নগর পরিকল্পনা
ঢাকা কি শিশুবান্ধব শহর হতে পারবে
মো. মাসুদ পারভেজ রানা
মো. মাসুদ পারভেজ রানা
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক কিংবা নতুন সড়ক নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। শহরটি কতটা নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য উপযোগী, সেটি তার প্রকৃত বাসযোগ্যতার মাপকাঠি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকার বর্তমান অবস্থান উদ্বেগজনক। ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সাম্প্রতিক গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম এবং নিচে রয়েছে কেবল ত্রিপোলি ও দামেস্ক। কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকার চিত্র প্রায় অভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বাসযোগ্যতার সংকট কোনো সাময়িক বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা। একদিকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরগুলোর একটি হওয়ার পথে, অন্যদিকে বাসযোগ্যতার সূচকে বিশ্বের নিচের সারিতে অবস্থান করছে। এই দ্বৈত বাস্তবতায় প্রশ্ন– ঢাকা কি শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও অংশগ্রহণমূলক শহর হিসেবে গড়ে উঠছে?
ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক শিশু এখন শহরে বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু নগর এলাকায় বসবাস করতে পারে। ফলে শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে শিশুবান্ধব নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য নগরজীবনে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি রয়েছে দারিদ্র্য, বৈষম্য, দূষণ, যানবাহনজনিত দুর্ঘটনা, অপর্যাপ্ত খেলার মাঠ, নিরাপদ উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যা। একই শহরের মধ্যে আয়, লিঙ্গ, বয়স, প্রতিবন্ধিতা, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয় এবং বসবাসের এলাকার ভিত্তিতে শিশুদের অভিজ্ঞতা এক নয়।
ঢাকার বাস্তবতায় সমস্যাটি আরও গভীর। শিশু যদি স্কুলে যাওয়ার সময় ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারে; ব্যস্ত সড়ক পার হতে বাধ্য হয়; খেলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ না পায়; বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করে কিংবা নিরাপদভাবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা না পায়, তাহলে শহরটি তার জন্য কতটা ‘বাসযোগ্য’– সে প্রশ্ন করতেই হবে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউনিসেফের শিশুবান্ধব শহর উদ্যোগ সিএফসিআই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো দিতে পারে। ইউনিসেফ ও ইউএন হ্যাবিট্যাট ১৯৯৬ সালে এ উদ্যোগ চালু করে। এর মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহর ও সম্প্রদায়কে আরও নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শিশুকেন্দ্রিক করে তোলা। ইউনিসেফের ধারণা অনুযায়ী, শিশুবান্ধব শহরে শিশুরা শোষণ, সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষিত থাকবে; জীবনের শুরুতেই ভালো স্বাস্থ্য ও যত্ন পাওয়ার সুযোগ পাবে; মানসম্মত সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকার পাবে; মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাবে; নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে ও নিজেদের প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারবে; পরিবার, সংস্কৃতি, শহর ও সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ করতে পারবে; নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সবুজ স্থানে বসবাস করতে পারবে; বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, খেলাধুলা ও আনন্দ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাবে; এবং ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, আয়, লিঙ্গ বা সক্ষমতা নির্বিশেষে জীবনে সমান সুযোগ পাবে।
শিশুবান্ধব শহর মানে কয়েকটি পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি করা নয়। ইউনিসেফের কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, শিশুকেন্দ্রিক নীতি ও বাজেট, শিশুদের অংশগ্রহণ এবং চাইল্ড-রেসপনসিভ স্থানিক পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেয়। সে জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ‘চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আরবান প্ল্যানিং সেল’ গঠন করা যেতে পারে। এ সেলের কাজ হবে শিশুদের নগরজীবন নিয়ে গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ। প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য শিশুবান্ধব পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে স্কুল, খেলার মাঠ, পার্ক, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নিরাপদ হাঁটার পথ এবং গণপরিবহনের প্রবেশযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে। শিশু তার বাসা থেকে কত দূরে নিরাপদে হেঁটে স্কুল, খেলার মাঠ বা পার্কে যেতে পারে– এটিও নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার বর্তমান উদ্যোগকে শিশুদের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানকে উন্নয়ন প্রকল্পের ‘অতিরিক্ত’ অংশ হিসেবে নয়, বরং মৌলিক নগর অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি শিশুর বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ খেলার জায়গা আছে কিনা, তা নগর পরিকল্পনার বাধ্যতামূলক সূচক হওয়া উচিত।
ঢাকার শিশুবান্ধব নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব। বিশ্বব্যাপী শিশুবান্ধব নগর পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারকে এ বিষয়ে সমন্বিত গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশেষ গবেষণা অনুদান চালু করতে পারে। গবেষণায় শিশুদের শুধু ‘গবেষণার বিষয়’ হিসেবে নয়, বরং গবেষণার অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তারা কোথায় নিরাপদ বোধ করে, কোথায় ভয় পায়, কোথায় খেলতে চায় এবং কী ধরনের শহর চায়– এসব প্রশ্নের উত্তর নগর পরিকল্পনার মূল্যবান তথ্য হতে পারে।
ঢাকার সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। একদিকে শহরটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগরীতে পরিণত হওয়ার পথে; অন্যদিকে বাসযোগ্যতার আন্তর্জাতিক সূচকে তার অবস্থান তলানিতে। এ দুই বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে হলে শুধু বড় অবকাঠামো নয়; মানুষকেন্দ্রিক এবং শিশুকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যদি এ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কিছুটা হলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে, সেটা হবে বড় সাফল্য। যে পরিকল্পনা হবে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য ঢাকার পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।
মো. মাসুদ পারভেজ রানা: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]