সাদা কালো
সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার বিতর্ক
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কার ইস্যুটির পিছু ছাড়ছে না বিতর্ক। তদুপরি এ বিতর্ক যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, নতুন নতুন বিতর্ক জন্ম নিচ্ছে।
জুলাই সনদটি তৈরি হয়েছে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আহ্বানে ৩০টি রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ আলোচনার ফল হিসেবে। বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাস্বরূপ সংবিধান, প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে দেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দলিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ ২৫টি দল বেশ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করে গত বছরের ১৭ অক্টোবর। তখনই জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কিছু দল অভিযোগ তোলে– সনদটিতে একটি বিশেষ দলের মত প্রাধান্য পেয়েছে। ওই অনুষ্ঠানে জামায়াত সনদে স্বাক্ষর করলেও এনসিপি তাও করেনি। এই দল স্বাক্ষর করেছে নির্বাচনের পর। সনদে বেশ কিছু বিষয়ে বিএনপি ও তার মিত্রদের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লিখিত ছিল। উপরন্তু বলা হয়েছিল– সংসদই এ সনদ পাস করবে। যদিও জামায়াত-এনসিপির দাবি ছিল– এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। তাদের আরেকটা দাবি ছিল, প্রধান উপদেষ্টাকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করতে হবে, যা প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনি ভিত্তি দেবে।
দৃশ্যত জামায়াত-এনসিপির দাবি মেনেই সরকারের পরামর্শমতে রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। সেখানে ওই সনদ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়।
পরে গণভোটের জন্য যে প্রশ্ন তৈরি করা হয় তাতে সনদের বিভিন্ন ধারায় বিএনপি ও অন্যান্য দলের আপত্তিগুলো রাখা হয়নি। তখনই বিএনপি ও তার মিত্ররা প্রতিক্রিয়া জানায়– সনদটি কিছু দলের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। কিছু দল বলতে তারা মূলত ড. ইউনূসের ‘ব্লু-আইড বয়’ এনসিপির দিকে আঙুল তোলে।
শেষ পর্যন্ত গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হলেও বিএনপির বিজয়ী প্রার্থীরা ওই আদেশের বিধান অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অসম্মতি জানান; শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। জামায়াত-এনসিপি জোটের ৭৮ এমপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সংবিধানে নেই। তাই তারা সেই শপথ নেননি। সংবিধানে এর বিভিন্ন ধারা সংশোধনের যে নিয়ম বলা আছে সেটি মেনেই তারা জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবেন। অন্যদিকে, জামায়াত-এনসিপির বক্তব্য, তারা সংবিধান সংশোধন নয়; ‘সংস্কার’ চান। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ লাগবে। মঙ্গলবার সংসদেও বিরোধীদলীয় নেতাসহ ও অন্য সদস্যরা তা পরিষ্কার করেছেন। ফলে বিতর্কটা দাঁড়িয়ে গেল সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার হিসেবে।
অনেকের ধারণা ছিল, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বিএনপি যখন সংবিধানের বাইরে যেতে চাচ্ছে না, বিতর্কটি ওখানেই শেষ হয়ে যাবে। তদুপরি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে অনুমোদিত হতে হবে। যেগুলো এ সময়ের মধ্যে হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশও বাতিলের এ তালিকায় পড়ে গেছে। সংসদের চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই আদেশেরও অপমৃত্যু ঘটবে।

কিন্তু গণভোটে অনুমোদিত জুলাই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের জন্য গত রোববার বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশ দিয়েছিলেন। এর ওপর মঙ্গলবার দুই ঘণ্টা বিতর্ক চলে। শেষ খবর হলো, এ বিষয়ে প্রতিকার না পেয়ে বিরোধী দল বুধবার ওয়াকআউট করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক কি এখানেই শেষ হবে?
প্রসঙ্গত, ঐকমত্য কমিশনে গণভোট বিষয়ে বিএনপি সম্মতি দিয়েছিল। এমনকি তারা জুলাই সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পক্ষে ছিল, যদিও এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিপক্ষে ছিল। অর্থাৎ জুলাই সনদ নিয়ে শপথের আগ পর্যন্ত সব বিষয়েই বিএনপি অন্যদের সঙ্গে মোটামুটি ঐকমত্য পোষণ করে এসেছে। বিএনপি এখন বলছে বটে, গণভোট তারা মেনে নিয়েছিল কৌশলগত কারণে। তাদের ভয় ছিল– গণভোট না মানলে হয়তো পরম কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচনও হবে না।
এখন বিশেষত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবারের বিতর্কে অংশ নিতে গিয়ে যে চাঁচা-ছোলা ভাষায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং তার সূত্র ধরে রাষ্ট্রপতি ও সিইসি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সমালোচনা করেছেন, তাতে মনে হয় না– সংবিধানের বাইরে যাবে বিএনপি। তিনি রাষ্ট্রপতির ওই আদেশের কোনো ‘বৈধতা নেই’ দাবি করে বলেছেন, এটি ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল।’ বিএনপির কোনো নীতিনির্ধারককে এর আগে এমন কঠোর ভাষায় অন্তর্বর্তী সরকারকে সমালোচনা করতে দেখা যায়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ফরমান জারির নজির দিয়ে বলেন, সংবিধান ও আইন মানুষের জন্য। কিন্তু এতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য থেকে সরেননি। তিনি বরং অভিযোগ তোলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম বিতরণ করে সিইসি শপথ ভঙ্গ এবং সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
রাষ্ট্রপতি ও সিইসির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের পর প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কি জেনেশুনে প্যান্ডোরার বাক্স খুলতে চাচ্ছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, তাঁকে এ কাজে বাধ্য করা হয়েছে। তাহলে এ ‘অবৈধ’ কাজের দায় গিয়ে পড়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার ওপর।
বিশিষ্ট আইনজীবী জেড আই খান পান্নাকে বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি ও সিইসি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিণতি নিয়ে বুধবার প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি পরিষ্কার বললেন, ‘বিএনপি হয়তো এসব নিয়ে এগোবে না। তবে আত্মসম্মান থাকলে সিইসির পদত্যাগ করা উচিত।’
এদিকে যারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে, তারা বলছেন, গণভোটে প্রকাশিত জনমতের বৈধতা অকার্যকর হয়ে যায় না। ফলে সরকার বাস্তবায়ন না করলেও এর একটি আইনি ভিত্তি থেকেই যাবে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম মনে করেন, ‘বিএনপি সংবিধান সংশোধনের কথা বলছে। এটা সংশোধনের অযোগ্য। সংস্কার মানে সংশোধনী না। সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে এটি বড় সংকটের জন্ম দেবে’ (বিবিসি বাংলা)।
এ শঙ্কা সম্পর্কে আমি জেড আই খান পান্নার মত জানতে চেয়েছিলাম। তাঁর উত্তর– একেবারেই না। দুই-তৃতীয়াংশ শক্তির জোরেই বিএনপি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। সাধারণ মানুষও সংবিধান সুরক্ষার পক্ষে।
বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন জোটসঙ্গী ছিল। দল দুটোর ভোটব্যাংকও অনেকাংশে অভিন্ন। তাই যে কোনো ইস্যুতে সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া বিএনপির পক্ষে কঠিন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আপাতত মাঠের বাইরে থাকলেও তার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী বর্তমান সংবিধানের প্রবল সমর্থক। গত নির্বাচনে এদের একাংশের ভোট পেয়েছে বিএনপি। ফলে বিএনপি দুকূল রক্ষা করতে গিয়ে সংসদের ওই বিতর্ক কতদূর নিয়ে যাবে, নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
