উচ্চারণের বিপরীতে
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগউত্তর রাজনৈতিক ধাঁধা
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন যে তাঁর পূর্ণ মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকতে পারবেন না– এটা অনুমিতই ছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী বিএনপি সরকার তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে রাখবেই বা কেন? জুলাই-আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ন্যূনতম ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। যতই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকুক; জাতির মহাবিপর্যয়কালে তাঁর নিরুচ্চার ভূমিকা ইতিহাসের অক্ষয় কালো দাগ হয়ে থাকবে।
স্বীকার করতেই হবে, গণঅভ্যুত্থানউত্তর অস্থির ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মোঃ সাহাবুদ্দিনের দায়িত্বশীল ভূমিকা গণতন্ত্রে উত্তরণে সহায়ক হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন অনুসারে জাতীয় সংসদে ভাষণদানসহ সকল কাজই সংবিধান মেনে করেছেন।
এটি স্পষ্ট, মোঃ সাহাবুদ্দিনের অনুপস্থিতি বা অসহযোগিতা গণঅভ্যুত্থানউত্তর সরকার থেকে নির্বাচনউত্তর সরকার গঠন পর্যন্ত দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণে গুরুতর বিঘ্ন ঘটাতে পারত। বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মব সন্ত্রাস, উৎপীড়ন, বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির ধীরস্থির ও পরিণত রাজনৈতিক ভূমিকা কার্যকর অবদান রেখেছিল। তবে বিএনপি চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিজেদের নির্বাচিত মনোনীত রাষ্ট্রপতির অধীনে অনুষ্ঠানের সময়সীমা হিসাব করেই সাহাবুদ্দিনকে বিদায়ের বারতা দিয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা। কার্যকারণ মেলাতে অসুবিধা হবার কথা নয়।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতি আলংকারিক পদ। তারপরও রাষ্ট্রের যে কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা বা অনিশ্চয়তা অথবা নির্বাচনকালে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। যে কারণে আগামী রাষ্ট্রপতি কে হবেন– এ নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিনের সম্পর্কে বহুল উচ্চারিত বিভিন্ন অভিযোগও সামনে চলে আসছে। মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগউত্তর সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ তাহলে কী?
২.
‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মোঃ সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করে এনসিপি নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখছেন। তবে তারা ভুলে যাচ্ছেন, সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতির কাছেই তাদের নেতারা শপথ গ্রহণ করে সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সংসদেও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের অসহযোগিতামূলক ভূমিকা একই সত্য সামনে আনে। বিরোধী দলের দ্বিচারিতা গণভোট নিয়েও অব্যাহত।
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা না করে চারটি প্রশ্ন ঠিক করে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় নেমে গিয়েছিল! অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রতারণামূলক আচরণের কারণে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ের পর ‘গণভোটের রায়’ বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করে। দলটির যুক্তি– জুলাই সনদে তারা যে ১১টি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, জুলাই সনদে সেগুলোও অগ্রাহ্য করা হয়। অথচ প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী সংসদে জামায়াত ও এনসিপির রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে ‘গণভোট’ বাস্তবায়নে বিএনপিকে বাধ্য করবার অনবরত চেষ্টায়।
শনিবার সিলেটে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জনগণ পরিবর্তনের জন্য, সংস্কারের জন্য গণভোটে হ্যাঁ বলেছে। ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ বলেছে। গণভোটকে আমরা অপমান করতে দেব না।’ একই সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সরকার যদি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ তারা সম্পন্ন করতে পারবে না।’ এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বলেছেন, ‘জামায়াতের আমির, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও শাইখুল হাদিস মামুনুল হক– এই তিন নেতা এক হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে’ (সমকাল, ২৬ জুলাই, ২০২৬)।
বিরোধী নেতাদের এসব কথাকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না। অনস্বীকার্য, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একটি পর্যায়ে নিছক এক ব্যক্তির শাসনের অপসারণের জন্যই আর ছিল না। বরং জনবান্ধব রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল সেই গণআন্দোলনের মূল প্রত্যয়। অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন করেছিল; সেগুলোর মধ্যে কার্যকর রাষ্ট্র সংস্কারের অভিপ্রায় ছিল। এর মধ্যে কেবল সংবিধান সংস্কার রিপোর্ট নিয়েই বিরোধী দল সোচ্চার; বাকিগুলো নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অধ্যাদেশ বিএনপি জাতীয় সংসদে পাস করেছে। এর অধিকাংশ নিয়মিত কার্যক্রম সংক্রান্ত। মানবাধিকার, গুম, খুনসহ সরকারের জবাবদিহি সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো তারা পাস করেনি। চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর চার মাসের বেশি দুদক কার্যত নেতৃত্বশূন্য। এখনও দুদক অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ নিয়েও একই ঘটনা ঘটেছে। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির সবকটি দরজা কার্যত বন্ধ করে রেখেছে সরকার।
এদিকে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল অংশ না নিয়ে কোন ইতিবাচক ঘটনা ঘটাল? সংস্কার ও সংশোধনীর শব্দগত ধাঁধায় না জড়িয়ে বিরোধী দল সংবিধান কমিটি ও সংসদে যুগপৎ সংস্কার বা সংশোধনীর যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা করতে পারত।

৩.
রাজনীতিতে সামনে চোখ রাখা জরুরি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোঃ সাহাবুদ্দিনকে মনোনয়নে আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্বের কর্তৃত্ববাদ কাজ করেছে, সন্দেহ নেই। নইলে দলীয় রাজনীতিতে পাঁচ-ছয় দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন না দিয়ে কেন দুদকের জনৈক কমিশনারকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে হয়েছিল, তা বুদ্ধির অগম্য। বিএনপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কী করবে? বিএনপির রাজনীতিতে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরই এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তাতে রাজনীতিবিদদের হাতেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত থাকার বার্তা যেমন যাবে; সমাজে সত্যিকার রাজনৈতিক অনুশীলনের গুরুত্বও বাড়বে। অবশ্য সরকার প্রায়শ যার যা কাজ নয়, তাকে সেই কাজে যুক্ত করে জবাবদিহির পরিবেশ জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে কখনোই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে একসঙ্গে এত দলীয় লোক নিয়োগ দেখা যায়নি (প্রথম আলো, ২৭ জুলাই ২০২৬)। নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্য মুখ্য হয়ে উঠলে পেশাদারিত্ব ক্ষুণ্ন হয়। আমলাতন্ত্র আমলাদের হাতেই পরিচালিত হওয়া উচিত, রাজনীতি যেমন রাজনীতিবিদদের হাতে।
অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্যতা সবকিছুর নিয়ামক হয়ে ওঠে। সংসদে বিরোধী দলের দুর্বল যুক্তিতর্ক যেমন সরকারের ঘাটতি শনাক্তে ব্যর্থ হচ্ছে; পাশাপাশি বিরোধী কোনো কোনো নেতার কেলেঙ্কারি সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। সর্বশেষ সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভিডিও কেলেঙ্কারির পর জামায়াত তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের মাধ্যমে মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছে।
নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার না করে উপযুক্ত দক্ষতার প্রমাণ না দিয়ে যেনতেন উপায়ে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া আমাদের রাজনীতির পুরোনো সংস্কৃতি। বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলকে যার যার ক্ষেত্রে অবস্থান ও দক্ষতার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রাখতে হবে। নইলে আগামী দিনের রাজনীতিও পুরোনো ধারায় পারস্পরিক দোষারোপের ধাঁধায় ঘুরপাক খাবে।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
- রাজনীতি