ওখানে গিয়ে কী করব?’ নার্গিস বললেন, ‘আমাদের মতো মানুষদের নিয়ে আসলে কেউ ভাবে না’। ‘আমাদের জীবন কখনোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় না।’ 

রুচি কুমার: আফগানিস্তান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিবেদক। জগন্নাথ অনলাইন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 


 

আরও পড়ুন

×