চেঙ্গী নদীর নামের বিকৃতি: আমাদের গবেষণায় দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ
চেঙ্গী নদী
ঞ্যোহ্লা মং
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৪:১৯ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ১৪:২২
মানবসভ্যতার বিকাশে নদীর অবদান নতুন করে বলার কিছু নেই। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল নদীকে কেন্দ্র করে। যেমন– সিন্ধু সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, মিসরীয় সভ্যতা ইত্যাদি। যোগাযোগে নদীর গুরুত্ব প্রাচীনকালের মতো এখনও বিশাল। পানির উৎস হিসেবে নদীই ছিল তখন প্রধান উৎস।
পাহাড়, সমতল, নদনদীই বাংলাদেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেশের কোনো অঞ্চলকে নদনদী ছাড়া কল্পনা করা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামও এর ব্যতিক্রম নয়। খাগড়াছড়ি জেলার বড় একটি নদী হলো চেঙ্গী। এ ছাড়া রয়েছে মাইনি এবং ছোট-বড় অসংখ্য ছড়া ও ঝরনা। তাই পাহাড়ের গ্রামগুলোও গড়ে উঠেছিল এক-একটি পানির উৎসকে কেন্দ্র করে। ফলে গ্রামের নামেও আমরা ছড়া, ছড়ি শব্দ পাই। যেমন– সিন্দুকছড়ি, কমলছড়ি, পেরাছড়া ইত্যাদি। শুধু গ্রাম নয়, খাগড়াছড়ি জেলায় উপজেলার নামগুলোতেও ছড়া-ছড়ি পাওয়া যায়। যেমন– মহালছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়ি, পানছড়ি ইত্যাদি। ছোট-বড় পানির স্রোতধারার নামে উপজেলাগুলোর নামকরণ হয়েছে। জেলার বড় নদী চেঙ্গী পানছড়ি, খাগড়াছড়ি, মহালছড়ি হয়ে কাপ্তাই লেকে মিশেছে। অসংখ্য ছড়া, ঝরনার জলের ছোট ছোট ফোঁটার ফসল আমাদের চেঙ্গী নদী।
তাই পাহাড়ের সমাজ, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, গানবাজনা, লেখালেখিসহ উৎসব পার্বণেও চেঙ্গীর উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘চেঙ্গে-মেয়নী হাজলং...’ এই বিখ্যাত গানটি পাহাড়ের মানুষের মুখে মুখে। পাহাড়ের বড় সামাজিক উৎসবের দিনগুলোতে এই চেঙ্গীতে এসে দল বেঁধে গ্রামীণ মানুষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে নামে। মাইসছড়ি থেকে প্রতি প্রবারণা উৎসবে চেঙ্গী নদীতে ময়ূর সাজ সেজে নৌকা ভাসিয়ে বুদ্ধ পূজা করে মারমারা।
চেঙ্গী নদীর ওপর ব্রিজ হওয়ার আগে পর্যন্ত এ নদীর প্রবাহে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। যে বছর ব্রিজ হলো খাগড়াছড়ি জেলা সদরের মানুষের মাঝে চেঙ্গী নদীর গুরুত্ব কমতে শুরু করল। যোগাযোগের মাধ্যম নদীর পরিবর্তে হলো স্থলপথ। মানুষ চেঙ্গীর গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে শুরু করলে।
