ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

সন্তানের টিফিন বক্স কি কেবল ক্ষুধা নিবারণই করে 

সন্তানের টিফিন বক্স কি কেবল ক্ষুধা নিবারণই করে 
×

অস্বাস্থ্যকর টিফিন প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়তে পারে

মুকুল হোসেন

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:২১

প্রাণীদেহে খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা দেহ ও মন উভয়ই গড়ে উঠতে সাহায্য করে। সন্তানের জন্য একটি টিফিন কি শুধু পেট ভরায়, নাকি সন্তানের ভবিষ্যৎ খাদ্যাভ্যাস, শেখার ক্ষমতা ও সুস্বাস্থ্যের ভিত্তিও গড়ে দেয়? এই প্রশ্ন কোনো অর্থে নিরীহ নয়, যদিও আমরা অতটা গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখি না। 
সকাল সাড়ে ৭টা। স্কুলে যাওয়ার তাড়া। এক হাতে সন্তানের ইউনিফর্ম, অন্য হাতে টিফিন বক্স। তাড়াহুড়ার মধ্যেই বক্সে ঢুকে যায় একটি চিপসের প্যাকেট, একটি কেক আর একটি মিষ্টি পানীয়। কাজ শেষ। কিন্তু সত্যিই কি কাজ শেষ? নাকি অজান্তেই আমরা প্রতিদিন সন্তানের টিফিন বক্সে ভবিষ্যতের অসুস্থতার বীজও তুলে দিচ্ছি? আমরা কি কখনও ভেবে দেখি এই টিফিন শুধু আজকের ক্ষুধা মেটাচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের অসুস্থতার বীজও বপন করছে?
পরিসংখ্যান যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে
বাংলাদেশে শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ শুধু বিশেষজ্ঞদের নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের চাইল্ড ফুড পোভার্টি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিন শিশুর মধ্যে দুজন (প্রায় ৬৫ শতাংশ) ন্যূনতম পাঁচটি খাদ্যগোষ্ঠী থেকে খাবার পায় না। অর্থাৎ তাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য নেই। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতি পাঁচ শিশুর একজন মাত্র এক বা দুই ধরনের খাদ্যের ওপর নির্ভর করে বেড়ে উঠছে।
ইউনিসেফের বাংলাদেশবিষয়ক সর্বশেষ তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, দেশে এখনও ২৪ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির, ১২.৯ শতাংশ ক্ষীণকায় এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি মানেই শুধু খাবারের অভাব নয়; অস্বাস্থ্যকর ও একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাসও এর একটি বড় কারণ।
অন্যদিকে সমস্যা এখন শুধু অপুষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিশু ও কিশোরদের খাদ্যাভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের চাইল্ড নিউট্রিশন রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ার স্কুল পরিবেশ নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তাদের স্কুলের আশপাশে প্যাকেটজাত স্ন্যাকস সহজেই পাওয়া যায়। ৫৫ শতাংশ বলেছে, ফাস্ট ফুড এবং ৫৫ শতাংশ বলেছে, চিনিযুক্ত পানীয় সহজলভ্য। বিপরীতে মাত্র ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা স্কুলের আশপাশে সহজে তাজা ফল বা সবজি পায়। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের কাছে স্বাস্থ্যকর খাবারের চেয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবারই বেশি সহজলভ্য।
ইউনিসেফের মতে, জীবনের শুরুর বছরগুলোয় বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাদ্য শিশুর সুস্বাস্থ্য, বেড়ে ওঠা, শেখার সক্ষমতা এবং সার্বিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি টিফিন বক্সে কী থাকছে, সেটি কেবল একটি খাবারের প্রশ্ন নয়– এটি একটি শিশুর ভবিষ্যতেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের পুষ্টি-চিত্রে এখন এক নতুন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে এখনও অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যদিকে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হারও বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘দ্বৈত পুষ্টি-সমস্যা’ (ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন) বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ একই দেশে, এমনকি একই পরিবারেও অপুষ্টি ও অতিপুষ্ট দুই সমস্যাই একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। এর অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার।
টিফিনের কাজ কি কেবল ক্ষুধা নিবারণ?
একজন শিশু দিনে প্রায় ৬-৮ আট ঘণ্টা স্কুলে কাটায়। এই সময়ে তার মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি এবং শারীরিক সক্রিয়তার জন্য সঠিক পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খায়, তাদের মনোযোগ বেশি থাকে, শেখার দক্ষতা উন্নত হয় এবং ক্লাসে অংশগ্রহণও বাড়ে। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চমাত্রার প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে আবার দ্রুত কমে যায়। ফলে শিশু কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত, বিরক্ত বা অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের টিফিনে অনেক শিশুই চিপস, বিস্কুট, কেক, চকলেট, কোমল পানীয় কিংবা অন্যান্য অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খায়। আবার অনেক স্কুলের ক্যান্টিনেও স্থানীয় ভাজাপোড়া, ফাস্ট ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয় সহজেই পাওয়া যায় অথচ তাজা ফলের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলের সামনে কিংবা আশপাশে সহজেই পাওয়া যায় আলুর চিপস, চানাচুর, কেক, বিস্কুট, চকলেট, ক্যান্ডি, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস বা ফ্লেভারড ড্রিংক। এসব খাবারে সাধারণত চিনি, লবণ এবং চর্বির পরিমাণ বেশি কিন্তু ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশের পরিমাণ খুবই কম। ফলে শিশুর পেট ভরলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না।
