অর্থনীতি
ন্যায্য বাজেটের সন্ধানে
সাব্বির আহমেদ
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১১:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটা ভালো বাজেট তৈরি করতে হলে সবার আগে দরকার বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে কোথায় যেতে চাই– এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা। জনকল্যাণ সবসময় বিবেচনায় রেখে, বর্তমান সমস্যা এবং তা সমাধানের জন্য সম্ভাব্য করণীয় যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত দ্বারা যাচাই-বাছাই করে সেগুলোকে এমনভাবে বিন্যাস করা, যাতে তা বর্তমান সমস্যা সমাধান করে; একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ হয়ে ওঠে। তাৎক্ষণিক টোটকা সমাধান কখনোই দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ফল দেয় না। জাতীয় বাজেট তৈরির সময় আয় ও সম্পদের সুষ্ঠু বিতরণের মাধ্যমে সমাজের অসংগতি ও বৈষম্য দূর করার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখলে তা জনবান্ধব হয়।
আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোর অন্যতম হচ্ছে শিক্ষার মান এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ছুটতে হয় সরকারি ডাক্তারের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে। দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র। এরা রোগীকে মানুষ না; টাকার খনি মনে করে। সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠ রিপোর্ট করেছে, দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের ৩৫ শতাংশ চলে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার পেছনে। বড় কোনো অসুখ হলে তার চিকিৎসায় মধ্যবিত্তের সারাজীবনের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসা করার উদাহরণ ভূরি ভূরি। দেশের চেয়ে বিদেশে খরচ কম এবং ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় বলে লাখ লাখ পরিবার প্রতিবছর বিদেশে যায় সরল-জটিল রোগ সারাতে। তাই বাজেট বরাদ্দ বাড়লেই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হবে না; দরকার সামগ্রিক মূল্যায়নের মাধ্যমে যথার্থ কৌশল নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া।
একই কথা খাটে শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করা হবে। কিন্তু এত টাকা আমাদের শিক্ষা খাতে এখন দরকার নেই; দিলেও হজম করতে পারবে না। কিছু বিতর্কিত বিষয় ছাড়া সিলেবাসও তেমন খারাপ কিছু না। সমস্যা মনোযোগে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পাঠে মনোযোগ বাড়ানোর উপায় বের করে সেখানে বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। শিক্ষকদের কোচিং ও অন্য বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
অর্থনৈতিক সমস্যায় আমরা এখন জর্জরিত। প্রায় চার বছর ধরে চলছে উচ্চহারের মূল্যস্ফীতি। জিনিসপত্রের দাম নিম্ন আয়ের মানুষদের নাগালের বাইরে। খাদ্য গ্রহণ কমাতে কমাতে তারা এখন দিশেহারা। টান পড়েছে মধ্যবিত্তের পেটেও। উচ্চবিত্তের ব্যবসায়ে মন্দা। কয়েক মাস আগে গবেষণা সংস্থা সিপিডি জানিয়েছে ৫০ লাখ কর্মচ্যুতির কথা। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি রেটিং ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে তা ৩.৫ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করেছে ফিচ। এসবের প্রধান কারণ সমাজে স্থিতিশীলতার অভাব। চলছে অরাজকতা। এ অরাজকতা আরও বাড়বে যদি গণমাধ্যমে চলা নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক ও উৎসে কর দ্বিগুণ করার আলোচনা আগামী বাজেটে সত্যিই বাস্তব হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্রয় ব্যবস্থাপকদের মধ্যে জরিপের ভিত্তিতে তৈরি পারচেজ ম্যানেজারস সূচক (পিএমআই) বলছে, ২৪ সালের মে মাসের তুলনায় ২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে ৩১.০৩ শতাংশ। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ এ বছর কৃষি খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যপক দুর্নীতি ও অরাজকতার কারণে কৃষক ন্যায্য দাম পায় না। এর একটা দফারফা করা দরকার। রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ শুধু কথায়ই আটকে থাকল। শিল্প শিল্প করে কয়েক দশক চলে গেছে; অগ্রগতি তেমন নেই। নজর দেওয়া দরকার সেবা খাতের ওপর। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করার সম্ভাবনাসমৃদ্ধ এ খাতে কর্মসংস্থান ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
রাজস্ব সংগ্রহ ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে জিডিপির ৬.৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০১৮-১৯ সালেই তা ছিল জিডিপির ১১.১৯ শতাংশ। রাজস্ব ঘাটতির প্রধান কারণ কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি। দ্বিতীয় প্রধান কারণ নতুন কর উৎস শনাক্ত করতে এবং পুরোনো উৎসের পরিধি বাড়াতে না পারা। তৃতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে, করদাতা এবং কর গ্রহীতাদের একই তথ্যপ্রযুক্তি ছাতার মধ্যে আনতে না পারা। আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং সব করদাতাকে একটি তথ্য ব্যবস্থায় আনতে পারলে বহুলাংশে কমে যাবে কর ফাঁকি।
বহুদিন ধরে ব্যক্তি আয়ের করমুক্ত সীমা যথেষ্ট পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে না। নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে হলে এবং করদায় নির্ধারণে ন্যায্যতা আনতে হলে এ সীমা অন্তত ৬ লাখ টাকা করা উচিত। এ দেশে বহু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করে। কিন্তু তারা নামমাত্র কর দেয় সরকারকে। তার চেয়ে বেশি দেয় কর কর্তাদের। এদের ঠিকভাবে করের আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব ঘাটতি থাকবে না। সকল কোম্পানির জন্য সমান হারে কর নির্ধারণ না করে ব্যক্তি কর হারের মতো এ ক্ষেত্রেও প্রগ্রেসিভ হারে করহার ধার্য করা ন্যায়সংগত হবে। কর প্রশাসন এবং করনীতি যেমন পৃথক করা দরকার, তেমনি দরকার কর ট্রাইব্যুনালকে রাজস্ব বোর্ডের আওতামুক্ত করে বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করা।
মোদ্দাকথা, এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি কমিয়ে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে অন্যায়, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। অপ্রয়োজনীয় বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক অনেকখানি বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা দরকার। টাকা ছাপিয়ে এবং ব্যাংক থেকে ঋণ করে সরকার পরিচালনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার চলবে নাগরিকদের দেওয়া করের টাকায়। কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা দরকার। তাতেই বাড়বে রাজস্ব; এর বিপরীত কিছুতে নয়।
সাব্বির আহমেদ: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট
ও কলাম লেখক
