স্বাধীন গণমাধ্যম
গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের মাধ্যম
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রবিবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বক্তাগণ সংবাদমাধ্যমে হস্তক্ষেপ বন্ধের পাশাপাশি অপতথ্য রোধের যেই আহ্বান জানাইয়াছেন, উহা গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব আয়োজিত এই আলোচনা সভায় বক্তারা বলিয়াছেন, মুক্ত সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্র বিকাশে অপরিহার্য হইলেও অদ্যাবধি সংবাদমাধ্যমের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেই পরিবেশ নিশ্চিত হয় নাই। তাহারা যথার্থই বলিয়াছেন, তথ্যপ্রবাহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইলে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করিবার সুযোগ দিতে হইবে।
আমরা জানি, গণতন্ত্র নিছক ধারণা বিশেষ নহে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একগুচ্ছ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের নামই গণতন্ত্র, যেইখানে বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রধান অনুষঙ্গ। সম্ভবত সেই কারণেই আমাদের সংবিধানেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে, যদিও সংবিধানের সেই ধারা কখনোই কাঙ্ক্ষিত রূপে কার্যকর হয় নাই। বরং বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন উপায়ে সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চাপিয়া ধরিবার চেষ্টা করিয়াছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা প্রকার কালাকানুন প্রণয়ন করিয়া সাংবাদিকদের জন্য ভীতিকর পরিবেশ বজায় রাখিয়াছে। অবশ্য ইহাও সত্য, ঐ সকল কালাকানুনের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ বরাবরই সোচ্চার। গণতন্ত্রের দাবিতে বারংবার গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত করিয়াছে। সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকরা বরাবরই সেই সকল সংগ্রামে ভূমিকা রাখিয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঐ সকল সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যাহারা ক্ষমতায় আসিয়াছিল. তাহারাও এই ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাইতে পারে নাই। ইহারই প্রকাশ হিসাবে এই বৎসরের বিশ্ব গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান গত বৎসর অপেক্ষা তিন ধাপ পিছাইয়া ১৮০টা দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে দাঁড়াইয়াছে।
উল্লেখ্য, প্যারিসভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) প্রকাশিত উক্ত প্রতিবেদন এমন সময়ে প্রকাশিত হইয়াছে যখন দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানা ঠুনকো অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়েরকৃত পাইকারি খুনের মামলাগুলি প্রত্যাহৃত হয় নাই, এমনকি অনেক সাংবাদিক বিনা বিচারে প্রায় গত দুই বৎসর যাবৎ কারাগারে আটক রহিয়াছেন। মব সহিংসতার মাধ্যমে সেই সময়ে যেই সকল সাংবাদিককে চাকুরিচ্যুত করা হইয়াছিল, তাহারাও কোনো প্রতিকার পান নাই। এমনকি প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে যাহারা একই ন্যক্কারজনক প্রক্রিয়ায় আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ করিয়াছিল, তাহাদেরও আইনের আওতায় আনা হয় নাই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ভুয়া ও অপতথ্যের যেই আশঙ্কাজনক বিস্তার ঘটিয়াছে, তাহা বন্ধেও অদ্যাবধি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাইতেছে না।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি যথার্থই বলিয়াছেন, ভুয়া ও অপতথ্যের কারণে সমাজে বিভক্তি তৈরি হইতেছে। এমনকি ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীগত সংঘাতও বাধিতেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়া তথ্যমন্ত্রী বলিয়াছেন, ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার এবং প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাহারা একটি সমন্বিত কাঠামো গঠনের চিন্তা করিতেছেন। ইহার সহিত তিনি যেই ‘গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের কথা বলিয়াছেন, তাহাও সাধুবাদযোগ্য। তবে সেই কাঠামো বা কমিশন কোন প্রক্রিয়ায় এবং কাহাদের লইয়া গঠিত হইবে, স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে কতখানি স্বাধীনতা ভোগ করিবে, উহাও দেখিবার বিষয়।
অস্বীকার করা যাইবে না, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সৃষ্ট ভয়ের পরিবেশ হইতে মুক্তির আশায় জনগণ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়া বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাইয়াছে। অতএব বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হইল, সংবিধান ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিগত আমলের সহিত দৃশ্যমান পার্থক্য নিশ্চিত করা। উহার নিদর্শনস্বরূপ সরকারকে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পার্শ্বে দাঁড়াইতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
