সাক্ষাৎকার : ফরহাদ মজহার
গণঅভ্যুত্থান জনগণ ঘটালেও পরিণাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় দেশি-বিদেশি শক্তি
ফরহাদ মজহার
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ফরহাদ মজহার দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা-উবিনীগ এবং নয়াকৃষি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সম্পাদনা করছেন ‘সাপ্তাহিক চিন্তা’। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঔষধশাস্ত্রে স্নাতক, পরে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চ থেকে অর্থশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’, ‘মোকাবিলা’, ‘এবাদতনামা’, ‘সাম্রাজ্যবাদ’, ‘মার্কস, ফুকো ও রুহানিয়াত’, ‘ক্ষমতার বিকার’ ইত্যাদি। ফরহাদ মজহারের জন্ম ১৯৪৭ সালে, নোয়াখালীতে। এই সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশ আজ প্রকাশ হচ্ছে; সোমবার প্রকাশিত হবে দ্বিতীয় অংশ। সমকালের পক্ষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
সমকাল: অনেকে বলেন, আপনার চিন্তাভাবনা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তরুণদের প্রভাবিত করেছে। আবার কেউ কেউ গণঅভ্যুত্থানকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলেছেন; মার্কিন সহায়তায় ‘রেজিম চেঞ্জ’ বলেছেন। আপনিও গতবছর সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গণঅভ্যুত্থান রেজিম চেঞ্জ হয়ে যাওয়ার কথা খানিকটা ভিন্নভাবে বলেছিলেন।
ফরহাদ মজহার: আমি তো ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কয়েক বছর আগে থেকেই গণঅভ্যুত্থানের কথা বলে আসছিলাম। আমার বই ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বের হয় ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের ঠিক এক বছর আগে। আবার গণঅধিকার পরিষদের একটি সভায় আমি আগেই বলেছিলাম, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পদত্যাগ বা পতনের প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়। একই সঙ্গে আমি সতর্ক করেছিলাম– আমাদের কাজ শুধু শেখ হাসিনাকে সরানো নয়; পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলানো। কারণ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির লুটপাটের হাতিয়ারের অধিক কিছু না। বিশ্ব অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতির বাস্তবতা অনুধাবন করে নিজেদের আর্থসামাজিক বিকাশ দ্রুত ও ত্বরান্বিত করতে হলে রাষ্ট্র নতুন করে গঠন করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। তার জন্য নতুন রাজনৈতিক কল্পনা, গণরাজনীতির নতুন ভাষা আবিষ্কার এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের বিপরীতে কীভাবে আমরা শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, সেটা বুঝতে হবে। করপোরেট পুঁজির স্ফীতি ও পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়ার বিপরীতে নিজেদের সস্তা শ্রম সরবরাহের দেশ হিসেবে পড়ে থাকার বিপদ আগামী দিনগুলোতে আরও ভয়ংকর হবে। বুঝতে হবে, তিলে তিলে ধ্বংস হওয়ার প্রক্রিয়া যে কোনো মূল্যে আমাদের রুখতে হবে। তার জন্য সেক্যুলার এবং ধর্মীয় জাতিবাদের বিভাজনে বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করবার রাজনীতি থেকে বের হয়ে এসে লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণি এবং তাদের লুটতরাজের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। অন্ধকারে খাবি না খেয়ে কীভাবে আমরা আমাদের আর্থসামাজিক উন্নতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পারি, সেই দিকে প্রখর মনোযোগী হতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াকেই আমি নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠন করার কর্তব্য বলে থাকি।
সমকাল: রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠন প্রক্রিয়ায় বিদেশি শক্তিগুলো কি প্রভাব বিস্তার করতে পারে?
