ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রযুক্তি

ডেটা সেন্টার পরিচালনায় পুনর্ব্যবহৃত পানি

ডেটা সেন্টার পরিচালনায় পুনর্ব্যবহৃত পানি
×

ফয়সাল কবীর শুভ

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ দ্রুত একটি ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ফিনটেক, ই-গভর্ন্যান্স, স্মার্ট সিটি, অনলাইন শিক্ষা কিংবা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা–সবকিছুর পেছনে কাজ করে এক ধরনের অদৃশ্য অবকাঠামো, যার নাম ডেটা সেন্টার। সহজ ভাষায়, ডেটা সেন্টার হলো ডিজিটাল বিশ্বের কারখানা, যেখানে কোটি কোটি তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের যে লক্ষ্য সামনে নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে আগামী এক দশকে দেশের ডেটা সেন্টারের চাহিদা বহু গুণ হওয়া স্বাভাবিক। এই উন্নয়নের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এখনও জাতীয় আলোচনায় খুব একটা জায়গা পায়নি। তা হলো ডেটা সেন্টারে পানির চাহিদা।

সাধারণভাবে আমরা ডেটা সেন্টারকে বিদ্যুৎনির্ভর অবকাঠামো হিসেবে দেখি। বাস্তবে এটি এক উচ্চ পানিনির্ভর শিল্পও বটে। হাজার হাজার সার্ভার সার্বক্ষণিক চালু থাকার কারণে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী কুলিং সিস্টেমের। সেই কুলিং ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করে পানির ওপর।

বিশ্বের বড় বড় ডেটা সেন্টার প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার পানি ব্যবহার করে। বিশেষ করে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশগুলোতে কুলিংয়ের জন্য পানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এআইভিত্তিক ডেটা সেন্টার গড়ে উঠলে এর প্রভাব নগর পানি ব্যবস্থাপনার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো ইতোমধ্যে পানি সংকট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, নদীদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের মুখে রয়েছে। ঢাকা শহরের বড় অংশের পানি এখনও ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলন করা হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। একই সময়ে নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জনসংখ্যা বাড়ার কারণে পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় যদি ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টারগুলোও বিশুদ্ধ সুপেয় পানি বা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে একসময় প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং নগরবাসীর মৌলিক পানির চাহিদার মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্তার এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত কম্পিউটিং সিস্টেমে সাধারণ ডেটা প্রসেসিংয়ের তুলনায় অনেক বেশি কুলিংয়ের দরকার পড়ে। এ কারণে এখনই দেশের ডিজিটাল নীতিতে ‘রিসাইকেল্ড ওয়াটার’ বা পুনর্ব্যবহৃত পানির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
রিসাইকেল্ড ওয়াটার বলতে মূলত পরিশোধিত বর্জ্য পানি বা গ্রে-ওয়াটারকে বোঝায়, যা পুনরায় শিল্প, সেচ, নির্মাণ কিংবা কুলিংয়ের কাজে ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেটা সেন্টারের কুলিংয়ের জন্য পানযোগ্য মানের পানি প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির পরিবর্তে পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহার করা সম্ভব। 

বাংলাদেশের জন্য এটি এক বড় সম্ভাবনাও বটে। প্রতিদিন শহরগুলোতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পানি তৈরি হচ্ছে, যার বড় অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় নদীতে ফেলা হয়। অথচ সঠিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এই পানিকেই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহার করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এই পথে এগিয়েছে। যেমন বহু বছর ধরে উচ্চমানের পুনর্ব্যবহৃত পানি ‘এনইওয়াটার’ প্রকল্পের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যবহার করছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়াতে পুনর্ব্যবহৃত পানিকে শিল্প, সেচ এবং নগর টেকসই ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যাতে সুপেয় পানির ওপর চাপ কমানো যায়। দেশেও ভবিষ্যতের হাই-টেক পার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডেটা সেন্টার ক্লাস্টারগুলোতে একই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। 
একই সঙ্গে ডেটা সেন্টারের অবস্থান নির্ধারণেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে পানি সংকটে থাকা ঢাকা শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে তুলনামূলক পানি নিরাপদ অঞ্চল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনাময় এলাকা এবং পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেটা সেন্টারকে এখন আর শুধু আইসিটি অবকাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভবিষ্যতের জাতীয় অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের অংশ। তাই এর পানি ও জ্বালানি চাহিদাকেও জাতীয় নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের আলোচনায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে দেশ একদিকে যেমন ডিজিটাল অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে, অন্যদিকে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে। ডিজিটাল যুগে তাই শুধু ফাইবার অপটিক কিংবা বিদ্যুৎ নয়; পুনর্ব্যবহৃত পানিও হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম কৌশলগত সম্পদ।

ড. ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী পরিবেশ গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ [email protected]

আরও পড়ুন

×