ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদাকালো

শিরীন শারমিন কি জোহরা তাজউদ্দীন হতে পারেন?

শিরীন শারমিন কি জোহরা তাজউদ্দীন হতে পারেন?
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রেপ্তারের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মুক্তি পেয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। রোববার দুপুরে ঢাকার এক আদালত তাঁকে জামিন দেন এবং সেদিনই সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে তিনি ছাড়া পান। গত ৭ এপ্রিল ধানমন্ডি থেকে আটক করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়ের করা এক হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। 

মামলা দায়েরের প্রায় দুই বছর পর আকস্মিকভাবে কেন শিরীন শারমিনকে গ্রেপ্তার করা হলো; আবার কারাগারে ‘মাত্র’ পাঁচ দিন রেখে কেন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো– এ নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কৌতূহল স্বাভাবিক; যেখানে আওয়ামী লীগের নেতারা তো বটেই, এমনকি সমর্থক বলে পরিচিত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও অনুরূপ মামলায় দিনের পর দিন রিমান্ডে থেকেছেন, সেখানে শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে দুদিনের রিমান্ড আবেদনও মঞ্জুর হয়নি। অনেকের মাসের পর মাস কারাগারে আটকে রাখা এবং জামিন না মেলা বা শুনানিও না হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করলে শিরীন শারমিন ‘অস্বাভাবিক’ দ্রুততায় মুক্তি পেয়ে গেছেন। 

প্রসঙ্গত, গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত অর্ধডজন মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর। তার মধ্যে তিনটিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ, বাকি তিনটি তদন্তাধীন। ওই তদন্তাধীন মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। অন্যদিকে আরেক আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনবারের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন একাধিকবার হলেও নতুন নতুন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

সন্দেহ নেই, প্রশ্নবিদ্ধ মামলা ও প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার সাবেক স্পিকারের দ্রুত মুক্তি পাওয়াই আইনের স্বাভাবিক গতি। আইভী বা অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা সরকারের চক্ষুশূল; তাই শিরীন শারমিনকেও তা হতে হবে– এমন কোনো কথা নেই। তবে অনিয়মের দেশে হঠাৎ কোনো নিয়ম মানা হলে তাতে আমজনতার ভ্রু একটু কুঁচকাতেই পারে। সেদিক থেকে এর পেছনে অন্য কিছুর অনুসন্ধানও দোষের কিছু নয়।
মনে আছে, শেখ হাসিনা সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হন। মাত্র দুদিন পর সকালে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর, বিকেলেই ছয় মামলায় জামিন হয় তাঁর। তখন জোর গুঞ্জন উঠেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ গঠনের চেষ্টা করছে। সেখানে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারী সাবের চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। আওয়ামী লীগ সমর্থকও অনেকে বলেছিলেন, দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার আস্থাভাজনদের তালিকায় সাবের চৌধুরী আছেন। তাঁকে হয়তো দলীয় মুখপাত্র করা হতে পারে।

২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর গুলশানে সাবের চৌধুরীর বাসভবনে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান তিন দেশের (নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেন) রাষ্ট্রদূতের একটি বৈঠকের খবর প্রকাশিত হলে সেই জনশ্রুতি কিছুটা ভিত্তিও পায়। তবে সেসব গুঞ্জন ইতোমধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এখন তা শুরু হয়েছে শিরীন শারমিন ঘিরে।
স্বীকার্য, সাবের চৌধুরীর মতোই শিরীন শারমিন চৌধুরী পরিণত বয়সে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। তবে দুজনের মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট। ১৯৯৬ সালে অন্য কয়েক সফল ব্যবসায়ীর সঙ্গে

