চট্টগ্রামে সংঘর্ষ
শিক্ষাঙ্গনে কোপাকুপির রাজনীতি ফিরে আসছে?
ছবি: সমকাল
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১৫ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:২০
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার মঙ্গলবারের সংঘর্ষ অশনিসংকেত দিচ্ছে। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং সেখানে অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক। শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থান ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার যে বার্তা জুলাই অভ্যুত্থান দিয়েছিল, সেখান থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোর চ্যুতি লক্ষণীয়।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ঘটনাটি খেয়াল করা যাক। সেখানে একটি গ্রাফিতির নিচে লেখা ছিল ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। পরে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী সেখানে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে তার ওপর ‘গুপ্ত’ লিখে তার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। বিষয়টি নিয়েই ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যকার উত্তেজনা সংঘাতে রূপ নেয়।
এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অসহিষ্ণুতা আমরা দেখেছি। ছাত্রদল নেতা গ্রাফিতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং এতে তার বীরত্ব দেখানোর জন্য সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারও করেছেন। বিষয়টিতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা চুপ করে থাকতে পারতেন। খবরের ভাষায়, তারা ‘বাগ্বিতণ্ডায়’ জড়িয়েছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বাগ্বিতণ্ডায় থেমে থাকেনি। দফায় দফায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে লাঠিসোটা এমনকি কিরিচের ব্যবহার হয়েছে। একজনের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবর ও ভিডিও আমরা দেখেছি।
এই সময়ে তুচ্ছ কারণে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দুঃখজনক। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখনই সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়, তখনই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজেও ক্লাস পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার ভয়ানক দিক হলো, ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের বাইরেও পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেছে দুটি ছাত্র সংগঠন। সংগত কারণেই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও কাদা ছোড়াছুড়ি দেখা গেছে।
আরও বড় বিষয় হলো, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মুরুব্বি সংগঠনের নেতারাও এ ঘটনায় থেমে নেই। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, প্রতিকূল সময়েও হেলমেট ও হাতুড়ি বাহিনীর ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে সক্রিয় ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তাঁর ভাষায়, অতীতে ছাত্রশিবির যেভাবে গোপনে ছাত্রলীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে কার্যক্রম চালিয়েছে এবং এখনও ছদ্মনামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে, তা সুস্থ রাজনীতির পরিপন্থি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বহিরাগতসহ ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা দিয়ে পৈশাচিক ও বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীকে ভয়াবহভাবে আহত করেছে। ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা শিক্ষাঙ্গনে যে বর্বরতা ও সহিংসতা চালাল, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও উদ্বেগজনক। মাহদী আমিন কিংবা গোলাম পরওয়ার উভয়ে যদিও সহিংসতা পথ পরিহার করে শিক্ষাঙ্গনে শান্তির কথা বলেছেন। প্রশ্ন হলো, তাদের এই অবস্থানের মাধ্যমে আদৌ শান্তি ফিরে আসবে?
আশঙ্কার বিষয়, ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির পুরোনো যে ধারা রয়েছে, সে ধারাই শিক্ষাঙ্গনে সক্রিয় হচ্ছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সে ধারার বিলুপ্তি চাইছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মাঝখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাঙ্গনে কিছুটা কম দেখা গেছে। এখন বিএনপি যেহেতু সরকারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেহেতু সরকার দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছে, সে কারণেই লেজুড়বৃত্তিই স্পষ্ট। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল শিক্ষাঙ্গনে হয়তো নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মতো তাদের দাপট দেখাতে চাইবে।
যেহেতু ছাত্রলীগের পরিণতি সবাই দেখেছে, সেখান থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোকে শিক্ষা নিতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পরিবেশ চায়, আগের মতো আর হানাহানি সংঘর্ষ চায় না। ছাত্রদলের পাশাপাশি শিবির ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোকেও এ ক্ষেত্রে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিবাচক বিষয় হলো, এখনও সবার মুখে মুখে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি, সহাবস্থান ও পড়াশোনার পরিবেশের কথাই শুনছি। বাস্তবে তা-ই করতে হবে। হঠাৎ করে শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্র কোত্থেকে এলো? অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আর নেতিবাচক দিকে গড়াতে দেওয়া যাবে না। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীলতা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কাজ হবে, প্রকৃত ছাত্রদের হাতে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্ঞান সৃষ্টির কারখানায় পরিণত করতে এবং সেগুলোতে মানুষ গড়ার পরিবেশ বজায় রাখতে আমাদের রাজনীতিকদের সদিচ্ছা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ঘটনাই সংঘাতের শেষ ঘটনা হোক। জুলাই অভ্যুত্থানের শিক্ষা কি আমরা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাব?
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- ছাত্র রাজনীতি
- শিক্ষাঙ্গন
