ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

দীর্ঘশ্বাসের হাসি

দীর্ঘশ্বাসের হাসি
×

নাহিদ সরদার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৬:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

হ্যালো।
– হুম, বলো।
যদি চাকরিটা ছেড়েই দিই? তোমার কি মন খারাপ হবে?
ওপাশে কিছুটা নীরবতা। অন্তুর আম্মুর দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা ফোনেও স্পষ্ট শোনাল, না, তোমার চেয়ে তো চাকরি বড় না। চলে এসো।
ফোনে আর কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে দিল রুবেল। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিতে দিতে জীবনের অন্যতম বড় ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলল সে। ওর এই চাকরির বয়স মাত্র এক মাস। অফিসিয়ালি ৮ ঘণ্টা ডিউটির কথা থাকলেও এখানে ২৪ ঘণ্টাতেও কুলায় না। জিপিএস নজরদারি, হাজিরা অ্যাপস আর কাজের পাহাড় তাকে হাঁপিয়ে তুলেছে। তার ওপর ছেলেটার মুখটা দেখার জন্য বুকটা কেমন যেন করে।
বাড়িতে ফোন করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো, আব্বু কখন আপ্পা?
রুবেল বলল, আজকেই আসব বাবা।
মুহূর্তেই ওপাশ থেকে চিৎকার শোনা গেল। দাদি ও দাদি, আব্বু বাড়ি আপ্পে! রুবেলের বুকের ভেতর একটা অচেনা আনন্দের স্রোত বয়ে গেল।
দুপুরে বিরতির পর যখন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বের হবে, ঠিক তখনই রুমে এসে হাজির হলেন জিএম। বললেন, ‘আরএম স্যার ভিজিটে আসছেন। রুবেল সাহেব, আপনার আজকে বাড়ি যাওয়া হবে না।’ কথাটা শুনে রুবেলের ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ল।
চা খেয়ে ফিরে আসতেই আরএম বাঁকা হেসে বললেন, ‘শুনলাম আজ ছুটিতে যেতে চেয়েছিলেন? কিন্তু আপনার ছুটি তো ক্যানসেল!’
রুবেল ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল–স্যার, চাকরি করলে না ছুটির বিষয় আসবে। আমি চাকরিটাই আর করছি না।
আরএম অবাক হয়ে বললেন, ‘সামান্য একটা ছুটির জন্য চাকরি ছাড়ছেন? বাইরে চাকরির বাজার কেমন জানেন তো?’
‘চাকরির বাজার’–কথাটা তীরের মতো রুবেলের বুকে বিঁধল। একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে। ঘরের মা, স্ত্রী, সন্তানের মুখটা মনে পড়ল। নতুন চাকরি পেতে কত দিন লাগবে? কে দেবে এই বাজারে চাকরি? একটা তীব্র ভয় আর মধ্যবিত্তের আজন্ম কষ্ট এক সেকেন্ডের জন্য তার গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল। পরক্ষণেই চারপাশের এই দাসত্বের দেয়ালগুলো তাকে তাড়া করল। সে বলল– ‘ছুটিটা আপনার কাছে সামান্য স্যার, কিন্তু আমার কাছে বিরাট।’
একে একে সব হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে রুবেল ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয়ে এলো।
বাস চলছে বাড়ির দিকে। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখা গেল একঝাঁক বলাকা উড়ে যাচ্ছে। রুবেল মুগ্ধ হয়ে দেখল। নিজেকে ওই পাখির মতোই মুক্ত মনে হলো। চাকরি ছাড়ার এই আনন্দ মুক্তির, পরম স্বস্তির।
বাসের জানালার কাচে যখন নিজের প্রতিবিম্বটা দেখল, তখন আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা ধূসর ছায়াও স্পষ্ট হয়ে উঠল। আগামী মাস থেকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। বাজারের ফর্দটা ছোট করতে হবে, হয়তো অন্তুর চকলেটের আবদারটায় লাগাম টানতে হবে। মুক্তির এই পরম আনন্দের ঠিক নিচেই জমাট বেঁধে আছে একরাশ অনিশ্চয়তা আর চাকরিহীন একটা মানুষের তীব্র শূন্যতা।
ঠিক তখনই পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অবুঝ কণ্ঠটা ভেসে এলো–আব্বু, কখন আপ্পে?
জানালার বাইরে দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রুবেল চোখের কোণের জলটা গোপনে মুছে নিল। অন্য পাশ থেকে বোঝার উপায় নেই কিছু এক বইছে বুকে। একবুক না বলা কথা ছাপিয়ে মুখে জোর করে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল–এই তো বাবা, তোমার আব্বু চলে এসেছে।
মুক্তির আনন্দ আর ভবিষ্যতের এক বুক কষ্ট– দুটোকে একসঙ্গে পিঠে বয়ে নিয়ে বাসটা অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে চলল। 
সুহৃদ, খুলনা

আরও পড়ুন

×