নেপালে বিপর্যয়
হিমালয়ের ডেব্রি ফ্লো এবং আগামীর জলবায়ু ঝুঁকি
মো. খালেকুজ্জামান
মো. খালেকুজ্জামান
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেপালের উত্তর সীমান্তে হিমবাহধস এবং পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের ঘটনাপ্রবাহ পরিবেশবিদ, ভূতত্ত্ববিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন এক গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রথম নজরে আকস্মিক স্থানীয় বন্যা বা ভূমিধস মনে হলেও, বস্তুত এটি কোনো একক সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। বরং এটি একাধিক জটিল ভূতাত্ত্বিক, আবহাওয়াগত ও পরিবেশ প্রক্রিয়ার এক ভয়াবহ ও পর্যায়ক্রমিক সমষ্টিগত প্রতিক্রিয়া।
ঘটনাটির সূচনা হয়েছে নেপাল ও চীনের সীমান্তঘেঁষা অত্যন্ত দুর্গম ও খাড়া পার্বত্য অঞ্চলে। তবে কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় হিমবাহেই এ ধরনের ঝুঁকি সীমাবদ্ধ নয়; বরং পূর্বের কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট অঞ্চল থেকে শুরু করে অন্নপূর্ণা পর্বতমালা হয়ে রসুওয়া গাদী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত হিমবাহেই এমন কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে। পর্বতবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এসব হিমবাহ দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি শিকার। এসব অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠের নিচে বহু হাজার বছর ধরে জমাটবদ্ধ মাটি ও পাথরের স্তর, যাকে ভূতত্ত্বের ভাষায় ‘পারমাফ্রস্ট’ বলা হয়, তা ক্রমাগত তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ভেতরে ভেতরে গলতে শুরু করেছে।
পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার ফলে যে অতিরিক্ত জলীয় উপাদান তৈরি হয়, তা পর্বতগাত্র ও হিমবাহের সংযোগস্থলে এক ধরনের পিচ্ছিল ও অসমান স্তরের সৃষ্টি করে। এর ফলে কোটি কোটি টন বরফ ও পাথরের বিশাল কাঠামোর মূল ভিত আলগা হয়ে যায়। এই ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার পরিণতিতেই এক দিন প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে এক বিশাল বরফখণ্ড ও পর্বতগাত্রের সুবিশাল পাথরের দেয়াল খাড়াভাবে নিচে ধসে পড়ে। প্রায় এক হাজার ২০০ মিটার নিচে অবস্থিত এক সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকায় এই বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ আছড়ে পড়ে। উচ্চতার কারণে এবং মহাকর্ষীয় বেগের প্রভাবে হাজার হাজার টন বরফ ও পাথরের এই আকস্মিক পতনে সেখানে এক নজিরবিহীন যান্ত্রিক শক্তির অভিঘাত তৈরি হয়।
প্রচণ্ড শক্তির ধাক্কায় অতীতে অখণ্ড অবস্থায় থাকা বিশাল গ্লেসিয়ার বা হিমবাহের বরফখণ্ড মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছোট ছোট টুকরায় পরিণত হয়। এই চূর্ণবিচূর্ণ বরফ ও পাথরের বিশাল ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি উপত্যকার অত্যন্ত সরু খাদে জমা হয়ে সাময়িকভাবে এক ধরনের কৃত্রিম বাঁধের জন্ম দেয়। পাহাড়ি উপত্যকাগুলো এমনিতেই সংকীর্ণ ও গভীর হওয়ায় এই অস্থায়ী বরফ ও পাথরের স্তূপ নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে ফেলেছিল। তবে এই কৃত্রিম বাঁধটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব ছিল না। প্রচণ্ড আঘাতে ভাঙন ধরা বরফ চূর্ণগুলো দ্রুত গলতে শুরু করে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ তরল পানিতে পরিণত হয়। ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই কৃত্রিম বাঁধের পেছনের পানি ও তরল বরফের চাপ সহ্যসীমা অতিক্রম করে এবং তীব্র বিস্ফোরণের মতো বাঁধটি ধসে পড়ে।
