ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিভাগ একীভূতকরণ প্রস্তাবের নেপথ্যে কী
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ২২:২১ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ২২:২৩
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি বিভাগকে একীভূত করে তিনটি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার এক প্রস্তাব এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির সভা থেকে। যদিও সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে, তারপরও বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। এই বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির সভায় এই বিষয়ে পূর্ব নির্ধারিত কোন এজেন্ডা ছিল না। তারপরও কোনো কোনো ডিনের আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহের কারণেই সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, কলা অনুষদের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ, সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগ এবং সংস্কৃত ও পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগকে একীভূত করার প্রস্তাব করা হয়। প্রকাশিত খবর থেকে আরও জানা যায়, সভায় ‘বিবিধ’ অংশে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
হঠাৎ করেই এই একীভূতকরণ প্রসঙ্গ কেন? এই বিষয়েও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, বিভাগ ভর্তির সময় শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। বাজারে চাহিদা না থাকার কারণে কিছু বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার কিছু বিভাগ খোলা হয়েছিল শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে দলভারী করার জন্য। এসব বিবেচনা থেকেই একীভূত করার আলোচনাটি সামনে এসেছে (প্রথম আলো ২ জুলাই, ২০২৬)।
এখন আসি যুক্তিতর্কে। এখানে প্রশ্নত অনেক। একীভূত থেকে আলাদা হওয়াই যদি বিবেচনায় আনা হয় তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিভাগই থাকবে না। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে শুধু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতাই নয়, সমাজবিজ্ঞান থেকে হয়েছে নৃবিজ্ঞান, পপুলেশন সায়েন্স, ক্রিমিনোলজি; রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন। অনেক বিভাগ মিলেই হয়েছে উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ। বিজ্ঞান অনুষদেও হয়েছে এক বিভাগ থেকে অনেক বিভাগ। পদার্থ, রসায়ন, ফার্মেসি, মনোবিজ্ঞান সবই কলবরে ছানাপোনা নিয়ে আছে। বিজনেস অনুষদে মার্কেটিং থেকে হয়েছে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগ; ফিনান্স থেকে হয়েছে ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ। এরকম আরও অনেক উদাহরন দেওয়া যাবে।
তাহলে সব বাদ রেখে এই আটটি বিভাগই আলোচনায় কেন? কলা অনুষদের ক্ষেত্রেও বলা যায় শুধু সংস্কৃত-পালি কিংবা সংগীত, নাট্যকলা ও নৃত্যকলাই একসঙ্গে নয়, একসঙ্গেতো উর্দু এবং ফারসিও। তাহলে সেগুলো এই প্রস্তাবে এলো না কেন? এসেছে বাজারে চাহিদা না থাকার প্রসঙ্গটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠিত বিভিন্ন জ্ঞানকাণ্ডের বাজারে চাহিদা নিয়ে কোন ধরনের গবেষণা হয়েছে কীনা জানা নেই, তবে সেই বিষয়ে ডিনদের কাছে সঠিক তথ্য থাকলে সেটি হাজির করাটা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই বিষয়েও বলা যায়, বিষয় হিসেবে উর্দু, আরবি, ফারসি-এগুলোর বাজারের চাহিদা নিয়ে অতীতেও সংশয় প্রকাশ করে আগেও ভাষা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে একীভূত করার প্রস্তাব এসেছিল। তাহলে সেগুলোকে এই আলোচনায় উল্লেখ না করে কোন বাজার চাহিদার কথা বলা হচ্ছে? এই বিবেচক কারা? কোন স্বার্থকে তারা বিবেচনায় প্রাধান্য দিচ্ছেন?
এর পরের প্রসঙ্গ হলো, শিক্ষার্থী না পাওয়া। কোন বিভাগ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না? তাহলে ডিনস কমিটিকে সেই তথ্য হাজির করতে হবে এবং সেইসব বিভাগে আসন সংখ্যা পূনরায় বিবেচনা করতে হবে। আমার জানামতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর পর পরই আসন সংখ্যার পূনবিন্যাস করা হয় এবং অপেক্ষাকৃত নতুন যে বিভাগগুলো এই একীভূতের আলোচনার টেবিলে এসেছে, সেগুলোর আসন সংখ্যাও খুব কম। তাহলে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছেনা- এর মানে কী আসলে?
সেই সভায় ডিনদেরকে সেই বিভাগগুলোর চেয়ারপার্সনদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে, বিভাগগুলো চাইলে একরকম হবে আর না চাইলে আরেক রকম হবে, যা নিয়ে ডিনস কমিটির পরবর্তী সভায় আলোচনা হবে। ফিল্ম, টেলিভিশন, ও ফটোগ্রাফি, নাটক, নৃত্যকলা, সংগীত এগুলো বিশেষায়িত বিভাগ, এখানে কী অনেক শিক্ষার্থী পড়তে আসবে বলে আমরা ধরে নিবো?
এখানে আরেকটি তথ্য দেয়া প্রয়োজন যে, ডিনরা আসলে কোন এখতিয়ারে বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে এই ডিনস কমিটির সভায় ধরনের প্রস্তাব পেশ করলেন? কারন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী অনুষদগুলোর নিজস্ব অনুষদের সভায় সকল বিভাগের অধ্যাপকদের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া সিদ্ধান্তই ডিনস কমিটি বা অন্যান্য পরিষদ, একাডেমিক কাউন্সিলে জানান। এর বাইরে নিজস্ব চিন্তা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাপ করার কথা নয়। যতদূর জানতে পেরেছি, এই বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ সভায় কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তাহলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ১৬টি বিভাগকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে সেটি ‘বিবিধ’ হয়ে ডিনস কমিটির আলোচনায় স্থান পেল? তাহলে কী ধরেই নিবো যে এগুলো স্ব স্ব অনুষদের ডীনদের ব্যক্তিগত আগ্রহ? তা না হলে কোন আলোচনা, যুক্তি-তর্ক ছাড়াই হঠাৎ করেই এই ধরনের আলোচনা হওয়াটা শুধু সংশয়ই নয়, বরং এর পেছনের বিশাল শক্তির মতাদর্শিক আগ্রহের বড় ধরনের তাগাদা যে রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।
যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নতুন বিভাগ খুলতেই পারে, এবং সেটিই প্রত্যাশিত। এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভিশন, বিশ্বমান, বাজার জীবনমুখী শিক্ষা সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত বেশ কয়েক বছর থেকেই নতুন বিভাগ খোলার পেছনে সব ক্ষেত্রে একাডেমিক ভিশন যেমন গুরুত্ব পায়নি, তেমনি যাচাইও করা হয়নি বাজার। সেখানে মূখ্য ছিল দলীয় রাজনীতি। এখনও এটি মূখ্য, তবে সেগুলোর ক্ষেত্রে মতাদর্শিক দেন দরবার ও জেঁকে যে বসেছে, তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- উচ্চশিক্ষা