প্রতিবেশী
পশ্চিমবঙ্গে শেষ হাসি কে হাসবে?
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত মাসের মাঝামাঝি কলকাতা গিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন আগেই ভিসায় সিল মেরে দিয়েছিল– ‘কেবল চিকিৎসার জন্য’। সেটা মেনে চেনাজানা রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা সাংবাদিক কারও সঙ্গেই দেখা করিনি। তবে চোখ-কান তো আর বন্ধ রাখা যায় না। হোটেল, হাসপাতাল, শপিং মল কিংবা পথ চলতে গিয়ে ট্যাক্সিচালক, দোকান কর্মচারী থেকে পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তার, শিক্ষক, আইনজীবী– অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে।
বাংলাদেশি শুনে মূলত তারাই কথা শুরু করেছেন। ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের অপার কৌতূহল। একটা প্রশ্ন সবাই করেছেন, নির্বাচনের পর আপনাদের পরিস্থিতি কি ভালো হয়েছে? স্বাভাবিকভাবেই আলাপে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এসেছে। তখনও বিধানসভা নির্বাচন তেমন জমে ওঠেনি। বিভিন্ন দল কেবল প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছিল।
আমিও তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছি, বিশেষত ক্ষমতাসীন তৃণমূল সম্পর্কে। ১৯৯৮ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১১ সালে সাফল্যের দেখা পান তিনি। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে সে নির্বাচনে। মমতার নেতৃত্বে রাজ্যে সরকার গঠন করে তৃণমূল কংগ্রেস। এ সরকারের এখন তৃতীয় মেয়াদ চলছে।
মমতা কি আবারও ফিরছেন ক্ষমতায়? প্রশ্নটা কাউকেই চমকে দিল না। ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবী; প্রায় সবাই হ্যাঁ-সূচক উত্তরই দিলেন। একটু গভীরে গিয়ে বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, একই তো ভেতো বাঙালি আমরা সবাই; পরশ্রীকাতরতার পাশাপাশি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া-কোন্দলেও কেউ কম যাই না। কিন্তু বৈধ ভোটে বাংলাদেশে কেউ টানা দুই মেয়াদ থাকতে না পারলেও পশ্চিমবঙ্গে তা সম্ভব হচ্ছে কেন? একই মুখ বারবার দেখে ক্লান্তিও পায় না? কংগ্রেস ছিল ১৫ বছরের বেশি; ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এলো বামফ্রন্ট। এবার জিতলে মমতার হবে টানা ২০ বছর। তাদের উত্তর– বিকল্প নেই।
কলকাতা শহরটা এখন বেশ ছিমছাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; ঈশ্বর গুপ্তের ‘দিনে মশা রেতে মাছি, এ নিয়ে কলকাতায় আছি’ এখন আর খাটে না। রাস্তায় যানজট নেই বললেই চলে; গণপরিবহন সুলভ। সত্য, জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের হিসাবে ষাটের দশকের শুরুর দিকেও পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল; এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে তেমন হাহাকারও দেখলাম না। মমতার দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও মনে হলো না, মানুষ বিকল্প খুঁজতে মরিয়া।
এবার মমতার জয় সহজ হবে না– এমন মতও কম জোরালো নয়। বিশেষত যে মুসলিম ভোটকে মমতা ‘দুধেল গাই’ মনে করেন, সেখানে এবার চিড় ধরেছে। মুসলমানরা পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৭-৩০ শতাংশ। মমতার ভরসায় ভারতের অন্যান্য অংশের স্বধর্মীয়দের মতো ভয়ভীতিতে থাকতে হয় না। বরং মুর্শিদাবাদ, মালদহের মতো কিছু জেলাসহ কলকাতার কিছু অংশে মুসলিমদের দাপট রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার হার, সরকারি চাকরির মতো বিষয়গুলোতে তাদের উন্নতি তেমন হয়নি। এখনও সেখানে ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার গঠিত সাচার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রে মুসলমানদের করুণ দশা উঠে এসেছিল। চিত্রটি মমতার কথিত মুসলিম তোষণেও পাল্টায়নি– এমন মত সবার মধ্যে প্রবল। এটি মুসলিম সমাজের একাংশে মমতার বিরুদ্ধে অভিমান জন্ম দিয়েছে বলে মনে হলো। তা ছাড়া সেই স্বাধীনতার সময় থেকেই কংগ্রেসের ঘাঁটি বলে পরিচিত মুসলিমপ্রধান মুর্শিদাবাদ-মালদহে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার রাজনৈতিক চালে ধরাশায়ী হয়েছিল