অনলাইন ক্লাস
সাময়িক সংকটের জন্য যেন শিক্ষার স্থায়ী ক্ষতি না হয়
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট একেক দেশ সামাল দিচ্ছে একেকভাবে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি ঘোষণা করেছে। তারই অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লেন্ডিং পদ্ধতি তথা অনলাইন ও অফলাইনে সমন্বিত ক্লাস পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইনে ক্লাস হতে পারে। আমি মনে করি, অনলাইনে ক্লাস মহানগরী পর্যায়ে ঠিক থাকলেও গ্রামে প্রয়োজন নেই।
বিষয়টি নতুন নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ঈদের আগেই ৯ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশই সম্ভবত প্রথম জ্বালানি সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি-আইইএ সম্প্রতি ‘২০২৬ এনার্জি ক্রাইসিস পলিসি রেসপন্স ট্র্যাকার’ চালু করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পর পাকিস্তান দুই সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। লাওস সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে তিন দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আগের চেয়ে এক দিন বাড়িয়েছে। এদিকে জ্বালানি সংকটে ইন্দোনেশিয়া অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাতিল করে।
দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশ জ্বালানি সংকটে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলেও অনলাইনে ক্লাস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। বাংলাদেশেরও শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালো করে ভাবা জরুরি। খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের শিখন ঘাটতিতে পড়তে পারে। এর আগে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় অনলাইন শিক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও সময়ের আলোকে সিদ্ধান্তহীনতা দেখেছি আমরা, যার ভুক্তভোগী হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ইউনিসেফের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০ শতাংশেরও কম শিশু করোনার সময়ে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিয়েছিল। যারা ক্লাসে অংশ নিয়েছে, তাদের অর্জন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা যেন আগের মতো সংকটে না পড়ে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। সেখানে পরিবহন ও শ্রেণি কার্যক্রমে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ হয়। তা ছাড়া গ্রামের উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থীর অনলাইনে বসার মতো ডিভাইস নেই। শিক্ষামন্ত্রী যদিও বলেছেন, এ সিদ্ধান্তে কেবল মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য; গ্রামের জন্য না। সেটা ভালো।
মহানগর পর্যায়েও এমন ব্লেন্ডিং ক্লাস কতটা উপকারে আসবে, তা নিয়েই প্রশ্ন আছে। যুদ্ধের সাময়িক সংকটের জন্য যেন শিক্ষার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। যুদ্ধ ও জ্বালানি পরিস্থিতির আলোকে আপাতত দুই থেকে তিন সপ্তাহ অনলাইন ক্লাস চলতে পারে। অবস্থার আলোকে পরে ঘোষণা দেওয়া যাবে। ব্লেন্ডিং বলতে আমরা বুঝি নিয়মিত সময়ের মতোই শ্রেণি কার্যক্রম চলবে; তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন হবে অফলাইনে। শিক্ষকরা স্কুলে এসে ক্লাস নেবেন। জোড়-বিজোড় দিন ভাগ করে হবে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস। ক্লাসে স্বাভাবিক হাজিরা, বাড়ির কাজ, মূল্যায়ন কিংবা অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা এমনিতেই ডিভাইসে আসক্ত। অনলাইনে ক্লাস হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে। তা ছাড়া অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রমে অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। সশরীরে শিক্ষক যেভাবে বোঝাতে পারেন কিংবা শিক্ষার্থী বুঝল কিনা– তা যেভাবে অনুধাবন করতে পারেন, অনলাইনে সেটা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকতে হবে, বিদ্যুৎ থাকতে হবে, ইন্টারনেটও থাকা জরুরি। আবার অনেক সময় নানা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, যেটা শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকের পক্ষে বোঝা দায়। ফলে শিক্ষকদের পক্ষে অনলাইনে নির্বিঘ্নে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিনই বলতে হবে।
তার পরও শহর এলাকায় কেবল সাময়িক সংকটের জন্য বিকল্প হিসেবেই ব্লেন্ডিং শ্রেণি কার্যক্রমকে দেখতে হবে। তবে সরকারের জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর খাটালেই হবে না, অন্যান্য বিভাগেও নজর দিতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ কেমন হয় তার স্পষ্ট হিসাব সরকারের কাছে থাকা উচিত।
শিক্ষাব্যবস্থায় যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিকল্পনা, গবেষণা কিংবা ‘গ্রাউন্ড ওয়ার্ক’ করা দরকার, তা দেশে হয় না বললেই চলে। অভিজ্ঞতা বলছে, সরকার যখন যা চায় তার প্রয়োজনীয়তা নিরীক্ষা না করেই শিক্ষার ওপর চাপিয়ে দেয়। যেমন হুট করে সরকার বলছে, শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি বাদ দিয়ে পরীক্ষা হবে। এখন জ্বালানি সংকটে অনলাইন ক্লাসের বিষয়টিও তার বাইরে নয়।
সরকার যদি নাগরিকের প্রাত্যহিক জীবন থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারে, তবে শিক্ষা নিয়েও ভিন্ন চিন্তা করতে পারে। তবে অনলাইনে ক্লাস শুরু হলেও শিক্ষার্থীর শিখন নিশ্চিতে শিক্ষা বিভাগের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলাদা পরিকল্পনা থাকা জরুরি, যাতে কিছুদিন পর পরীক্ষা শুরু হলে সিলেবাস শেষ করেই শিক্ষার্থীরা তাতে অংশ নিতে পারে।
মাহফুজুর রহমান মানিক:
জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