যে চেঙ্গী নিয়ে মানুষের এত গান, প্রেম, সেই চেঙ্গী কেমন রয়েছে দেখতে সম্প্রতি জামতলী পাড়া হতে চারজন মিলে নদীর নিচের দিকে হাঁটতে শুরু করে শেষ করি চেঙ্গী ব্রিজে এসে। দেখলাম চেঙ্গী নদীর যৌবন আর নেই। এখন শুষ্ক মৌসুমে হেঁটেই পার হওয়া যায়। আমরা পায়ের স্যান্ডেল নিয়ে বালুমাটিতে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আবার কখনেও হাঁটুর নিচ পর্যন্ত পানিতে গল্প করতে করতে স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করি। দিনদুপুরে কড়া রোদে স্বচ্ছ পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটার আনন্দ লিখে প্রকাশ করা কঠিন। ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটতে গিয়ে যেন স্বর্গের অনুভূতি পেলাম।
জামতলীর দিকে ক্ষেতখামার আর পল্টন জয়পাড়ার দিকে ভাঙন দেখে মনে পড়লে নদীর চিরন্তন সত্য সেই লাইনটি ‘এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা...’। এই নদীর খেলায় কতশত পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়েছে, কে হিসাব রেখেছে! পাহাড়ের কতশত ব্যক্তির পরিবার, গ্রামের মানুষের নানান স্মৃতির স্বাক্ষর হয়ে থাকবে তাও অনুধাবন করতে পারি। একই সঙ্গে অনেকের জন্য আনন্দের স্মৃতি, অনেকের জন্য বেদনার স্মৃতি হয়ে মিলেমিশে একাকার হওয়া চেঙ্গী নদীতে বহু বছর পর পা রাখতে পেরে এক ধরনের আনন্দ কাজ করেছে।
চেঙ্গীর পূর্বপার জামতলী পাড়াবাসীদের জন্য হয়তো আনন্দের হবে, প্রতি বছর ক্ষেতের জমি বাড়ছে আর বাড়ছে। অন্যদিকে পশ্চিমদিকের জমি, পাহাড় আর গ্রামের মানুষের জন্য কষ্টের, বেদনার আর ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে থাকবেন দেখে বুঝতে পারি। পরিবারপ্রধানদের জন্য বর্ষাকালের রাতগুলো পিতৃভূমি কিংবা পূর্বপুরুষের শ্মশানসহ নানান স্মৃতিচিহ্ন হারানোর চিন্তা নিয়ে রাতভর নির্ঘুম কাটিয়ে ভোর করার অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে।
দুই কূলের মানুষ যে কেমন থাকবেন সে চিন্তা নিয়ে তো চেঙ্গী প্রবাহিত হয় না। তাই তার প্রবাহ কোথাও থামে না, আগামীতেও থামবে না। প্রবাহের ধারা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় নিমজ্জিত নদীটি দেখে বুঝতে পারি যখন এলাকার বসতিরা বলেন এই নদী কোনো দিনের জন্য শুকিয়ে যায়নি। চেঙ্গী নদীপারের বাসিন্দা আচাই প্রু (৭৫) বলেন, ‘নদীতে সাদা ঘনিয়া, ট্যাংরা মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। জাল ফেললে প্রচুর চাপিলা ধরা পড়ত। অনেকে বড়শি দিয়েও মাছ ধরত। মাছ ধরার জন্য খুব বেশি পরিশ্রম করতে হতো না।’
সংস্কৃতিকর্মী প্রেমেন্দু বিকাশ চাকমা হিলটনের (৭১) মতে, প্রতি বছর পানি কমে এলে প্রচুর সাদা ঘনিয়া মাছ ধরা পড়ত। তাঁর মতে, পানি ছিল আরও স্বচ্ছ। ভাসন্যারা রাঙামাটি হতে পণ্যবাহী নৌকা নিয়ে পানছড়ি পর্যন্ত চলে যেত। এই ভাসন্যারা নামার সময় পাহাড়ের কাঁচা ফলমূল নিয়ে ফিরে যেত। শিল্পী আবুল কাশেম খাগড়াছড়িতে আসেন ৮৭ সালে। তখন তিনি চেঙ্গী পার হয়েছিলেন চাঁদের গাড়িতে চড়ে। গ্রীষ্মকালে চাঁদের গাড়ি চেঙ্গীতে নেমে পার হতে পারত। প্রেমেন্দুর মতে, চেঙ্গী নদীর ওপর ব্রিজ হয় ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে। বর্ষা মৌসুম বাদে কাঁচা রাস্তা দিয়ে চাঁদের গাড়ি চলাচল করত।
