বিদ্যুৎ বিতরণ
ভাবিয়া করিও বেসরকারীকরণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণে যুক্ত কোম্পানিসমূহকে বেসরকারীকরণ করা হইবে শুনিয়া আম জনতার মনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগিতে পারে, ইহাতে কি বিদ্যুতের মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি পাইবে? কেননা, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সহিত প্রায়শ তাহাদের জীর্ণ ট্যাঁকের সম্পর্ক রহিয়া যায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বুধবার এক বক্তৃতায় জানাইয়াছেন, দেশে বিদ্যুৎ বিভাগে যুক্ত ছয়টি কোম্পানিকে ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে সরকার। প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে সরকারি কোম্পানি এবং বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করিলেও বিতরণ ও সঞ্চালনের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করিয়া থাকে সরকারি একাধিক কোম্পানি।
বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাতে উদ্বেগ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উপরন্তু উল্লেখ করা হইয়াছে, দীর্ঘদিন দেশের গ্যাসের অনুসন্ধান না হওয়ায় দেশ আমদানিনির্ভর হইয়াছে। ভাসমান দুইটি এলএনজি টার্মিনালের একটি কার্যকর না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় সূচিত হইয়াছে সংকট। খুলনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হইলেও ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন না থাকায় উহা কার্যত অচল। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনার দশা দেশে নাজুক। সমকালে প্রকাশিত আরেকখানি সংবাদও বলিতেছে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাঙিয়া পড়িতে পারে এই খাতে সমাধান না আসিলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহিত বৈঠক করিয়া বিজিএমইএ এবং বিটিএমইএর নেতারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চাহিয়াছেন। এই বিশেষ ব্যবস্থা কী রূপ হইবে, তাহা বোঝা যাইবে পরবর্তী সময়ে। তবে সেইখানেও বেসরকারীকরণের প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পাইতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী তাঁহার বক্তব্যে উল্লেখ করিয়াছেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রহিয়াছে– সরকারি অর্থে আর সবকিছু করিবার প্রয়োজন নাই। যেইখানে সম্ভব হইবে সেইখানে বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দিতে হইবে। স্বীকার্য, সরকারি ব্যবস্থাপনায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে বিঘ্ন হইলে তাহা বেসরকারীকরণ করিবার নজির পৃথিবীর বহু দেশে রহিয়াছে। কিন্তু সব বেসরকারীকরণ হইবার ইঙ্গিত আবার বহুকিছু হারাইবার আশঙ্কাও জাগাইয়া তোলে। প্রশ্ন উঠিয়াছে– ইহা কোনো আন্তর্জাতিক ঋণ পাইবার শর্ত হইতে পারে কিনা। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারীকরণের পর যদি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিতে থাকে তখন সরকার কী করিবে? বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ গ্রহণ করিতে চাহিতে পারে। তাহারা মুনাফার স্বার্থে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণকে এই সেবা হইতে বঞ্চিত করিতে পারে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, তাহাদের জবাবদিহির প্রসঙ্গ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকার কি আপাদমস্তক জবাবদিহির আওতায় আনিতে পারিবে? সুতরাং ভাবিয়া কর্ম করিতে হইবে; করিয়া ভাবিয়া লাভ নাই।
এই কথা ঠিক– ভর্তুকির চাপ বাড়িয়াছে; সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়িয়াছে; জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়াছে বলিয়া বিদ্যুৎ খাতে সংস্কারও প্রয়োজন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ বিল লইয়া অভিযোগ, সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গ্রাহকসেবার মান লইয়া অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাগত অদক্ষতা, জনবল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও সমস্যা বাড়াইয়াছে। বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভিত্তি আরও নাজুক হইয়াছে নিঃসন্দেহে। অব্যবস্থাপনার এই সকল বিবেচনায় বিতরণ ব্যবস্থার সংস্কার করিতে হইবে। তবে সংস্কারের আগে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিতকরণ আরও অধিক প্রয়োজন। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করিতে হইলে তাহা হইতে হইবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়া। নিশ্চিত করিতে হইবে জনগণের উপর বোঝা বাড়িবে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, মূল্য নির্ধারণের নীতি, সেবার মান এবং গ্রাহকের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট নীতিমালা জনসমক্ষে প্রকাশ করিতে হইবে। সরকারি-বেসরকারি মিশ্র রাখিয়াই বিতরণ সেবা নিশ্চিত করা যায় কিনা, উহাও আলোচনা সাপেক্ষ।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়