কংগ্রেস। এবার কংগ্রেস এ দুই জেলাকে পাখির চোখ করেছে। মুর্শিদাবাদের ‘রবিন হুড’ অধীর চৌধুরী নিজেই এবার বহরমপুরে প্রার্থী হয়েছেন। বিভিন্ন জরিপেও দেখা যায়, এ দুই জেলা থেকে কংগ্রেস ৫-১০টি আসন পাবে এবার। একই সঙ্গে তৃণমূলের প্রভাবশালী মুসলিম বিধায়ক হুমায়ুন কবীর নতুন দল গঠন করে নির্বাচনে নেমেছেন। মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ তৈরির উদ্যোগ নিয়ে সেখানকার মুসলিম আবেগে নাড়া দিয়েছেন। মমতা তাঁর এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট-আইএসএফ গতবার একটি আসন পেলেও এবার তা বাড়তে পারে বলে সমীক্ষকরা বলছেন।
এবার মমতার জন্য আরেকটা বিপদ হলো, সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মধ্যে তাঁর কথিত মুসলিম তোষণের প্রতিক্রিয়া। এটা কাজে লাগাতে মরিয়া তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। দলটির নেতারা আগে থেকেই মুসলিম-বিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য পরিচিত। নির্বাচন সামনে রেখে তা তীব্রতর হয়েছে। তাতে হিন্দু ভোটে মমতার অংশ কিছুটা হলেও গতবারের চেয়ে কমবে বলে অনেকের ধারণা।
গতবার মমতা মুসলিম ভোট পেয়েছেন মুসলিমদের বিজেপির ভয় দেখিয়ে, আর বাঙালি হিন্দু ভোট টানতে জয় বাংলা স্লোগান তুলে বাঙালির আবেগ জাগিয়ে দিয়ে। এবারও এ দুই বিষয় ভোটারদের মনে সক্রিয় আছে, বিজেপিতে হিন্দি ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের মেলবন্ধনে গঠিত চক্রের আধিপত্যের কারণে। বিজেপি এসেছে ‘পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা’ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ভারতীয় জনসংঘ থেকে– এটা সত্য। কিন্তু তাতে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে অবাঙালিদের আধিপত্য নজর এড়ায় না।

সব ছাপিয়ে এবারের ভোটে উভয় পক্ষের কাছেই তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা। তারা ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা পর্যালোচনার নামে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটিয়েছে। এর ফলস্বরূপ কমবেশি ৯০ লাখ ভোটার বাদ গেছে, যাদের মধ্যে কমবেশি ৫৬ লাখ মৃত বা ঠিকানায় অনুপস্থিত। বাকিদের প্রায় সবাই তৃণমূলের মতে ভোটার হওয়ার যোগ্য; আর বিজেপির মতে ‘অনুপ্রবেশকারী’। বিজেপির অভিযোগ, অনুপস্থিত ও মৃত ভোটারদের তালিকা ধরে এতদিন তৃণমূল জাল ভোট দিত, আর অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার বানাত। অন্যদিকে তৃণমূল ভোটার তালিকা থেকে বাদ বা নাম তুলতে বিড়ম্বনায় পড়াদের ইসিবিরোধী ক্ষোভ কাজে লাগাতে ব্যস্ত।
বিজেপি সরকার নিয়োজিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারও যুদ্ধংদেহী ভাব দেখাচ্ছেন। তিনি রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনে ঢালাও বদলি করে তৃণমূলের সাজানো বাগান তছনছ করে দিয়েছেন। জেলায় জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি ঘটানো হয়েছে, যাদের তৎপরতা খোদ দিল্লি থেকে মনিটর করা হচ্ছে।
তবে অধিকাংশ জরিপে তৃণমূলকেই এগিয়ে রাখা হয়েছে। মোট আসন ২৯৪, সরকার গড়তে লাগে ১৪৮ আসন। জরিপগুলোতে তৃণমূলকে অন্তত ১৫০-এর বেশি আসন দেওয়া হচ্ছে। বিজেপিও খারাপ করছে না। কোনো কোনোটায় তৃণমূলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। কৌতূহলোদ্দীপক হলো, সম্ভবত তৃণমূলের আসন কমায় এবার কংগ্রেস ও সিপিএম ১০-১৫ আসন পাবে বলে জরিপগুলো বলছে। দুই দলই গতবার আসনবঞ্চিত থেকেছে। কংগ্রেস শুধু তাদের গড়ে ব্যস্ত থাকলেও সিপিএম সারা রাজ্যেই বিচরণ করছে। তাদের বেশ কিছু তরুণ ও সম্ভাবনাময় প্রার্থী আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। এরা প্রত্যাশিত ফল পেলে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের যে শঙ্কা গত কয়েক বছর ধরে বাড়ছিল, অন্তত তা ধাক্কা খাবে।
আজ বৃহস্পতিবার সেখানে প্রথম দফার ভোট। দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল। ফল বেরোবে ৪ মে। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে শেষমেশ দাঁড়ায়।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
