ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নগর পরিকল্পনা

আমাদের যানজট ভাবনা কিংবা জুতা আবিষ্কার

আমাদের যানজট ভাবনা কিংবা জুতা আবিষ্কার
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় রাজা হবুচন্দ্র তাঁর পা ধুলামুক্ত রাখতে বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। এ নিয়ে মন্ত্রী গোবুচন্দ্রের ঘুম হারাম। ঘুম হারাম রাজ্যের সব মন্ত্রী, আমলা, পণ্ডিতের। কেউ বলেন, রাজা ঘর থেকে না বেরোলেই হলো। তা সম্ভব না বলে কেউ পরামর্শ দেন ঝেঁটিয়ে ধুলা দূর করতে। সেটিই মোক্ষম উপায় ভেবে ঝাঁট দেওয়া শুরু হলে গোটা রাজ্য ধুলাময়। সেই ধুলা রাজারও নাক-চোখ-মুখে ঢোকে। তা থেকে বাঁচতে শুরু হলো পানি ছিটানো। সে আরেক কেলেঙ্কারি! এক পর্যায়ে পণ্ডিতরা অনেক ভেবেচিন্তে ফয়সালা দিলেন পৃথিবীটাকে চামড়া দিয়ে মুড়তে। খোঁজ পড়ল মুচির। তিনি বললেন, রাজার পা চামড়া দিয়ে মুড়ে দিলেই তো হয়। সেই সুবাদে মানব জাতি জুতা পেয়ে গেল।

ঢাকার যানজট নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরাও যেন রাজা হবুচন্দ্রের পারিষদবর্গের মতোই সমস্যায় পড়েছেন। কখনও ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মনোরেল, মেট্রোরেল ইত্যাদিতে সমাধান দেখছেন। আবার ভাবছেন, বাস ও রেলস্টেশন ঢাকার বাইরে পাঠালেই মিলবে মোক্ষম সমাধান।

এক-এগারোর সরকারের এক শক্তিশালী উপদেষ্টা ঢাকা শহরের যানজটের জন্য দায়ী করলেন রেলওয়েকে। তিনি বললেন, কমলাপুর রেলস্টেশন তুলে দিয়ে জয়দেবপুরে প্রান্তিক স্টেশন করলে সব সমস্যার সমাধান। যথারীতি এর সমর্থকও খুঁজে পাওয়া গেল ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে। বাড়ি যাওয়ার জন্য আমার অনুজ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল সেখানে। এক নেতা-গোছের মানুষ অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বোঝাচ্ছেন, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকায় রেলের প্রবেশ বন্ধ করতেই হবে। প্রান্তিক স্টেশন হতে হবে জয়দেবপুর। ছোট জটলার ভেতর থেকে আমার অনুজ বলল, আরও ভালো হয় যমুনা সেতু পশ্চিমে প্রান্তিক স্টেশন হলে। নেতা একটু ধাক্কা খেলেন। বললেন, ট্রেন ধরতে অতদূর যাবেন কীভাবে? কেন? যেভাবে জয়দেবপুর  যাবেন; অনুজের জবাব।

বিভিন্ন দেশের রাজধানী বা বড় শহরের কেন্দ্রস্থলেই রেলস্টেশন দেখেছি। ভারতে প্রায় পৌনে দুইশ বছর আগে মুম্বাই, হাওড়া, শিয়ালদহ (কলকাতা) বা চেন্নাইতে যে স্টেশন হয়েছে; কালে তার আকার বেড়েছে কিন্তু ঠাঁই বদলায়নি। ১৮৭১ সালে যেখানে বার্লিনের প্রথম রেলস্টেশন হয়েছিল; নানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে সে স্টেশন এখনও সেখানে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের নানান দেশের শহরের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যাওয়ার প্রধান টার্মিনাল লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন ১৯৩২ সাল থেকে আছে একই স্থানে।

প্রায় দেড়শ বছর কলকাতার নগর পরিবহন এক জায়গা থেকেই কেন্দ্রীয় পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছে। শুধু মহানগরী নয়; পশ্চিমবাংলার যে কোনো শহরে যেতে বাসের ঠিকানা এসপ্লানেড। ঢাকায় মোটরগাড়ি আসার অনেক আগেই রেল এলো। নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ রেলপথে যুক্ত হলো; নদীপথের ব্যবসায় কমতে থাকল। পরে যখন মোটরগাড়ি এলো তখন নদীপথের বদলে সড়কের কদর বাড়ল। ঢাকায় নদীর প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে থাকল। খাল ভরাট হয়ে সড়ক হলো। একই সড়কে যান্ত্রিক, অযান্ত্রিক গতিবান ও ধীরগতির বাহন চলল; ট্রাফিক আইনের মান্যতা হলো দুর্বলতার পরিচায়ক। সবার কৃতিত্বে লেগে থাকল যানজট। নাকাল হলো জনজীবন।