আওয়ামী রাজনীতিতে যুক্ত হয়েই সাবের চৌধুরী এমপি ও উপমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময়ে সভানেত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার মতো অত্যন্ত প্রভাবশালী দলীয় পদ পেলেও ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময় তাঁর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। সেই সরকারের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র সমর্থক হিসেবে দলীয় মহলে তিনি পান ‘সংস্কারপন্থি’ তকমা। ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেও মন্ত্রী হতে পারেননি। 
অন্যদিকে শিরীন শারমিন ছিলেন ‘ওয়ান ইলেভেন’ শাসনামলে কারাবন্দি শেখ হাসিনার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য। ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিপুল আস্থাভাজন হিসেবে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত এবং পরবর্তী দুই সংসদে একই দায়িত্বে থাকেন তিনি। 

২০১৩ সালে তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে শূন্যস্থানে শিরীন শারমিনকে বসাতে ওই বছরের এপ্রিলের শেষদিকে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হয়। সেখানে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাত্রজীবনে শিরীন শারমিনের মেধার কথা উল্লেখ করেন এবং ‘দলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে’ স্পিকার পদে তাঁর মনোনয়নের কথা জানান। তিনি শিরীন শারমিন চৌধুরীর মনোনয়নকে দলের জন্য ‘বিনিয়োগ’ বলেও মন্তব্য করেন (প্রথম আলো, ১ মে ২০১৩)।

আওয়ামী লীগে শিরীন শারমিনের গ্রহণযোগ্যতার আরেকটা কারণ হলো, তাঁর বাবা রফিকউল্লাহ চৌধুরী। তিনি ১৯৫৭-৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৬১ সালে সিএসপি অফিসার হলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে লিপিবদ্ধ তোফায়েল আহমেদসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য অনুসারে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে থেকেই রফিকউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন।
এ ছাড়া সাবের হোসেন চৌধুরীর মুক্তির ব্যাপারে যেমন, তেমন শিরীন শারমিন চৌধুরীর বেলায়ও ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের ভূমিকা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। সাবের যেমন ছিলেন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সভাপতি, তেমনই শিরীন ছিলেন কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের(সিপিএ) সভাপ্রধান। শিরীনের গ্রেপ্তারেও গভীর ‍উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউরোপীয় ও বৈশ্বিক সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো (সমকাল, ১০ এপ্রিল)। 

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন উদ্যোগের পেছনে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক বিন্যাসের সম্পর্ক উড়িয়ে দেওয়া যায়? স্থিতিশীল বাংলাদেশ চাইলে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা জরুরি– এমন কথা শুধু ভারত বলছে না; ইইউ বারবারই বলেছে। কিন্তু সরকার ও তার অভ্যুত্থানের মিত্ররা গণঅভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগকে হুবহু গ্রহণ করতে রাজি বলে মনে হয় না। সেখানে শিরীন শারমিন ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব’ হিসেবে উভয় পক্ষেরই জন্য ‘কমন গ্রাউন্ড’ জোগাতে পারেন। তাঁর দলীয় আনুগত্য যেমন প্রশ্নাতীত, তেমনই সজ্জন ও বিনয়ী ভাবমূর্তির কারণে বিরোধীদের কাছেও গ্রহণযোগ্য। 

আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এমন ব্যবস্থা কিন্তু নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর প্রধান সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে জোহরা তাজউদ্দীনের নেতৃত্বের ভূমিকা স্মরণ করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রধান নেতা তাজউদ্দীনের স্ত্রী ও সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে জোহরা তাজউদ্দীন যে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ধারণ করতেন, সেটা হয়তো শিরীন শারমিনের নেই। তবে একেবারে আনকোরাও তো নন। 

বিশেষত শিরীন শারমিনের গ্রেপ্তার ও মুক্তি প্রায় সর্বমহলে যে উদ্বেগ ও স্বস্তি তৈরি করেছিল, তা একজন রাজনীতিকের জন্য অমূল্য সম্পদ। শিরীন শারমিনের ওপর আওয়ামী লীগ যে ‘বিনিয়োগ’ করেছিল, তা কতখানি কাজে লাগবে, সেটা বোঝার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে অবশ্য।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×