ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির প্রভাব কমবে কীভাবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির প্রভাব কমবে কীভাবে
×

মো. মাসুদ পারভেজ রানা

মো. মাসুদ পারভেজ রানা

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক, যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। দেশে নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ সম্প্রসারণের ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, গবেষণার মান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং সুশাসনের প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোর সামগ্রিক কার্যকারিতা ও গুণগত মান নিয়ে সমালোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অবদান ইতিহাসের অংশ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনীতির সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়; হওয়াও অসম্ভব। আবার শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পছন্দের অধিকারকেও অগ্রাহ্য করা যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা বা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। 

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক সংগঠন এবং ছাত্র সংগঠন দলীয় ক্ষমতার কাঠামোয় যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনস্বীকার্য, দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান। প্রশাসনিক নেতৃত্ব নির্বাচন, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্প, এমনকি একাডেমিক কার্যক্রমও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিবেচিত; যদিও কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যগুলো আইনগত দিক থেকে স্বায়ত্তশাসিত নয়। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা প্রশাসনিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে। ফলস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়ই জ্ঞান চর্চাকেন্দ্রের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি জনগণের আস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার মান প্রভাবিত করে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

যা হোক, উচ্চশিক্ষায় দলীয় রাজনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন ও আস্থার সংকট। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ এখন রাজনৈতিক আনুগত্যে নির্ধারিত হয়। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রতিনিধি হিসেবে উপাচার্যের প্রধান দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং অংশীজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ উপাচার্যের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে। এই অবিশ্বাস ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল করে। বিগত কয়েকটি সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা যথেষ্ট যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছে নয়; নিজ দলীয় মতাদর্শের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছেও হেনস্তার শিকার হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপি সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পরিকল্পনাতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকট সুরাহার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না; পুরাতন ধারাই চলমান। তাই উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগে ‘বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ বাস্তবায়ন অথবা অধিক গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি। সিনেট, শিক্ষক প্রতিনিধি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাহলে নিশ্চিতভাবেই উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার প্রতিনিধি হিসেবেই বিবেচিত হবেন। এর ফলে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব থেকেও বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তি পাবে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় গুরুতর সমস্যা হলো, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক এজেন্টে পরিণত হওয়া। ছাত্র রাজনীতি গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। আবার মূল একাডেমিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতও করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রভাব, পরিচিতি বা ভবিষ্যৎ সুবিধা অর্জনের সুযোগ খুঁজতে থাকে। ক্লাস, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় ব্যয় করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবিত হতে পারে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতের সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থানের পরিবর্তে দখল ও আধিপত্য, এমনকি সহিংসতা দেখা যায়। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন বা উত্তেজনাও ক্যাম্পাসে প্রতিফলিত হয়। 

রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস বন্ধ, পরীক্ষা স্থগিত, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং সেশনজট সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সময়মতো ডিগ্রি সম্পন্ন করার সক্ষমতা। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেশনজট শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক অর্থনীতি এবং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগভেদে পৃথক একাডেমিক সময়সূচি অনুসরণ করা হয়। ফলে পরীক্ষা, ফল প্রকাশ এবং সেমিস্টার পরিচালনায় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। সমন্বিত কেন্দ্রীয় সেমিস্টার ব্যবস্থা চালু করা হলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে প্রশাসন, শিক্ষক প্রতিনিধি এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস, পরীক্ষা এবং ফলাফল সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রমে অধিক মনোযোগী হবে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুযোগও সীমিত হবে। 

বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা না গেলেও যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো চলমান, তাতে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এর অর্থ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে নীতিভিত্তিক, একাডেমিক এবং কল্যাণমুখী অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা। শিক্ষক সংগঠনকে গবেষণা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পেশাগত উন্নয়নকেন্দ্রিক ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করা। ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমও শিক্ষার্থীদের অধিকার, কল্যাণ এবং একাডেমিক উন্নয়নে কেন্দ্রীভূত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য শুধু ক্ষমতাসীন দল নয়; বিরোধী দলগুলোরও সদিচ্ছা প্রয়োজন।

ড. মো. মাসুদ পারভেজ রানা: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

আরও পড়ুন

×