একসময় খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল নদীপথ। খাগড়াছড়ি থেকে ইঞ্জিন বোটে মাইসছড়ি পর্যন্ত যেত। সেখান থেকে লঞ্চযোগে মহালছড়ি। মহালছড়ি থেকে আবার লঞ্চযোগে রাঙামাটি যেতে হতো। রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম বাস চলত। সেদিনের দুই-তিন দিনের রাস্তায় এখন তিন-চার ঘণ্টায় চট্টগ্রাম পৌঁছতে পারছি।
আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত সহজ হয়েছে, নদীপথগুলো ততটা অবহেলায় পতিত হয়েছে। মানুষ সভ্যতার নামে যত শহর পত্তন করেছেন, নদীকে দূষিতই করেছেন। জামতলী থেকে হাঁটতে গিয়ে চেঙ্গী নদী যতটা পরিষ্কার পেয়েছি, শহরের দিকে ততটা আবর্জনা দেখেছি। নদী ভ্রমণ শুধু প্রকৃতিকে উপযোগ করার জন্য নয়, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিস কী কী ব্যবহার করি, কিংবা আমরা বাজারে যা কিছু দেখি, পেয়ে থাকি, সবই এই নদীতে বর্জ্য হিসেবে দেখা যায়, যাওয়া যায়। হাঁটতে গিয়ে পানির বোতল, ক্যান, জুসের বোতল, ঔষধের বোতল, সিগারেটের প্যাকেট, প্লাস্টিকসামগ্রী, চিপসের প্যাকেট, রূপচর্চার কাজে ব্যবহৃত নানান উপকরণ যেমন চিরুনি, প্রধাসনসামগ্রীর বর্জ্য, আয়না দেখেছি। হাঁটতে গিয়ে মনে হয়েছে আমরা নদীপথে হাঁটছি না শুধু জীবনের গল্পগুলোর প্রতিচ্ছবিও দেখতে বের হয়েছি।
যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য নদীর বিকল্প হিসেবে স্থলপথ সৃষ্টি করা গেলেও চাষাবাদে সেচের জন্য পানির বিকল্প নেই। তাই চেঙ্গী নদীর দুই ধারে অসংখ্য পানির পাইপ ও সেচযন্ত্রের উপস্থিতি পেয়েছি। জামতলী থেকে চেঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত সেচযন্ত্র পেয়েছি প্রায় ৪৫টি। লক্ষণীয় বিষয় হলো ওপরের দিকে যেখানে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের বসতি রয়েছে, তাদের সেচযন্ত্রগুলো অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। আর শহরের যত কাছাকাছি কিংবা চেঙ্গী ব্রিজের কাছাকাছি এসেছি সেচযন্ত্রগুলো রক্ষার জন্য পাহারাদারসহ রাত্রী যাপনের জন্য ছোট ছোট খড়ের ঘর কিংবা টংঘর দিয়ে সেচযন্ত্রকে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা দেখেছি। শহরের কাছাকাছি গ্রাম, পাড়াগুলো থেকে সেচযন্ত্র চুরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে পাহারার ব্যবস্থা রাখার মধ্য দিয়ে কৃষকের ঘাড়ে আরেক খরচ ও সময়ের বিনিয়োগ যুক্ত হলো বুঝতে পারি।
চেঙ্গীর দুপারের মানুষ এখনও নদীতে এসে স্নান করে, কাপড় কাচে। গ্রামীণ মানুষের জীবনে পরিবারের কাপড় কাচার কাজটি যেন নারীদের জন্যই নির্ধারিত। হাঁটতে গিয়ে যতজনকে কাপড় কাচতে দেখেছি সবাই নারী। আর যত দলকে মাছ ধরতে দেখেছি সবাই বিভিন্ন গ্রামের তরুণ যুবক। নদীতে মাছ নেই। স্বচ্ছ পানিতে ছোট মাছের ছোটাছুটি থাকার কথা থাকলেও তাও নেই। এর পরও তরুণরা জাল ফেলে, মশারির জাল টেনে অতীব ছোট প্রজাতির মাছ ধরার চেষ্টা দেখেছি। তরুণরা বলে, ‘মাছ ছোট হোক, স্বাদে অসাধারণ’। চাষের মাছের ভিড়ে হয়তো এই অসাধারণ স্বাদটুকু পেতে তরুণদের দল কিছু মাছ পাওয়ার চেষ্টা চালায়। বান্দরবান জেলায় শঙ্খ নদীর উজানে গেলে এখনও কিছু মাছের লাফালাফি-দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। জেলেদের নৌকায় কিছু মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু চেঙ্গী নদী একেবারে মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে বেশ কয়েক জায়গায় মরা মাছ ভেসে যেতে দেখেছি। নদীর দুধারে মানুষের হাজারো রকমের কর্মকাণ্ড চেঙ্গীকে বিষাক্ত করে থাকতে পারে।
যেমন দুজনকে পেয়েছি যারা সদ্য ক্ষেতে বিষ প্রয়োগ করে, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নদীতে ধোঁয়া তুলছেন। তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘নদী কেন বিষাক্ত হবে, ধোঁয়ার পর বিষ তো থাকবে না, চলে যাবে অনেক দূরে।’ বুঝতে পারি, নদী দূষণ নিয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই। একইভাবে কিছু জায়গায় বালু উত্তোলন হতে দেখেছি। কথা বলে জেনেছি, তারা গাড়িপ্রতি ২৫০০-৩০০০ টাকায় বিক্রি করে চেঙ্গীর বালু। দিনে ১২-১৫ গাড়ি পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারে। আবার চেঙ্গী ব্রিজের দুধারে ক্রেন দিয়ে চেঙ্গী নদী খনন কিনা, জানার সুযোগ হয়নি। নদীতে নামার জন্য ক্রেন নিজেই এমন একটি রাস্তা বানিয়েছে আগামীতে পর্যটন মোটেলের পাহাড়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। আবার ক্রেন দিয়ে বালু উঠাতে গিয়ে ছোট ছোট পানির ধারা, ছড়াগুলো ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। বর্ষাকালে সেই ছড়ার পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে আমাকে ভাবিয়েছে। আমাদের কাজগুলো যেন অপরিকল্পিত, গোছালো নয়, বলতে পারি।
পাহাড়ের প্রথমদিকের সদরদপ্তর ছিল কাপ্তাই। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজধানীতে একসময় কর্ণফুলীর নদী ধরেই আসতে হতো। ব্রিটিশ শাসকদের লেখায় সেই কথাই পাওয়া যায়। জর্জ পি স্যান্ডারসনের লেখায় আমাদের চেঙ্গী নদীতে মাছ ধরার মজার অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাওয়া যায় তাঁর ১৮৭৬ সালে ২ জানুয়ারি লেখা দিনলিপিতে। পাহাড়ে হাতি ধরতে এসে চেঙ্গী নদীতে বড় বড় মাছ হাতি দিয়ে ধরার বর্ণনাই প্রমাণ করে আমাদের চেঙ্গী নদীতে কেমন মাছ ছিল। হাতি ধরার দিনগুলোতে তাদের জন্য নৌকাযোগে খাবারের রসদ সংগ্রহ এবং সরবরাহ হয়েছিল সেই সময়েও। জর্জ পি স্যান্ডারসন আমাদের চেঙ্গী নদীকে কী নামে লিখে গিয়েছেন সে তথ্য জানা যায়নি। কেননা আমি, ইশতিয়াক হাসানের লেখা বাংলা অনুবাদই পড়েছি। অনুবাদক চেঙ্গী নদীই লিখেছেন। তবে টি এইচ লুইন, তাঁর The Hill Tracts of Chittagong and The Dwellers Therein with comparative Vocabularies of : he Hill Dialects-এ বিভিন্ন নদীর বর্ণনা থাকলেও তিনি কর্ণফুলীর উপনদী হিসেবে উল্লেখ করতে গিয়ে চেঙ্গী নদীকে চিংড়ি নামে উল্লেখ করেছেন। তাঁর লেখা দুটি বইয়ে চেঙ্গী নদী নিয়ে লেখা নেই।
