অন্যদৃষ্টি
এই তরুণরা কতটা তরুণ
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
লেখাটি শুরুর আগেই ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদের মধ্যকার সংঘর্ষের খবর চোখে পড়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যকার এই দৃশ্য পরিচিত হলেও গণঅভ্যুত্থানের পর মোটেও কাম্য ছিল না! তারুণ্যের কী অদ্ভুত পরাজয়! যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের জন্য এই দৃশ্য কষ্টের।
তরুণদের ব্যাপারে আমাদের অনেকেই অতিশয় আশাবাদী। আমিও তাদের একজন। যখন চোখ বন্ধ করে ভাবি, তরুণরা এই দেশ ও জাতির প্রতি কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?
মোটামুটি ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী যে কোনো ব্যক্তিকে আমরা তরুণ বলে ভাবতে পারি। এখানে বয়সটা গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রশক্তি তথা ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীর অধিকাংশই এই বয়সের।
দুনিয়ার যে কোনো আন্দোলনের মূল শক্তি হলো এই তরুণ সমাজ। এ দেশের ইতিহাসও তা-ই বলে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির একটা গোড়ার সমস্যা কোনোভাবে উতরে যাওয়া যাচ্ছে না। সেটি হলো সহিংসতা। যদিও তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্র নিয়ে একটি কমন রাজনৈতিক বোঝাপড়া গড়ে উঠতে পারত।
অনেকে বলবেন, এই বোঝাপড়াটা প্র্যাকটিক্যাল দিক থেকে অবাস্তব। তবে তাদের এই মতামতের পাল্টা যুক্তি এই সমাজেই বেশ পাকাপোক্তভাবে রয়েছে। যেমন– গণঅভ্যুত্থানে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ব্যানারে সবাই সমবেত ছিল, তখন তাদের প্রধান দাবি ছিল রাষ্ট্র মেরামত করা। আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল চাকরিকে কেন্দ্র করে, কিন্তু তা সরকার পতন পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাহলে একটা আন্দোলন যদি সাধারণ শিক্ষার্থীসহ নানা রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও বলয় একই কাতারে শামিল করতে পারে, তাহলে তরুণ সমাজ কেন কমন কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক বলয় হিসেবে এগোতে পারবে না?
গণঅভ্যুত্থানে যে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীরা একসঙ্গে আন্দোলনে শামিল ছিল; সেই তারাই কোন স্বার্থে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে? তারা কি এতই বোকা যে, তাদের বয়োবৃদ্ধ নেতারা ভুল বুঝিয়ে তরুণ-তরুণ মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন? নাকি তারাই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত কিছু স্বার্থের কারণে হামলা ও দাঙ্গার পথ বেছে নিয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর তরুণদেরই দিতে হবে।
লেখার উদ্দেশ্য এই নয়, কেবল তরুণদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। দেশের রাজনীতিতে প্রবীণ রাজনীতিবিদরা কিংবা মূল রাজনৈতিক দল ছাত্র ও তরুণদের ব্যবহার করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছেন– এই ইতিহাস দীর্ঘ। এত লম্বা ইতিহাস থাকার পরও কেন তরুণরা নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও সংঘর্ষ বাধিয়ে রাখে? তারা নিজেরাই বিশেষ কোনো রাষ্ট্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কি আন্দোলন-সংগ্রামে অটল থাকতে পারে না? পারছে না–সেটাই দেখছি। কী অদ্ভুত ব্যাপার! যে তরুণ প্রতিনিধি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, তারাই এখন ক্ষমতায় গিয়ে সহযোদ্ধাদের দিকে কামান দাগিয়েছে! তরুণ প্রজন্মের দিক থেকে এর চেয়ে প্রতারণা ও ব্যর্থতা আর কী হতে পারে!
হবিগঞ্জে ছাত্রদলের হামলায় এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির নেতা আলিফের এক চোখ নষ্ট হয়েছে; ছেলেটি কেবল ১৮ ছুঁই ছুঁই। জীবন শুরু হওয়ার আগেই অর্ধেক শেষ! আবার চলতি সপ্তাহের সোম ও মঙ্গলবার অন্তত তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পরস্পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণ হয়– গণঅভ্যুত্থান ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্বার্থের কবলে পড়ে চুরি হয়ে গেছে।
দেশের রাজনীতির ওপেন সিক্রেট হলো– কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। অর্থাৎ তরুণদের বিভিন্ন পক্ষকে নিজেদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। একসঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা তারই ইঙ্গিতবহ। এখানে কি ওপরমহল থেকে কোনো গ্রিন সিগন্যাল ছিল? তাহলে কী দাঁড়ায়? আবারও সহিংসতার রাজনীতির সূচনা হলো। এই দায় যতটা মুরব্বিদের, ততটা এই তরুণদের!
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- ইফতেখারুল ইসলাম