কালের পরিক্রমায় পৃথিবীর সব নগরই বাড়ে। ঢাকাও বাড়ল। আয়তন, দালানকোঠা, মানুষজন এবং যানবাহনও। ফুলবাড়িয়া থেকে রেলস্টেশন চলে গেল কমলাপুর। ফুলবাড়িয়ায় রেলের জায়গা ছিল ৫০ একর। সেখানে ৩২ একর জায়গা নিয়ে কমলাপুরে সরে গেল স্টেশন। এখন ব্যস্ত সময়ে সড়ক থেকে কমলাপুর স্টেশনে ঢুকতে বেরোতে টের পাওয়া যায় কত গমে কত আটা। 

রেলস্টেশন সরে গেলে ফুলবাড়িয়া হলো বাসের ঘাঁটি। গুলিস্তান থেকে চানখাঁরপুল বাসের আবাস। রেলের ছেড়ে দেওয়া পুরো জায়গা যদি হতো বাস টার্মিনাল, তাহলে সরানোর ভাবনা হয়তো ভাবতে হতো না। শহরের কেন্দ্র থেকে বাস টার্মিনাল চলে গেল মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদে, যা তখনকার হিসাবে ঢাকার বাইরে। কিন্তু বিশেষ করে মহাখালী ও সায়েদাবাদ এখন শহরের আরেকটা করে ভরকেন্দ্র। অতএব আবার হুকুম– সরাও দূরে। বাস টার্মিনাল হবে কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, কাঁচপুর ও টঙ্গীর কাছাকাছি। উদ্দেশ্য ঢাকা মহানগরীতে বাসের প্রবেশ বন্ধ করে যানজট দূর।

খারাপ ফল করা ছাত্রের অভিভাবক সন্তানের লেখাপড়ার মান বাড়ানোর চেষ্টা না করে স্কুল পাল্টান। শিক্ষার্থী নতুন স্কুলে গিয়ে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে আরও খারাপ ফল করে। এবারও অভিভাবক দোষ দেন স্কুলের। সন্তান আর কখনোই ভালো ফল করে না। তেমনি করে আমরা যানজট নিরসনে বাস টার্মিনাল সরানোই সমাধান ভাবি, যা কেবল যানজটকে আরও বিস্তৃত করবে।
কেন যেন দূরপাল্লার যাত্রী নিয়ে আমাদের ভাবনা শুধু ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছু আর চাকরিপ্রত্যাশীদের কেন্দ্র করে। যেন তারাই শুধু দূরপাল্লায় ভ্রমণ করেন। পরিবার-পরিজন, লটবহর সঙ্গে নিয়ে যেন কেউ বাস-ট্রেনে ভ্রমণ করেন না।

ভাবনাটা এমন, তেমনধারার যাত্রীরা ব্যক্তিগত, না হয় ভাড়ার ছোট গাড়িতে চলাচল করুক। শনির আখড়া বা মাতুয়াইলের কাউকে যদি পরিবার-পরিজন নিয়ে হেমায়েতপুর বা টঙ্গী গিয়ে বাসে উঠতে হয় তাহলে কেউ হয়তো বলবেন– কেন; আগে তো মহাখালী বা গাবতলী গিয়ে উঠতে পেরেছেন। এখন সমস্যাটা কোথায়? তেমনি মিরপুর, মোহাম্মদপুরবাসীর জন্য কাঁচপুর। তাদের জন্য বলি, তাহলে বাস টার্মিনাল সোজা জয়দেবপুর, নয়ারহাট, সোনারগাঁয়ে নিয়ে যান। পাবলিক যেভাবে টঙ্গী, হেমায়েতপুর, কাঁচপুর যাবে; সেভাবে জয়দেবপুর, নয়ারহাট, সোনারগাঁও যাবে। ইশ্, যদি চামার কুলপতির আদলে কেউ এসে জুতা আবিষ্কারের মতো পরামর্শ দিতেন! তাহলে সমস্যাকে জটিল না করে হয়তো সহজ চিন্তাই বের হতো। গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে টার্মিনাল রেখেই যানজটের সমাধান মিলত।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×