তিনি চেঙ্গী নদীর দিকে আসেননি তা বোঝা যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৮ সালে মার্চ ২ থেকে মে ২১ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক প্রেরিত মসলা চাষের জন্য সম্ভাবনা দেখতে এসে ২৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে চেঙ্গী নদীকে চিমি বা চিংগী নামে উল্লেখ করেন এবং রেনেল ম্যাপেই এই নদীকে চিংড়ি নদী বলা হয়েছে তা নিশ্চিত করেন। সেই থেকে আমরা বুঝতে পারি আসলে রেনেলই চেঙ্গী নদীকে চিংড়ি নদী নামে লিখে যান। এবং সেই থেকে আজও চলমান। বুকানন ১৭৯৮ সালে বুঝতে পারলেও ২০২৬ সালে এসে বাংলার নদী গবেষকরা আজও চিংড়ি নদী নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। সেই থেকে বোঝা যায়, আমাদের দেশে গবেষণা খাতটি বেশ দুবর্ল। যেমন ২০১৫ সালে প্রকাশিত আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত মাহবুব সিদ্দিকীর লেখা ‘আমাদের নদনদী’ বইয়ে ১৫২ পৃষ্ঠায় সপ্তম অধ্যায়ে লিখেছেন ‘কর্ণফুলীর একটি উপনদী চিংড়ি, যার দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার।’ শুধু সিদ্দিকী নন, ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘মানচিত্রে কেমন আমার বাংলাদেশ’ বইয়ে বাংলাদেশে নদীপথ চিত্রে আমাদের চিরচেনা নদীকে বইটির চতুর্থ পৃষ্ঠায় চিংড়ি নামে পরিচিতি করানো হয়েছে। বইটির জয়প্রিয়তাও বেশ, এর দ্বাদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৮ সালে জানুয়ারি মাসে।
সুতরাং ২০২৬ সালে এসে আরও বেশ কয়েকটি সংস্করণ বের হয়ে থাকার কথা। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণবৈচিত্র্যের সন্ধানে’ শিরোনামে ২০২৩ সালে প্রকাশিত মনিরুল খানের বইয়ে ‘ফ্রান্সিস বুকাননের পথ ধরে’ প্রবন্ধে ৭৯ পৃষ্ঠায় চিংড়ি নদীর দেখা পাওয়ার গল্প পাওয়া যায়। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরও তাঁর একটি ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন’ শিরোনামে একটি লেখায় চিংড়ি নদী বলে উল্লেখ করেছেন। এমন উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যাবে। তথাকথিত নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতো এমন অনেক গবেষকের গবেষণা পাওয়া কঠিন হওয়ার কথা নয়। আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক প্রণীত পঞ্চম শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ের ‘বীরের রক্তে স্বাধীন এ দেশ’ শিরোনামে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখকে নিয়ে লেখায় ২৮ পৃষ্ঠায় চিংড়ি খাল উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের মধ্যে ত্রিপুরারা চেঙ্গী নদীকে ডাকে ‘সিয়াই’ নামে, মারমারা ডাকে ‘চইংগী’, আর চাকমারা ডাকে ‘চেঙ্গে’। ‘সিয়াই’, ‘চইংগী’ কিংবা ‘চেঙ্গে’ থেকে বাংলায় চেঙ্গী নামে পরিচিতি হয়ে ওঠা নদীটির নাম সেই ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৮ সালে বিকৃত হয়ে যাওয়া ব্যাপারটি ধরতে পারলেও বাংলাদেশি নদী গবেষক, লেখকরা এখনও চিংড়ি খাল বা নদীতেই পড়ে রয়েছেন।
