ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

আগায় নয়, গোড়ায় পানি ঢালুন

আগায় নয়, গোড়ায় পানি ঢালুন
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পশ্চিমা বিশ্ব সামাজিক সুরক্ষা নেটের (সোশ্যাল সেফটি নেট) জন্য অপরাপর বিশ্বে সুপরিচিত। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকরা সামাজিক নিরাপত্তার আশায় পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি দিতে মরিয়া। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত থাকায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর এই ধারণাটি বেশ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়। এ কারণে তিনি এ দেশের মানুষের জীবন আরও সহজ করতে গিয়ে নানা কার্ডের ধারণা নিয়ে এসেছেন। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের সূচনা করেছেন। 

প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে তাঁর জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় সংসদে বারবার বলতে দেখা গেছে। ক’দিন আগে তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে একটি স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন। শিশুরা সুন্দর জামা-কাপড় পরে কীভাবে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, সে দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে এবং নিজ দেশের শিশুদের জীবনেও তিনি এ দৃশ্য দেখতে চান। তাঁর এই বক্তব্যে সংসদ সদস্যরা বেশ উৎসাহের সঙ্গে করতালি দিয়েছেন। এই ঔৎসুক্য কেবল সংসদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যম–উভয় পরিসরে তা জায়গা করে নিয়েছে।

শুক্রবার দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদন মতে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের মাসিক ভাতা বাড়ছে ৫ হাজার টাকা, জুলাই শহীদ পরিবার ও কর্মক্ষমতা হারানো যোদ্ধাদের আবাসনে বরাদ্দ ৩০০ কোটি টাকা, ক্যান্সারসহ ছয় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের অনুদান ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত নিশ্চয় ভালো, কিন্তু প্রশ্নটা হলো এসব সিদ্ধান্তের গোড়ার সমস্যাগুলোর আদৌ সমাধান হবে কিনা?

এই সমাজে একটি কথা প্রচলন আছে–আগায় পানি দিলে হবে না, পানি দিতে হয় গোড়ায়। প্রধানমন্ত্রী যে কার্ডের বন্দোবস্ত করছেন, তাতে সমস্যার কি সমাধান ঘটবে নাকি এটি কেবল আগায় পানি দেওয়ার মতোই সিদ্ধান্ত? আপনি দেশের চিকিৎসাসেবার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। আপনাকে মাসের পর মাস গবেষণা করতে হবে না। আধাঘণ্টা সময় নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে ঘুরে আসুন, জেলায় জেলায় সদর হাসপাতালে গিয়ে ঘুরে আসুন। এতেই আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে গোড়ার সমস্যাটা কোথায়। 
অন্যদিকে, প্রাইভেট হাসপাতালে দেখুন সব ধরনের সেবা আছে, কিন্তু অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পুরো প্রক্রিয়াটাই এমনভাবে সাজানো যে, সরকারি হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে আপনি প্রাইভেট হাসপাতালে যেতে বাধ্য হবেন। এবার তাকিয়ে দেখুন বাজার ব্যবস্থাপনায়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বাড়লে সাধারণ মানুষের কিছুই বলার থাকে না। নীরবে সয়ে যেতে হয়, জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের তালিকায় কাটছাঁট করতে হয়। এর বাইরে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখুন, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, শহরগুলোতে চাঁদাবাজির বন্দোবস্তের দিকে তাকিয়ে দেখুন। এগুলো সামাজিক সুরক্ষা নেট দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।

কার্ড বা অন্য কিছুর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে এনে প্রান্তিক মানুষদের কোনোমতে জীন ধারণের ব্যবস্থা হতে পারে বটে, কিন্তু সমস্যাগুলো জিইয়ে রাখা হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই মাটি ও মানুষের জীবনের দিকে তাকাতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় যেসব অব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর পুনর্গঠন করতে পারলেই তবে বলা যাবে, এই সরকার নতুন পথে এগোচ্ছে। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×