ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

রাজনীতির পুরনো বৃত্ত বনাম অর্থনীতির নতুন সংকট

রাজনীতির পুরনো বৃত্ত বনাম অর্থনীতির নতুন সংকট
×

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মনজুর রশীদ

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ১৯:৫৮

সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের ঢেউ যেন আছড়ে পড়ে দেশের সকল স্থানে। সচিবালয় থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পরিবর্তন শুরু হয়। নতুন সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। পুলিশের সর্বোচ্চ ও শীর্ষস্থানীয় পদসহ থানার ওসি এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থায় ব্যাপক রদবদল দেখা যায়। 

সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সাথে সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। 

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এই অচলাবস্থার অবসান হবে। কিন্তু জনগণের বিশাল ভোটে নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা লাভের পর সেই একই চিত্রই দেখা গেল। পরিবর্তনের এই ঢেউ কেবল প্রশাসনিক রদবদল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষত পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি, প্রো-ভিসি, সিন্ডিকেট সদস্য সিলেকশন থেকে শুরু করে সকল গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহের মনোনয়নে দেখা যায়। এমনকি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ নির্ধারণে এবং জাতীয় পর্যায়ের একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও দলীয় নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সেই গতানুগতিক ধারা যেন আরও ব্যাপকভাবে পড়িয়েছে।

এছাড়া বিচার বিভাগ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন আদালত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক সহ অন্যান্য সকল ব্যাংক, বিভিন্ন কমিশনের শীর্ষ পদসমুহ সহ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোও যেন বর্তমান দলীয় সরকারের মদদপুষ্ট লোকদের সংঘে পরিণত হতে শুরু করেছে। এ সময়ে সরকারি বড় বড় প্রকল্প বা টেন্ডারের সাথে জড়িতদের মধ্যেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। নতুন সিন্ডিকেট বা ব্যবসায়িক গ্রুপ আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। একইসাথে আগের সরকারের গুণকীর্তন করা টিভি ও সংবাদপত্রগুলোর চরিত্র ও মালিকানা ইতোমধ্যে অনেকটাই বদলে গেছে। মালিকানায় হাত বদলের সাথে সাথে এই মাধ্যমে জড়িত সাংবাদিক, কলা-কুশলীদের অনেকের চরিত্র ও রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিবর্তনও এখনকার স্বাভাবিক ঘটনা। সকল সেক্টরেই কে কত বেশি সরকারের আস্থাভাজন বা আজ্ঞাবহ তার একটা অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

এই ধরনের পরিবর্তনের ফলে ও সবকিছুকে রাজনীতিকরণের ফলে অনেকের জন্যই নতুন সুযোগ তৈরি হলেও আবার অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদারিত্বের মারাত্মক ঘাটতি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগও তৈরি হয়েছে। তাছাড়া দলীয় আনুগত্য বিবেচনায় প্রায় প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে দেশি-বিদেশি অনেককে অস্বচ্ছভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার ফলে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বেরও বিস্তর অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তাতে খোদ সরকারের ভেতরে থাকা অনেকেই বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ, অতীতেও দেখা গেছে, এসব হাইব্রিড ও সুযোগ সন্ধানী নেতাদের কারণে সরকারের ভাবমূর্তিও একটা সময় নেতিবাচক হিসেবে দেখা দেয়।
 
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতাকর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এসময় তাদের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশজুড়ে চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগও আসতে থাকে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসতে না আসতেই এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে, যার বিস্তর অভিযোগ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও প্রকাশ হয়েছে। 
তাছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মত দলগুলোর নেতাকর্মীরা যে ধরনের সংকটের মধ্যে দিন পাড়ি দিয়েছে, ঠিক একই অবস্থা এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। ইতিহাস যেমন বড়ই নির্মম, আবার এর উল্লেখযোগ্য দিক হলো এতকিছুর পরও কেউ যেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় না!

অথচ আমরা এমন এক বৈরি অবস্থার মধ্যে আছি, যেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অথচ এ থেকে উত্তরণে করণীয় নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে তেমন কোন আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছেনা। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর বিশ্লেষণে অবশ্য অর্থনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতি বেশ প্রকটভাবেই উঠে আসছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় প্রসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কিভাবে সাধারণ মানুষের জন্য প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব কীভাবে বাংলাদেশকে ভোগাতে পারে, তারও একটা সম্ভাব্য চিত্র এসেছে সংবাদমাধ্যমের কলামে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি হ্রাস ও বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ে ঘাটতির বিষয়ও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। পাশাপাশি নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সময়েও বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাঁধাগ্রস্ত করছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অবশ্যম্ভাবী আশঙ্কাও প্রকটিত হয়েছে। 
আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং তারল্য সংকট অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোন বিশেষ উদ্যোগ কি আমরা কেউ দেখতে পাচ্ছি? কেন জানি মনে হচ্ছে এসকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে শুধুই যেন স্থানীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল বাহাস করে যাচ্ছে! 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাধারণ চলাচল ও কর্মকাণ্ড আমাদের মুগ্ধ করেছে। কিন্তু তিনি দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায়নের সংকট নিরসনে এবং কর্মক্ষম বিশাল জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব লাঘবে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন—সেদিকেই তাকিয়ে আছে মানুষ।

মনজুর রশীদ: সমাজ বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক 

আরও পড়ুন

×