সমকালীন প্রসঙ্গ
এখনকার হিরোরা কেন ‘উল্টোপথে ও উল্টোরথে’
নাজমুল আহসান
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ হঠাৎ নায়ক হয়ে উঠছেন আমাদের দেশে। আবার হারিয়েও যাচ্ছেন সেভাবে। গণমাধ্যম অথবা সামাজিক মাধ্যম; সব জায়গা যেন ‘নায়ক উৎপাদন’-এর দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু এ হিরোরা কি সত্যিই সমাজের প্রয়োজন থেকে তৈরি, নাকি তারা বর্তমান বাজার ব্যবস্থার একটি পণ্য?
সকাল-বিকেল নায়ক হয়ে ওঠা এসব চরিত্রের সঙ্গে থাকে নির্মাতাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফলে একজন তাঁর কাজের জন্য যতটা পরিচিত হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন একটি ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে। এখন আরও যুক্ত হচ্ছেন ডজন ডজন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিখ্যাত ও তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দেশের কোন পরিবর্তন কতটুকু টেকসই হয়েছে? তাদের নিয়ে পৃষ্ঠাজুড়ে খবর ছাপা হয়; নাম না-জানা ব্যক্তিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন তাদের অগুনতি ভূমিকা নিয়ে। অথচ খুঁজতে গেলে না পাওয়া যায় তাঁর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, না জানা যায় অবদানের কথা।
কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য; নায়ক তৈরির এই প্রবণতা সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে– ‘সাধারণ’ বনাম ‘বিশেষ’। অথচ ইতিহাস অন্য কথা বলে। একসময় নায়ক হয়ে উঠতেন তারা, যারা দীর্ঘ সময় ধরে সমাজের জন্য কাজ করেছেন; যাদের জীবন সংগ্রাম ও দায়বদ্ধতার প্রতীক। এখন সেই জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা, ভাইরাল ভিডিও আর মিডিয়ার স্পটলাইট। অভিজ্ঞরা বলছেন, এখন হিরো বা হিরোইন বানানো একটা প্রজেক্ট। এ প্রজেক্টের কাজই হচ্ছে প্রবঞ্চনা করে হলেও মানুষের মনে মিথ্যা আশার সঞ্চার করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার। ফলে প্রায়ই দেখা যায়, এই হিরোরা মুহূর্তেই হিরো থেকে জিরো হয়ে যায় আর আমরা বোকা বনে যাই তাদের সদর-অন্দর দেখে।
উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা বলা যায়। যারা এখানে হিরো হলেন; মাস্টারমাইন্ড বানানো হলো; পরবর্তী সময়ে তাদের নৈতিকতা ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। অধিকন্তু সবই যেন ‘উল্টোপথে ও উল্টোরথে’। এখানেই কি শেষ? সুশাসন ও ন্যায়বিচারের কথা বলে একসময় একেকজন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। সেই তারাই যখন এর নাম করে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন, তা থেকে যোজন যোজন দূরে হেঁটেছেন। কেউবা কোনো এক সম্মেলনে এমন এক উপস্থাপনা দিয়েছেন, তার সুনামের রেশ যেন কাটছেই না। আসল কাজের সময় দেখা গেল ফলাফল শূন্য। একইভাবে ক্ষুদ্রঋণকে দীর্ঘদিন ধরে সমাজ পরিবর্তনের জন্য এক আশ্চর্য আলাউদ্দিনের চেরাগ বানানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ ও থ্রি জিরো তত্ত্ব যেন বক্তৃতার মঞ্চ ও পুরস্কারের বয়ানেই বেশি মানায়; মানুষের জীবনের পরিবর্তনে নয়। হিরোদের এ রকম উদাহরণ তো এখানেই শেষ নয়। আগে ও পরে এ রকম ডজন ডজন দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যায়।
তথাকথিত এই হিরো অনেকেই বিদেশি ডিগ্রিধারী, বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত। তবে আমাদের সামাজে তাদের ভূমিকা কতটুকু– প্রশ্নসাপেক্ষ। শুধু তাই নয়, কখনও কখনও তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ; কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে ঘুরপাক খায়। নায়ক হওয়া বা নায়ক তৈরির পেছনের গল্প খুঁজতে গেলে স্পষ্ট হয়– এখানে গভীর রাজনৈতিক ও শ্রেণিগত স্বার্থ রয়েছে।
অন্যদিকে নিম্নবর্গ থেকে ‘নায়ক’ তৈরি করা হয় ভিন্ন কৌশলে। তাদের সংগ্রামকে ব্যবহার করা হয় আবেগ তৈরির উপকরণ হিসেবে। কিন্তু সেই আবেগ খুব কমই বাস্তব চর্চা ও কাঠামোগত পরিবর্তনে প্রতিফলিত। ৯০-এর গণআন্দোলনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা নূর হোসেনকে হিরো মানছি, কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রকে ধারণ করতে পারিনি। আবার কখনও কখনও ‘লোক দেখানো সহমর্মিতা’, যেখানে এই সহমর্মিতাও যেন একটি পণ্য ও সহজে বিপণনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের ভাইরাল কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বাসিন্দা মো. তাইজুল ইসলামের কথা বলা যায়, যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘তাজু ভাই’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। একইভাবে হিরো আলম আমাদের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসতে থাকেন নানা উপলক্ষে।
এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে নায়ক তৈরি করে সমাজের কী উপকার হচ্ছে? ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারকে ‘মব’ তৈরির কারিগর হিসেবে দেখেছি। যারা জনগণকে ব্যবহার করেছেন, তাদের আবেগ নিয়ে খেলেছেন। অধিকন্তু এসব তথাকথিত হিরোর দাপটে সমাজের প্রকৃত পরিবর্তনকারীদের অনেক সময় আমরা দেখতে পাই না।
নায়ক তৈরির এই পুরো প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতমুখী। এটি সমাজকে কিছু মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। পক্ষান্তরে সাধারণ মানুষকে সুবিধাভোগী শ্রেণির একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত হতে শেখায়। এটি মানুষের সক্ষমতায় বিশ্বাস করে না; বরং বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে এবং সমাজের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে আরও বেশি ক্ষমতায়িত করে।
উদ্বেগ হচ্ছে, আমরা এ প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমরা হিরো খুঁজি, হিরো বানাই। কিন্তু প্রশ্ন করি না– এই হিরোদের প্রয়োজন কেন? কেন আমরা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে উঠছি, যেখানে প্রয়োজন ছিল সাধারণ সমষ্টিগত শক্তির বিকাশ।
একটি সুস্থ সমাজে নায়ক থাকতে পারে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক, দৃষ্টান্তমূলক ব্যক্তি থাকতে পারেন। কিন্তু নায়কসর্বস্ব নির্ভরতা থাকতে পারে না। আমাদের দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর জবাবদিহি এবং অংশগ্রহণমূলক নাগরিক শক্তি।
হিরোদের ওপর অতিনির্ভরশীল, অতিরিক্ত বিশ্বাস স্থাপন সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। পাঠক, আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পথপরিক্রমার সঙ্গে কি এর কোনো মিল খুঁজে পান? উত্তরটা আপনার কাছেই আছে। ভেবে দেখুন, সস্তা সামাজিক মাধ্যমের বরাতে এক রাতে নায়ক হয়ে ওঠা মানুষের ওপর আপনি কতটা ভরসা করবেন। নাকি খুঁজবেন সেই মানুষকে যে নায়ক হতে আসেনি; এসেছে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। পছন্দটি আপনার।
নাজমুল আহসান: উন্নয়নকর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