দেশব্যাপী স্থলপথ সম্প্রসারণের ফলে নদীপথের গুরুত্ব কমে নদীগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের ছেলেবেলায় বালু খেলার আনন্দ এখনকার শিশু-কিশোরদের অজানা হলেও উন্নত বিশ্বে চাইল্ড কেয়ার সেন্টার আর স্কুলগুলোতে বালু দিয়ে খেলার জন্য বালু কর্নার রাখা হয়। আমাদের দেশ নদীমাতৃক হলেও শিশুরা সাঁতার না জানায় প্রায় প্রতিদিন পানিতে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। শিশুদের বালু দিয়ে যেমন খেলার সুযোগ করে দেওয়া হয় না, তেমনি নদীমাতৃক দেশের সন্তানকে পানিতে নামতে দেওয়া হয় না। আমরা প্রকৃতি থেকে শেখার রাস্তা সব বন্ধ করে ফেলেছি।
জামতলী থেকে চেঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত হাঁটতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমাদের স্কুল, কলেজের শিশু-কিশোরদের চেঙ্গী নদীতে ঘুরতে, হাঁটতে দেওয়া উচিত, একটি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস (সহশিক্ষা কার্যক্রম) হিসেবে। শিশুরা পানির উৎসকে চিনবে, নদীকে ভালোবাসতে শিখবে। একই সঙ্গে দূষণ কী জিনিস জানবে, চেঙ্গী নদীতে হাঁটতে গিয়ে দুপারের মানুষের নানান কর্মকাণ্ড দেখে জানবে, দেখে শিখবে। হাঁটতে গিয়ে নদীপারে সূর্যমূখীর ক্ষেত, কড়া রোদে খোলা আকাশের নিচে বালুর চরে পাখিদের বাসা, প্রতি বাসায় কেন তিনটি করে ডিম, বাঁশ বাগান থাকায় তীরের রক্ষা পাওয়ার দৃশ্যসহ জেগে ওঠা বালুর চরে নাম না জানা ছোট ছোট প্রজাতির নানান রঙের ফুল পর্যবেক্ষণ করবে। অন্যদিকে বালু উত্তোলন, শহরকেন্দ্রিক মানুষগুলো নদীকে বর্জ্য অপসারণের কেন্দ্র বানিয়ে তোলার দৃশ্য, শিশুদের মনে নদী রক্ষার চিন্তা গড়ে উঠবে। চেঙ্গী নদীর খড়া কাটিয়ে উঠতে বছরের একটি নিদিষ্ট সময়ে চেঙ্গী নদীর তীরে, স্কুল-কলেজ ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য ট্রেকিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জামতলী থেকে চেঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত একটি দারুণ রুট হতে পারে।
চেঙ্গী নদীতে হাঁটতে গিয়ে আমার বেড়ে ওঠার গল্পগুলো নতুন করে মনে করিয়েছে, নদীকে নতুন করে দেখতে, ভাবতে শিখিয়েছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ পর্যটকদেরও নদীকে ভালোবাসতে শেখাতে পারে আমাদের চেঙ্গী নদী। একইসাথে ছাত্রছাত্রী, পর্যটকদের নদীর কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারলে তাদের মধ্য থেকে প্রকৃত নদী গবেষক, নদী নিয়ে লেখক হয়ে উঠবে। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের একটি বড় নদী তার নাম হারিয়ে চিংড়ি নদী বা খাল নামে বছরের পর বছর লিখে চলেছি, যা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, পানির উৎস অবহেলায় নষ্ট করে দেওয়ার একটি বড় উদাহরণ হিসেবেও দেখতে পারি।
ঞ্যোহ্লা মং: পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি
- বিষয় :
- নদী
- নদী সুরক্ষা