ফরহাদ মজহার: ওয়াশিংটন হোক বা দিল্লি; পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করবেই। বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি মার্কিন রাষ্ট্রদূত এনসিপির দপ্তরে গিয়েছেন। কূটনৈতিক সম্পর্ক মূলত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। কোনো দেশের রাজনৈতিক দল সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপার। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের যুগে এই সীমানা পরাশক্তিগুলো মানে না। এটা তো পরিষ্কার– পরাশক্তিগুলো এ অঞ্চলে তাদের স্বার্থ দেখবেই।
সমকাল: সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
ফরহাদ মজহার: এখানে আমাদের একটা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা আছে। জাতিবাদী আবেগের কারণে আমরা সাংস্কৃতিক বা পরিচয়কেন্দ্রিক চেতনাকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তি যেমন আর্থসামাজিক ও শ্রেণি সম্পর্ক, জ্বালানি, কৃষি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়কে অতিরিক্ত গৌণ করে ফেলি। ফলে রাষ্ট্রকে প্রায়ই একটি স্বাধীন, পবিত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হাওয়াই সত্তা হিসেবে কল্পনা করি। যেন একটি রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছায় চলে; বিশ্বপুঁজি, সামরিক শক্তি, ঋণ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক নির্ভরতা বা ভূ-রাজনৈতিক চাপ তাকে ছুঁতে পারে না। এই ধারণা রোমান্টিক, কিন্তু অতিশয় অবাস্তব। দুর্বল ও নির্ভরশীল রাষ্ট্রগুলো সব সময়ই বড় শক্তির টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে। বাংলাদেশের মতো দেশের রাজনীতি বুঝতে হলে অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশক্তি এবং বাইরের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি– দুটোকেই একসঙ্গে বুঝতে হবে। শেখ হাসিনার পতন আসন্ন– এটা বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ সব বড় শক্তিরই ছিল। তারা নিশ্চয়ই ভাবছিল, হাসিনা চলে গেলে বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলাবে; নতুন সরকার কার দিকে ঝুঁকবে এবং তাদের সামরিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা নিরাপদ থাকবে। তারা বাংলাদেশের সম্ভাব্য রূপান্তরকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে দিতে চাইবে কেন? এমনকি দিল্লিও নিশ্চয় বুঝেছিল, একটি ব্যক্তি ও একটি দলের ওপর পুরোপুরি বাজি রেখে তারা বড় ভুল করেছে। এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা যে বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি, তা শেখ হাসিনার পতনের আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
সমকাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে বুঝতে হলেও কি অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশক্তি এবং বাইরের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে একসঙ্গে বুঝতে হবে?
ফরহাদ মজহার: পরাশক্তিগুলো কী চেয়েছিল, শুধু তা দিয়ে গণঅভ্যুত্থান বোঝা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে বাস্তবে কী ঘটেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অবশ্যই একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল। জনগণ সেদিন কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী ছিল না; তারা নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হিসেবে হাজির হয়েছিল। এই ক্ষমতাকেই রাজনৈতিক সাহিত্যে বলা হয় জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বা ‘কনস্টিট্যুয়েন্ট পাওয়ার’। এর মানে হলো, জনগণ পুরোনো শাসনের বৈধতা বাতিল করেছে এবং নতুন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার অধিকার নিজের হাতে নিয়েছে। কিন্তু আমরা সেই গাঠনিক ক্ষমতাকে গাঠনিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে পারিনি। অর্থাৎ জনগণের বিদ্রোহী শক্তিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত করতে পারিনি যেন শক্তিশালী রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ করা যায়। বরং ৮ আগস্ট ঘটল ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’। ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষার নামে পুরোনো সংবিধানের অধীনে শপথ নেওয়া হলো এবং পুরোনো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অক্ষত রাখা হলো।
সমকাল: সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নামে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব কীভাবে ঘটল? ব্যাখ্যা করবেন?
