ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

স্বাস্থ্য খাতের কাঠামো বেড়েছে, সেবা নয়

স্বাস্থ্য খাতের কাঠামো বেড়েছে, সেবা নয়
×

রাজেশ অধিকারী

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক মানবাধিকার। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতালে এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগগ্রতি। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে নাগরিক অংশগ্রহণ ও নাগরিক নজরদারি এখন অপরিহার্য উপাদান। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী গুরুত্বপূর্ণ সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি আশার সঞ্চার করেছে। শুধু রাজনৈতিক দল কিংবা সরকারের পক্ষে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীলতা।

শিশুমৃত্যুহার এখনও উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ; পুষ্টিমান অনেক নিম্নস্তরে; জন্মহার বেড়েই চলেছে; চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি– এসবই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার প্রতিফলন। শুধু ভবন, যন্ত্রপাতি বা জনবল বাড়ালেই সেবার মান নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন সেবার গুণগত মান, প্রাপ্যতা, জবাবদিহি ও নাগরিক সম্পৃক্ততা। 

স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন না করে একে সম্প্রসারিত চিকিৎসা খাত বানিয়ে ফেলেছি। যেখানে কাঠামো আছে কিন্তু নেই কাঙ্ক্ষিত সেবা, মানবিকতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বৈষম্য এখন সর্বজনবিদিত। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য, গ্রাম-শহরের মধ্যে বৈষম্য এমনকি যেখানে ৭৫ শতাংশ রোগী সেবা নিতে যায় অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মাধ্যমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য। শিক্ষার অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, শহর থেকে দূরের গ্রামে বসবাস, এমনকি হাওর বা পাহাড় অঞ্চলে বসবাস করলেও সেবা কম পাওয়া যেন সাধারণ ব্যাপার। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কিংবা ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়’– এ যেন নিতান্তই রসিকতা। বর্তমান দেশের জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে, যাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাব লক্ষণীয়। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

চাই এমন স্বাস্থ্যসেবা যেন তা সবার জন্য সমানভাবে পৌঁছায়। যেখানে রোগী এবং চিকিৎসক শুধু টাকা নয়, মানবিক দৃষ্টি ও পেশাদারিত্বে দেখা যায়। যেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত ওষুধ এবং অভিজ্ঞ ডাক্তার সবার নাগালের মধ্যে থাকবে। স্বাস্থ্যসেবা যেন রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় না হয়ে বাস্তব জীবনের একটি দায়িত্বপূর্ণ ও স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেন সংখ্যাগত উন্নয়নের পরিবর্তে গুণগত পরিবর্তন হয়। 

নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিবর্তনে কেবল সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় ও সংগঠিত অংশগ্রহণের সুযোগ। কারণ একটি জবাবদিহিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে তখনই, যখন নাগরিকরা সচেতন থাকে, প্রশ্ন তোলে এবং সমাধান দাবি করে।

স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের মাধ্যমে সেবার মান যাচাই, সেবাগ্রহীতাদের সন্তুষ্টি যাচাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণশুনানি, নিয়মিত সংলাপ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো যেতে পারে। এতে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান উন্নয়নের চাপ তৈরি হবে। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত মূল্যায়নকারী হিসেবে গড়ে উঠবে সেবাগ্রহীতা সাধারণ মানুষ। কোনো প্রতিষ্ঠানে ডাক্তার উপস্থিত আছেন কিনা, ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কিনা, আচরণ কেমন, সময়মতো সেবা মিলছে কিনা– এসব বিষয় ভালোভাবে বোঝেন রোগী ও তাঁর পরিবার। যখন নাগরিকরা প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে এবং মতামত দিতে পারবে, তখন অনিয়ম কমে সেবাদাতার দায়িত্ববোধ বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠান মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত হতে শুরু করবে। অতএব বলা যায়, যেখানে নাগরিকের কণ্ঠস্বর থাকে, সেখানে সেবার মান উন্নত হয়। 
দেশের যুবসমাজের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্ম শুধু ভবিষ্যৎ নয়; বর্তমানেরও শক্তি। স্বাস্থ্য অধিকার, পুষ্টি, প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচক প্রচারণায় তরুণ প্রজন্ম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। 

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে। যেখানে একজন দরিদ্র কৃষক, একজন গার্মেন্ট শ্রমিক কিংবা একজন শহুরে শিশু সবার জন্য সমান মানের চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। যেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পরিবারকে সর্বস্বান্ত হতে হবে না এবং কোনো মা তাঁর শিশুকে বিনা চিকিৎসায় হারাবে না। কিশোর-কিশোরী, নারী এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য সব সেবাকেন্দ্র প্রস্তুত থাকবে। নাগরিক অংশগ্রহণ ও নাগরিক নজরদারি স্বাস্থ্যসেবাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক করে তুলবে। অতএব, টেকসই ও মানসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত করাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।

রাজেশ অধিকারী: স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নকর্মী 
[email protected]  

আরও পড়ুন

×