কৃত্রিম বাঁধটি ধসে পড়ার পর উপত্যকার ভেতরে আটকা পড়ে থাকা কোটি কোটি ঘনমিটার পানি, তরলীকৃত বরফ, বিশাল বিশাল পাথরখণ্ড, বালি ও কাদার এক মিশ্রণ প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। ভূ-বিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যার পরিভাষায় বরফ, পাথর, মাটি ও পানির এই অতিঘন প্রলয়ঙ্করী মিশ্রণের দ্রুত প্রবাহকে বলা হয় ‘ডেব্রি ফ্লো’। এই ডেব্রি ফ্লো দেখতে অনেকটা আধুনিক ইমারত নির্মাণের সময় ব্যবহৃত ভেজা ও ঘন কংক্রিটের মিশ্রণের মতো কাজ করে। এটি সাধারণ পানির ঢল বা বন্যার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘন, ভারী ও ধ্বংসাত্মক শক্তি বহন করে।

এই ভয়াবহ ডেব্রি ফ্লো পাহাড়ি উপত্যকার খাড়া ড্রেনসদৃশ খাদ বেয়ে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব তীব্র বেগে অতিক্রম করে। উপত্যকাটি অত্যন্ত খাড়া হওয়ায় এর প্রবাহের গতিবেগ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। পথে পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী দুই প্রধান নদী– ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী এই উপত্যকায় এসে মিলিত হলে এতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত নদীর পানি যুক্ত হয়। নদীগুলোর পানি যুক্ত হওয়ার ফলে এই ডেব্রি ফ্লোর মোট আয়তন, ওজন ও গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়–যা পরে উপত্যকা পেরিয়ে নারায়ণী নদীর অববাহিকায় তুলনামূলক সমতল ও জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এসে সজোরে আঘাত হানে। সেখানে অবস্থিত সড়ক, সংযোগ সেতু, ঘরবাড়ি ও সরকারি-বেসরকারি নানা অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে এই বরফ-পাথরের কাদার স্রোতে ভেসে যায় বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
পর্বতীয় অঞ্চলে এমন প্রলয়ঙ্করী ডেব্রি ফ্লোর ঘটনা একদম নতুন কিছু নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের অভূতপূর্ব গতি এ ধরনের ঘটনাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন ও ভয়াবহ করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০ সালে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুতে আন্দিজ পর্বতমালায় ভূমিকম্পের ধাক্কায় একইভাবে বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ে এক প্রলয়ঙ্করী ডেব্রি ফ্লোর জন্ম দিয়েছিল। সেই ভয়াবহ ঘটনায় ২২ হাজারের বেশি মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালে ভেনেজুয়েলায় অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট ম্যাসিভ ডেব্রি ফ্লোতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ২০১৩ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ট্র্যাজেডিও ছিল মূলত ক্লাউড বার্স্ট ও গ্লেসিয়ার লেক আউটবার্স্ট থেকে সৃষ্ট এক ভয়াবহ ডেব্রি ফ্লো। ওই একক ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
নেপালের ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র পরিবেশ ব্যবস্থার জন্যই এক বিরাট ও গভীর সতর্কবার্তা। কিন্তু কাঠমান্ডু পোস্টসহ নেপালের স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, নেপালসহ হিমালয় অববাহিকার দেশগুলো দুর্যোগের ঝুঁকি পরিমাপ বা পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও সনাতন ও গাণিতিক গড়ের হিসাবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে থাকে। দেশগুলোর উচিত প্রথাগত মানসিকতা ত্যাগ করে হিমবাহ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করা। স্যাটেলাইট ডেটা, ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত পারমাফ্রস্টের মানচিত্রায়ণ, প্রতিটি প্রধান খাড়া নদী অববাহিকায় রিয়েল টাইম সেন্সর ও সতর্কীকরণ সংকেত স্থাপন এবং আঞ্চলিক ভৌগোলিক তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
ড. মো. খালেকুজ্জামান: যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক
- বিষয় :
- জলবায়ু পরিবর্তন