ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

কৃষ্ণ মেঘ ছক

কৃষ্ণ মেঘ ছক
×

দীপান্বিতা পালিত

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেঘ পেরিয়ে আকাশ থেকে রৌদ্রচূর্ণ ঝরে পড়ছে। তবু এলোমেলো বাতাস মেয়ের খোলা চুলে আলতো দোল দিয়ে যাচ্ছে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে ছিল মেয়েটি। দূর শহরের ধোঁয়ার আস্তরণের ওপারে তার দৃষ্টি। মনে হলো, তাকে ঘিরে এক ময়ূরকণ্ঠী বিষাদ টলমল করছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি অনুসরণ করতেই অবাক হলাম। সেখানে কোনো শহরের মানচিত্র নেই, আছে এক ফালি গভীর মেঘ, বৃষ্টিতে টইটম্বুর! নিজের অজান্তেই বলে উঠলাম, ‘এমন দিনে এত কৃষ্ণ মেঘ কেন!’
মেয়েটি তার দিঘল চোখের মায়াদৃষ্টি আমার মুখে রেখে আঙুল তুলে সেই নীলাম্বরী ছায়া দেখিয়ে বলল, ‘জান, ওইখানে আমার সংসার ছিল...।’
‘ছিল বলছ কেন? আজ নেই বুঝি?’– প্রশ্নটি করে নিজেই লজ্জা পেলাম।
তার ঠোঁটের কোণে কোমল হাসি ফুটল, ‘আজ আমি নিজেই নিজের সংসার।’
অবিশ্বাসের সুরে বললাম, ‘সংসার আবার একা একা হয় নাকি!’
সে বলল, ‘একসময় তোমার মতোই ভাবতাম। যেদিন রাঙা চেলিতে গাঁটছড়া বেঁধে, ভালোবাসার হাত ধরে শালবনের পথে নতুন সংসারে গেলাম, মনে হয়েছিল একাকিত্ব নিরাপদ আশ্রয় পেল। কিন্তু ছকে বাঁধা সেই সংসার বড় সংকীর্ণ। নতুনকে আপন করতে তার বড় ভয়। অধিকারের মাপকাঠি নিয়ে কী ভয়ানক যুদ্ধ সেখানে! বুঝলাম, সে আপন করতে জানে না, দস্যু ভেবে মনের ঘরে কপাট দেয়।’
‘তখনই কি সংসার ছাড়লে?’ 
আমার কথা অসম্পূর্ণ রেখেই সে বলল, “না, তাকে গড়লাম নিজের নিয়মে। ভালোবাসা ছিল পশমিনা আলো-আঁধারির মতো। যখন হিলহিলে হেমলক আমাদের জীবনের পথে বেড়ে উঠল, প্রথমে চিনিনি। যেদিন বুঝলাম, দেখলাম তার বিষে নীল হয়ে গেছে আমাদের বসন্ত। গোধূলির মেঘ বজ্র-বিদ্যুতে ফেটে পড়ল ঘরের আঙিনায়। ভালোবাসার পাঁজর এফোঁড়-ওফোঁড় করে সেই বিদ্যুৎ আমায় বলে গেল, ‘সময় হয়েছে...।’ এমনই এক বসন্ত দিনে সংসারের চাবি অধিকারের বিজয় মুষ্টিতে ফিরিয়ে দিয়ে পথে বেরোলাম।”
অস্ফুটে বললাম, ‘সেদিন আর এদিনের মধ্যে বুঝি ওই কৃষ্ণ মেঘ আছে বিষণ্নতার আলো হয়ে?’
মেয়েটি উজ্জ্বল চোখ আকাশে তুলে বলল, ‘কৃষ্ণ মেঘ জমে আছে সেই ঘরে, যে ঘরে আমি নেই! বিষণ্নতা ফুঁড়ে যেদিন নিজের ডানা মেললাম, জীবন বলল–ওড়ো মেয়ে, এই দিগন্তরেখা জুড়ে তোমার সংসার ছড়িয়ে আছে। দেখলাম, আমার সংসারের দালানে ছয় ঋতু দোল খায়। ওই ধূসর শহুরে সভ্যতা সংসারের খেলায় জিতেও কেমন হেরে আছে!’ একটু থেমে বলল, ‘যাক, বেলা গড়িয়ে গেল, এবার যাই।’
ব্যগ্র হয়ে বললাম, ‘তোমার সংসার একদিন দেখাবে আমায়?’
সে বলল, ‘একদিন কেন, আজই দেখ... ওই যে চারপাশে ছড়িয়ে আছে অস্ফুট আবির মেখে।’
আমি পথ আটকে বললাম, ‘দাঁড়াও, যাওয়ার আগে নিজের নামটা বলে যাও।’
সে অস্ফুটে বলল, ‘বসুন্ধরা...।’
সুহৃদ, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন

×