উচ্চশিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার ধারা আলাদা হোক
শেখ নাহিদ নিয়াজী
শেখ নাহিদ নিয়াজী
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা খাতের বরাদ্দ নিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ইনস্টিটিউটগুলোতে কাজ না করেই গবেষণা-ভাতা তোলার মতো নানা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশেষ করে গবেষণার নামে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশি গবেষকদের তিন শতাধিক গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়ার খবর উচ্চশিক্ষার দৈন্যদশা ও কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে। এই সংকট কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের নয় বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গলদ। বর্তমান ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে দক্ষ শিক্ষক এবং বিশ্বমানের গবেষক হওয়ার জন্য বাধ্য করা হয়। এই দ্বিমুখী চাপের ফলেই গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি এবং ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘টিচিং ট্র্যাক’ (পাঠদান) এবং ‘রিসার্চ ট্র্যাক’ (গবেষণা) সম্পূর্ণ আলাদা করা।
আমাদের প্রচলিত উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে ক্লাসরুমে যেমন বিপুল পরিমাণ সময় দিতে হয়, তেমনি পদোন্নতির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে গবেষণা প্রবন্ধ বা পেপার প্রকাশ করতে হয়। ফলে যারা মূলত ভালো পড়াতে পারেন কিন্তু গবেষণায় আগ্রহী নন, তারা পদোন্নতির তাগিদে মানহীন বা চৌর্যবৃত্তির (নকল গবেষণা) আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্যদিকে, যারা খাঁটি গবেষক, তারা ক্লাসের অতিরিক্ত চাপে গবেষণাগারে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। ১৯ শতকের বিখ্যাত জার্মান শিক্ষাবিদ ভিলহেল্ম ফন হামবোল্ডটের ‘হামবোল্ডটিয়ান মডেল অব হায়ার এডুকেশন’ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান এবং গবেষণা সমান্তরালে চলা উচিত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর জটিল ও সুবিশাল জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে একজন মানুষের ওপর একই সঙ্গে দুটি বিপরীতমুখী বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া মূলত এই ঐতিহাসিক আদর্শের অপপ্রয়োগ। সময়ের দাবি মেনে উন্নত বিশ্ব এখন এই তত্ত্বের আধুনিকায়ন ঘটিয়ে পাঠদান ও গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আলাদা করেছে।
এই দুটি ট্র্যাক আলাদা করা হলে পাঠদান ও গবেষণার গুণগত মান রাতারাতি বৃদ্ধি পাবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জঁ টাইরলের ‘কাজের বিশেষীকরণ তত্ত্ব’ (থিওরি অব স্পেশালাইজেশন) স্পষ্ট করে– যে কোনো সংস্থায় শ্রমের সঠিক বিভাজন এবং কাজের বিশেষীকরণ উৎপাদনশীলতা ও কাজের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিচিং ও রিসার্চ ট্র্যাক আলাদা করা হলে শিক্ষাদান ও জ্ঞান সৃষ্টি– দুই খাতেই শিক্ষকদের বিশেষ দক্ষতা তৈরি হবে। টিচিং ট্র্যাকে থাকা শিক্ষকরা তাদের পুরো সময় ব্যয় করবেন পাঠদান পদ্ধতি আধুনিকীকরণ, সিলেবাস উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সরাসরি দিকনির্দেশনা দেওয়ার পেছনে। এতে ক্লাসরুমের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় হবে এবং শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।
অন্যদিকে, রিসার্চ ট্র্যাকে যারা থাকবেন, তারা প্রশাসনিক বা অতিরিক্ত ক্লাসের বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ সময় ল্যাবরেটরি বা মাঠ পর্যায়ের মৌলিক গবেষণায় অধিক সময় দিতে পারবেন। এতে পিয়ার-রিভিউড জার্নালে মানসম্পন্ন কাজ বা পেপার প্রকাশিত হবে। এভাবে দুদকের তদন্তে আসা গবেষণা জালিয়াতির কলঙ্ক থেকে দেশের উচ্চশিক্ষা রক্ষা পাবে।
যখন টিচিং ও রিসার্চ ট্র্যাক আলাদা হবে, তখন মূল্যায়নের পদ্ধতিও হবে স্বতন্ত্র। টিচিং ট্র্যাকের শিক্ষকদের পদোন্নতি হবে তাদের লেকচারের মান, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বা স্টুডেন্ট ফিডব্যাক এবং শিক্ষাদানের উদ্ভাবনী কৌশলের ওপর ভিত্তি করে। অপরদিকে, রিসার্চ ট্র্যাকের শিক্ষকরা মূল্যায়িত হবেন তাদের গবেষণার সামাজিক প্রভাব, পেটেন্ট লাভ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং গবেষণা তহবিল বা এক্সটার্নাল গ্র্যান্ট আনার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে। ফলে শিক্ষকরা তাদের নিজস্ব পছন্দ ও মেধার ক্ষেত্র বেছে নিতে পারবেন, যা তাদের পেশাগত সন্তুষ্টি বাড়াবে এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (যেমন এমআইটি, হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ড) বহু আগেই এই দুই ট্র্যাকের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরি করেছে। সেখানে ‘লেকচারার’ বা ‘টিচিং প্রফেসর’ পদের শিক্ষকরা মূলত পাঠদানে অবদান রাখেন, আর ‘রিসার্চ প্রফেসর’ বা ‘গবেষক’রা শুধুই নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে মগ্ন থাকেন। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো মানসম্পন্ন গবেষণার অভাব। শিক্ষকরা যদি ক্লাসের চাপে ক্লান্ত থাকেন, তবে তারা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করবেন কীভাবে? ট্র্যাক আলাদা করা হলে শিক্ষকরা গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সময় পাবেন, যা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক অবস্থানকে উন্নত করতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। এতে বড় সুফল পাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা। ‘টিচিং ট্র্যাক’ চালু হলে শিক্ষার্থীরা দেশের সেরা মেন্টরদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে যারা ‘রিসার্চ’ ট্র্যাকে থাকবেন, তারা তাদের গবেষণাগারে শিক্ষার্থীদের ‘রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে যুক্ত করতে পারবেন। এতে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে। উচ্চশিক্ষা খাত এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু ডিগ্রি বা সনদ বিতরণ করা নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা।
শেখ নাহিদ নিয়াজী: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected]
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা
- বিশ্ববিদ্যালয়
- শিক্ষা