ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

উন্নয়নের নির্মম স্ববিরোধিতা

উন্নয়নের নির্মম স্ববিরোধিতা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতিবিদ, আমলা ও অন্যান্য নীতিনির্ধারক রাষ্ট্রীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ সুরক্ষা এবং বন সংরক্ষণের নানাবিধ জোরালো প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন– বিশেষ করে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বর্জ্যের ভাগাড় বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন- এসটিএস, যা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধীনে নির্মাণ করা হচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বনের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমতি দিয়েছে। পুরো নীতিনির্ধারক শ্রেণির ভূমিকা যেন উন্নয়নের নামে বনখেকো। 
শুধু ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে নয়; কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও হাতির করিডোরের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ আমাদের পরিবেশগত নীতি ও উন্নয়নের ধারণাকে এক নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতর বর্জ্য ফেলার স্থান বা ভাগাড় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

‘বন আইন, ১৯২৭’ এবং ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’ অনুযায়ী জাতীয় উদ্যান বা সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের স্থাপনা তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ বন অধিদপ্তরের নাকের ডগায় এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পাঁয়তারা চলছে। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) গবেষণা অনুযায়ী, গত দুই দশকে গাজীপুরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বনভূমি ও জলাশয় হারিয়ে গেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের ওপর দাঁড়িয়ে যদি আবার বনের ভেতর বর্জ্যের ভাগাড় স্থাপন করা হয়, তবে অবশিষ্ট প্রকৃতিও চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।
একই চিত্র ফুটে উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং হাতির চলাচলের করিডোরে।

আইইউসিএনের সমীক্ষায় চিহ্নিত গুরুত্বপূর্ণ হাতির করিডোর ও সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বনের মাঝখান দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল শুরু হলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল খণ্ডিত হবে; বাড়বে মানুষ-হাতি সংঘাত। এতে বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় বনের জমিতে বিদ্যুৎ লাইন বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়গুলোর কথা সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত উঠে আসে।
প্রশ্ন হলো, একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে খোদ সরকারি বা আধা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেই কেন বনের বুক চিরে এসব ধ্বংসাত্মক প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে? এটি নীতিমালার সঙ্গে এক ভয়ংকর স্ববিরোধিতা। উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি প্রকৃতি ও প্রাণিকুলকে ধ্বংস করে, তবে তা কোনো টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। সংবিধানও রাষ্ট্রকে বন ও পরিবেশ রক্ষার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে।

আরও উদ্বেগের কারণ দেশের প্রভাবশালী মহলের তৎপরতা। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের একটা প্রভাব থাকে। কিন্তু প্রায় সময়ই সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের বন নিধন কিংবা দখলে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বড় কোনো প্রতিবাদ গড়ে ওঠে না।
দেশের বনাঞ্চল ধ্বংসের পেছনে রাজনীতিবিদদের এই সম্পৃক্ততা বন্ধ না হলে এগুলো থামানো সম্ভব নয়। বিএনপি সরকার খাল খননসহ পরিবেশ রক্ষামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিক হলে এসব ধ্বংসাত্মক কাজ বন্ধ করা সম্ভব। 

সরকারের অভিপ্রায় যদি শুধু কাগজ-কলমে বা প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বন রক্ষা করা অসম্ভব। বনভূমি ও জাতীয় উদ্যানগুলোকে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও বিধ্বংসী প্রকল্প থেকে মুক্ত রাখতে হবে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভাগাড় নির্মাণ এবং কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনের ভেতরের সড়ক নির্মাণ প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প খুঁজতে হবে। দেশের অস্তিত্ব রক্ষার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বার্থে বন রক্ষায় সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা নিতে হবে।

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×