স্কুল ক্যান্টিনে কী বিক্রি হবে নীতিমালার সময় কি এসে গেছে?
বাংলাদেশে এখনও সব স্কুলের জন্য বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন জাতীয় স্কুল ক্যান্টিন পুষ্টি নীতিমালা কার্যকর হয়নি। ফলে অনেক স্কুলের ক্যান্টিন বা আশপাশের দোকানে চিপস, কোমল পানীয়, চকলেট, কেক, ক্যান্ডি ও অন্যান্য অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারই শিশুদের কাছে সবচেয়ে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। অথচ শিশুরা দিনের একটি বড় অংশ স্কুলে কাটায়; তাই তাদের খাদ্যাভ্যাস গঠনে স্কুলের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কৈশোরকালীন পুষ্টি উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে, যেখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পুষ্টি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুষ্টি শিক্ষা নয়– স্কুল ক্যান্টিনে কী বিক্রি হবে, কী বিক্রি হবে না এবং স্কুলের আশপাশে শিশুদের জন্য অস্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রকাশিত নির্দেশিকাগুলোয় সুপারিশ করেছে, স্কুলে বিক্রি ও প্রচারিত খাবার যেন স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একইসঙ্গে চিনি, লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারের পরিবর্তে ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশেও যদি স্কুল ক্যান্টিনের জন্য স্পষ্ট পুষ্টিমানের মানদণ্ড, স্বাস্থ্যকর মেনুর নির্দেশিকা এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ চালু করা যায়, তাহলে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস উন্নয়ন, স্থূলতা প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতের অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক– সব জায়গায় শিশুদের লক্ষ্য করে রঙিন বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। প্রিয় কার্টুন চরিত্র, খেলনা বা আকর্ষণীয় প্যাকেট অনেক সময় খাবারের গুণগত মানের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। শিশুরা বিজ্ঞাপন দেখে খাবার চায়, আর মা-বাবাও অনেক সময় সন্তানের আবদার মেটাতে সেটিই কিনে দেন। এভাবে অজান্তেই একটি অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয়। বাজারে অনেক খাবারের মোড়কে লেখা থাকে হাই ক্যালসিয়াম, মাল্টি গ্রেইন, ভিটামিন এডেড, এনার্জি ফুড ইত্যাদি। এসব লেখা দেখে অনেকেই মনে করেন খাবারটি স্বাস্থ্যকর। কিন্তু পুষ্টিগুণ বোঝার জন্য শুধু সামনের লেখা নয়, পেছনের পুষ্টি তথ্যও দেখা জরুরি। অনেক তথাকথিত স্বাস্থ্যকর খাবারেও চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশ বেশি থাকতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর টিফিন প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, উচ্চ রক্তচাপ, দাঁতের ক্ষয়, অপুষ্টি, ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি। এসব রোগ একদিনে হয় না। ছোট ছোট দৈনন্দিন অভ্যাসই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে।
তাহলে টিফিনে কী দেব?
স্বাস্থ্যকর টিফিন মানেই ব্যয়বহুল খাবার নয়। খুব সহজেই টিফিনে রাখা যেতে পারে মৌসুমি ফল, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, আপেল, কমলা, শসা ও গাজরের টুকরা, সেদ্ধ ডিম, ভাজা ছোলা, চিনাবাদাম (যদি অ্যালার্জি না থাকে), ঘরে তৈরি সবজি বা ডিমের স্যান্ডউইচ, রুটি ও সবজি। সঙ্গে একটি পানির বোতল থাকলে কোমল পানীয়ের প্রয়োজনই পড়ে না।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে শুধু পরিবার যথেষ্ট নয়। স্কুলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন– স্কুল ক্যান্টিনে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিসমৃদ্ধ খাবার সীমিত করা, পুষ্টি শিক্ষা, ফল দিবস বা স্বাস্থ্যকর টিফিন দিবস পালন। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে স্কুলে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
শৈশবে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাস অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত বজায় থাকে। তাই ছোটবেলায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ভবিষ্যতের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। শিশুরা নিজেরা টিফিন বেছে নেয় না; বড়রা তাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেন। আজ টিফিন বক্সে একটি ফল যোগ করা, একটি কোমল পানীয় বাদ দেওয়া কিংবা সপ্তাহে কয়েক দিন ঘরে তৈরি খাবার দেওয়ার মতো ছোট সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ড. মুকুল হোসেন: পুষ্টিবিজ্ঞানী ও গবেষক, সুইডিশ ফুড এজেন্সি, সুইডেন 
[email protected]

আরও পড়ুন

×