ফরহাদ মজহার: শেখ হাসিনা চলে গেলেন, তাঁর সরকার গেল। কিন্তু যে রাষ্ট্রীয় গঠন শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট শাসক বানিয়েছিল, সেই গঠন বহাল রইল। এই পার্থক্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি শেখ হাসিনা আর ‘হাসিনা ব্যবস্থা’ এক কথা নয়। হাসিনা ব্যবস্থা মানে ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ, দলীয় প্রশাসন, জবাবদিহিহীন পুলিশ, রাজনৈতিক আদালত, লুটেরা-মাফিয়া অর্থনীতি, ব্যাংক লুট, দুর্নীতি, সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং এমন একটি সংবিধান, যার অধীনে জনগণ নয়; রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসকগোষ্ঠীই বাস্তব ক্ষমতার মালিক। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে এই ব্যবস্থাকে রেখে দিলে সরকার বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্র বদলায় না। গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আমি বলেছিলাম, নতুন সরকারকে শহীদ মিনার বা রাজু ভাস্কর্যের সামনে জনগণের কাছে শপথ নিতে হবে। কারণ পুরোনো সংবিধানের কাছে শপথ নেওয়ার অর্থ ছিল পুরোনো ব্যবস্থার বৈধতা আবার মেনে নেওয়া। অথচ গণঅভ্যুত্থান সেই বৈধতাই বাতিল করেছিল। নতুন সরকারের উচিত ছিল জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে জনগণের সামনে দাঁড়ানো।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীও ভূমিকা রেখেছে।
ফরহাদ মজহার: বিশেষত সৈনিকদের ভূমিকা ভুলে গেলে চলবে না। সাধারণ সৈনিকরা জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেছিল– গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পেছনে সেটা একটা প্রধান কারণ ছিল। অর্থাৎ ৫ আগস্টের বিজয় শুধু ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বীরত্বের ফল নয়। এটি ছাত্র-জনতা ও সাধারণ সৈনিকদের এক ধরনের বৈপ্লবিক মৈত্রীরও ফল। রাষ্ট্রের সশস্ত্র শক্তির একটি অংশ যখন জনগণের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়নি, তখনই ফ্যাসিস্ট শাসনের ভিত ভেঙে পড়ে।
সমকাল: কেউ কেউ বলেন, লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নামানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে।
ফরহাদ মজহার: এ ধরনের দাবি শুধু ভুল নয়; রাজনৈতিক দিক থেকে বিপজ্জনকও। শেখ হাসিনার পতনের পর বিদেশি শক্তি যদি নতুন ক্ষমতার বন্দোবস্তে প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তার মানে এই নয় যে, তারাই জনগণের বিদ্রোহ সৃষ্টি করেছে। বিদেশি শক্তি রাজনৈতিক সংকট কাজে লাগাতে পারে; ক্ষমতা বদলের সুযোগ নিতে পারে; বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। এমনকি ফলাফল নিজেদের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারা মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অপমান, বঞ্চনা ও বিদ্রোহী ইচ্ছা বানিয়ে দিতে পারে না। তারা তরুণদের বেকারত্ব তৈরি করতে পারে না; যদি সেই বেকারত্ব পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল হয়। তারা মায়ের সামনে সন্তানকে গুলি করার দৃশ্য দেখে মানুষের ভেতরে যে ক্ষোভ জন্মায়, সেটাও বাইরে থেকে আমদানি করতে পারে না। তাই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যা ঘটেছে, তাকে শুধু ‘মার্কিন রেজিম চেঞ্জ’ বলা ভয়াবহ বোকামি। আবার পরে বিদেশি শক্তির ভূমিকা অস্বীকার করাও শিশুসুলভ সরলতা। সঠিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হলো: জনগণ গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরিণাম নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশি ও বিদেশি শক্তি সক্রিয় হয়েছে। জনগণ শাসককে সরিয়েছে, কিন্তু পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলো রূপান্তরের পথ আটকে দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থান শেষাবধি সরকার বদল বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এ পর্যবসিত হয়েছে।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থান নিয়ে সব ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ কি আপনি বাতিল করে দিচ্ছেন?
ফরহাদ মজহার: ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে রাজনীতির ব্যাখ্যা হয় না। ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, বৈঠক হতে পারে, গোপন সমঝোতা হতে পারে, বিদেশি যোগাযোগও থাকতে পারে। কিন্তু ষড়যন্ত্র কোনো সমাজের কোটি মানুষের রাজনৈতিক জাগরণ ব্যাখ্যা করে না। বরং ‘সবই ষড়যন্ত্র’ বলা জনগণের রাজনৈতিক কর্তাসত্তা অস্বীকার করার ভাষা। এর মানে দাঁড়ায়– বাংলাদেশের মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষা থেকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না; তাদের সব সময় বাইরে থেকে কেউ চালায়। এটি একটি নিকৃষ্ট ঔপনিবেশিক মনমানসিকতা।
সমকাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
ফরহাদ মজহার: গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো দল, সরকার, নির্বাচন বা সংস্কার কমিশন নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, জনগণ একবার নিজের শক্তি নিজের চোখে দেখেছে। মানুষ জেনেছে, রাষ্ট্র যতই ভয়ংকর মনে হোক; জনগণ ভয় ভেঙে একসঙ্গে দাঁড়ালে বন্দুক, আদালত, আমলাতন্ত্র, দলীয় বাহিনী ও প্রচারযন্ত্র দিয়েও ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা যায় না। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ছিল এই গণশক্তির প্রত্যক্ষ ফল। জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নির্ণায়ক ছেদ। অর্থাৎ পুরোনো ক্ষমতার সম্পর্ক ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার ঘটনা। কিন্তু দরজা খোলা আর নতুন ঘর বানানো এক কথা নয়। দরজা আমরা খুলেছি; নতুন রাষ্ট্র এখনও বানাতে পারিনি।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থান দরজা খুলেছে; কিন্তু নতুন ঘর বানাতে না পারায় আপনি কি হতাশ?
