রাইট টার্ন
ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বনাম সামাজিক বাস্তবতা
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১৩:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এপ্রিল মাসের যে মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে, তা ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এর আগে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোরই তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে একটি পরিবারের গড় মাসিক ভোগব্যয় ছিল ৩০ হাজার টাকার কিছু বেশি; শহরাঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার। এরপর টানা মূল্যস্ফীতির ফলে এই ব্যয় নিশ্চয় আরও বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশে ঘোরাফেরা করেছে। একটি সাধারণ পরিবারের বার্ষিক ব্যয় এখন সহজেই ৫-৬ লাখ টাকার ওপরে চলে যায়। সেখানে করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা হলে বাস্তব চিত্রটি কী দাঁড়ায়?
তার ওপর বাংলাদেশের চার কোটি পরিবার সাধারণত একজনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত আয়কর ব্যবস্থা এখনও এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে না। ফলে ব্যক্তির কর দেওয়ার অনীহা সবসময় ইচ্ছাকৃত নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যক্তি আয়কর ব্যবস্থার শিকড় মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৮৬০ সালে প্রণীত। পরে ১৯২২ সালের আয়কর আইন উপমহাদেশের কর কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে, যার ধারাবাহিকতা স্বাধীনতার পরও চলে। ১৯৮৪ সালে দেশে প্রথমবারের মতো জারি করা আয়কর অধ্যাদেশ দীর্ঘ কয়েক দশক আয়কর ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল। এরপর বিভিন্ন সংশোধন ও ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ এলেও ব্যক্তি কর ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে বড় পরিবর্তন আসেনি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে আয়কর আইন প্রণীত হলেও এখনও কর ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ব্যক্তি; পরিবার নয়। অথচ দেশের সামাজিক বাস্তবতা পরিবারভিত্তিক অর্থনীতি, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা এবং অনানুষ্ঠানিক আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। এখন প্রয়োজন বাস্তবতার ভিত্তিতে কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।
আমাদের সামাজিক কাঠামোয় পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি সাধারণত একক ব্যক্তির আয়। এর ওপর নির্ভরশীল শিশু, শিক্ষার্থী, গৃহিণী, প্রাপ্তবয়স্ক, বৃদ্ধ মা-বাবা, এমনকি লেখাপড়া শেষ করা বেকার ভাইবোন। অনেক পরিবার ধারদেনা করে একজনকে বিদেশে পাঠায়। তাঁর পাঠানো টাকায় পরিবার চলে; ঋণ শোধ হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিবারের আয়কারী ব্যক্তি আসলে পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু করনীতিতে তাঁকে এখনও একা ধরা হয়।
আয়কারী ব্যক্তির কর নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর নেট সক্ষমতা অনুযায়ী; গ্রস আয়ের ওপর নয়। কাগজে ‘করযোগ্য’ হলেও বাস্তবে পরিবারের ন্যূনতম ব্যয় মেটাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও কিছু বিষয় বিবেচ্য। যেমন হাজার হাজার তরুণ বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত, যাদের বছরভিত্তিক আয়ে হেরফের হয়। তারাও চান টিন নম্বর। কিন্তু আয় স্থির না হওয়ায় কর ব্যবস্থা সবসময় সেটা বুঝতে চায় না।
ফলে আয়কর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, উৎসে কর দিতে বাধ্য চাকরিজীবী বা পেশাজীবীরা কর দেন। অন্যদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী কর নেটের বাইরে থেকে যায়। এর পেছনে শুধু ব্যক্তির অনীহা নয়, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা কাজ করে। তাদের মধ্যে অনেকেরই কর দেওয়ার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়; বিশেষত নির্ভরশীল মানুষের ব্যয় কর ব্যবস্থায় খরচ হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। ফলে তারা বাধ্য হন প্রকৃত আয় গোপন করতে। এটি শুধু আর্থিক নয়, নৈতিক সমস্যাও বটে। একদিকে রাষ্ট্র মানুষকে সৎ হতে বলে, অন্যদিকে কর ব্যবস্থা সেই সততাকে নিরুৎসাহিত করে।
সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী একটি অংশও কর ফাঁকি দেয়। এ ধরনের ঘটনা শুধু রাজস্ব ক্ষতি করে না; পুরো কর ব্যবস্থায় আস্থা নষ্ট করে। সাধারণ মানুষ যখন বড় কর ফাঁকি দিয়ে পার পাওয়া দেখে, তখন নিজের সামান্য আয়ের ওপর কর দিতে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন তৈরি হয়। একদিকে মধ্যবিত্তের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে ধনীদের কর ফাঁকির বাস্তবতা কর ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন কর ব্যবস্থাকে শুধু ব্যক্তির আয়ের ভিত্তিতে নয়, পরিবারের বাস্তব দায়ভার বিবেচনায় দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আয় করমুক্ত রাখা হয় এবং বিবাহিত দম্পতিদের জন্য ছাড় আরও বেশি। যুক্তরাজ্যেও নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত আয় পর্যন্ত কর দিতে হয় না। জাপান, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে নির্ভরশীল সদস্য, সন্তান বা পরিবারের দায়ভার বিবেচনায় কর হ্রাসের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক কর ব্যবস্থায় শুধু ‘মোট আয়’ নয়; প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশে সেই সামঞ্জস্য এখনও তৈরি হয়নি। এখন প্রশ্ন, কী করা যেতে পারে?
প্রথমত, করমুক্ত আয়ের সীমা বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একটি সাধারণ পরিবারের ব্যয় বিবেচনায় নিলে এই সীমা ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা যৌক্তিক। এতে সমাজে সততার চর্চা বাড়বে। এর প্রভাব সমাজের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারভিত্তিক কর কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে। নির্ভরশীল সদস্যের সংখ্যা অনুযায়ী করমুক্ত সীমা সমন্বয় করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, আয়ের অস্থিরতা বিবেচনায় একাধিক বছরের গড় আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের চিন্তা করা যেতে পারে।
চতুর্থত, সবাইকে কর নেটের মধ্যে আনতে হবে, কিন্তু সবাইকে করদাতা বানাতে হবে না। আয় কম হলে কর শূন্য হতে পারে, কিন্তু তথ্য থাকা দরকার।
সব শেষে বলব, আয়কর হওয়া উচিত শুধু আয়ভিত্তিক নয়, সামর্থ্যভিত্তিক। আর সেই সামর্থ্য বুঝতে হলে ব্যক্তি নয়; পরিবারকে দেখতে হবে। জুন মাসে বাজেট ঘোষণায় এই বিষয় গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত হলে দেশের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়বে, যা ক্রমক্ষয়িষ্ণু।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী
- মূল্যস্ফীতি