ফরহাদ মজহার: এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইতিহাসে বড় রূপান্তর এক লহমায় সম্পন্ন হয় না। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানও সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেনি; কিন্তু তা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পথ খুলে দিয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাইকেও আমি কোনো সমাপ্ত ঘটনা মনে করি না। এটি একটি দীর্ঘ রূপান্তরের শুরু। আমার ধারণা, এর অভিঘাত শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো উপমহাদেশের তরুণদের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে। আমরা ইতোমধ্যে ভারতে তরুণদের নতুন ধরনের বিদ্রোহী ভাষা ও সংগঠনের লক্ষণ দেখছি। ককরোচ বা আরশোলা– ককরোচ জনতা পার্টি। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা মনে করলে ভুল হবে।
সমকাল: ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির তো শুরু থেকেই রাজনৈতিক অভিমুখ ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার নিয়ে।
ফরহাদ মজহার: জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা প্রশ্নে। কিন্তু খুব দ্রুত তা চাকরি বা কোটা সংস্কারের সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সরাসরি বিরোধে পরিণত হয়। নির্বিচার গুলি, হত্যা, ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার তরুণদের ক্ষোভকে সারাদেশের মানুষের বিদ্রোহে বদলে দেয়। রাষ্ট্র ভেবেছিল, দমন করলে আন্দোলন থেমে যাবে। বাস্তবে উল্টো ঘটেছে। যত গুলি চলেছে, যত লাশ পড়েছে, তত বেশি মানুষ বুঝেছে, এটি আর কোটার প্রশ্ন নয়; এটি জীবন, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের মালিকানা নিয়ে লড়াই। বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বড় অর্জন হলো, তরুণরা নিজেদের শুধু চাকরিপ্রার্থী, পরীক্ষার্থী বা সামাজিক মাধ্যমের ভোক্তা হিসেবে দেখেনি। তারা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হয়ে উঠেছিল। তারা রাষ্ট্রকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছে: তুমি কার রাষ্ট্র? তুমি জনগণের জীবন রক্ষা করো; নাকি একটি দল, একটি পরিবার এবং লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির পাহারাদার? এই প্রশ্নই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ। একই ভূখণ্ডে বাস করলেই মানুষ রাজনৈতিক জনগণ হয় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং ভবিষ্যতের দায় গ্রহণ করে মানুষ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠে। জুলাইয়ে আমরা তার এক বিরল হাজিরা দেখেছি।
সমকাল: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আর কোনো অর্জন দেখেন?
ফরহাদ মজহার: দীর্ঘদিনের ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি ভেঙেছে। আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচন, বিচার, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় শাসনের যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল। জুলাই সেই ব্যবস্থার নৈতিক বৈধতা ধ্বংস করেছে। মানুষ আর আগের মতো রাষ্ট্রকে অপরিবর্তনীয় শক্তি মনে করে না।
সমকাল: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের ভোটাধিকারও ফিরেছে।
ফরহাদ মজহার: একে জুলাইয়ের বাস্তব ফল বলতে হবে। কিন্তু নির্বাচন হওয়া আর গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য পূরণ হওয়া এক কথা নয়। ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দেওয়ার অধিকারে নামিয়ে আনা যাবে না। আমরা শাসক সরিয়েছি, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা ও সার্বিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বদলায়নি। যে রাষ্ট্রীয় গঠন বারবার ফ্যাসিবাদ জন্ম দেয়– ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় প্রশাসন, জবাবদিহিহীন পুলিশ, লুটেরা অর্থনীতি, রাজনৈতিক বিচার ব্যবস্থা এবং জনগণের ওপরে সংবিধানের কর্তৃত্ব; তার মৌলিক বদল এখনও ঘটেনি। উপদেষ্টা সরকারের সময়েও আমরা দেখেছি, জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার বদলে দলীয় দর-কষাকষি, সংস্কার কমিশন, নির্বাচনের তারিখ এবং ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারাই প্রধান হয়ে উঠেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের ভেতরের সামাজিক দাবিগুলো রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হতে পারেনি। কর্মসংস্থান, মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, কৃষি ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার, ব্যাংক লুটের বিচার, পাচার করা সম্পদ ফেরত আনা এবং লুটেরা-মাফিয়া অর্থনীতি ভেঙে ফেলার প্রশ্ন পেছনে পড়ে গেছে। নারী, শ্রমিক, কৃষক, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখলেও এখনও তাদের কণ্ঠ যথেষ্ট জায়গা পায়নি।
সমকাল: দুই বছর পর গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে দেখছেন?
ফরহাদ মজহার: দুই বছর পর জুলাইয়ের হিসাব আমার কাছে একই সঙ্গে বিজয় ও সতর্কবার্তা। বিজয় এই অর্থে যে, জনগণ একটি ফ্যাসিস্ট শাসককে পরাজিত করেছে; ভয় ভেঙেছে; ভোট ও মতপ্রকাশের জায়গা খুলেছে এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের কর্তা হিসেবে হাজির করেছে। সতর্কবার্তা এই যে, গণঅভ্যুত্থানকে যদি শুধু সরকার বদল, নির্বাচন এবং এক দলের কাছ থেকে আরেক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনায় নামিয়ে আনা হয়, তাহলে পুরোনো রাষ্ট্র নতুন মুখ বা মুখোশ পরে আবার ফিরে আসবে। আমাদের অর্জন হলো, আমরা ইতিহাসের দরজা খুলেছি। আমাদের ব্যর্থতা হলো, আমরা এখনও সেই দরজা দিয়ে নতুন রাষ্ট্র ও নতুন সমাজে প্রবেশ করতে পারিনি।
- বিষয় :
- ইফতেখারুল ইসলাম