ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সহজিয়া

আধিপত্যবাদী চক্রান্তের বিপরীতে আত্মজাগরণের ডাক

আধিপত্যবাদী চক্রান্তের বিপরীতে আত্মজাগরণের ডাক
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৩ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আমরা এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। একাধারে পশ্চিমা ভোগবাদী সভ্যতার চাকচিক্য আমাদের নব্য-আমেরিকানাইজেশনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করছে; অন্যদিকে পেট্রোডলারের আশ্রয়ে আসা ওহাবি-সালাফি মতাদর্শের শুষ্ক কাঠামোর নিচে পিষে ফেলতে চাওয়া হচ্ছে আমাদের শতবর্ষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লোকজ ঐতিহ্য এবং সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতির স্পন্দন। ইতিহাসের সমকালীন বাঁকে দাঁড়িয়ে সচেতন তরুণ সমাজকে বিশ্বরাজনীতি ও নব্য সাম্রাজ্যবাদের সূক্ষ্ম অথচ নিঃশব্দ আগ্রাসনকে চিহ্নিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে সমাজ-মানসে অবচেতনে রোপণ করা হয়েছে এক চরম দাসত্বমূলক বয়ান; পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা আরও ভেঙে বললে মার্কিন পরাশক্তিই হবে আমাদের রাজনৈতিক মুক্তির একমাত্র ত্রাণকর্তা– এই ধারণা কেবল এক ঐতিহাসিক মিথ্যা নয়। এটি মূলত সেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ফসল, যা তরুণদের স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাসকে ধীরে ধীরে পঙ্গু করে দিয়েছে।

​বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস ও বিশ্বব্যবস্থার নির্মোহ বিশ্লেষণ শেখায়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মূল চালিকাশক্তি কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা মানবাধিকার রক্ষা ছিল না; বরং তা সর্বদাই ছিল ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তার এবং সম্পদের নিরঙ্কুশ দখলদারিত্ব। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিফলিত হয় মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সমীকরণে। যুক্তরাষ্ট্র স্বচ্ছন্দে হাত মেলায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো চরম রাজতান্ত্রিক, কঠোর সামাজিক বিন্যাসভিত্তিক ও অতি পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের এই ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখে। 
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভোগবাদী রাজতন্ত্রের মধ্যকার অশুভ আঁতাতের কারণেই যে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর দশকের পর দশক ধরে ভূমি, রক্ত ও প্রাণ হারাচ্ছে, সেটা আজ কারও বুঝতে বাকি নেই। আমরা দেখছি, একদিকে ইসরায়েল যখন যেভাবে খুশি ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালাচ্ছে; অবর্ণনীয় মানবীয় বিপর্যয়ের দিকে ফিলিস্তিনকে ঠেলে দিচ্ছে; অন্যদিকে আরববিশ্বের প্রাচুর্যশালী শাসকগোষ্ঠী নির্লজ্জ নীরবতা বজায় রেখেছে।

বস্তুত মধ্যপ্রাচ্যের অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে; তাদের কর্তৃত্ব ও নীরবতা জায়েজ করতেও কম চেষ্টা নেই। এ জন্য বিশ্বজুড়ে যে সংকীর্ণ ও বিকৃত ধর্মীয় ভাবধারা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তা কোনো কাকতালীয় প্রক্রিয়া নয়। এই মতাদর্শিক তোষণ মূলত মার্কিন নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মোক্ষম হাতিয়ার। এটা একদিকে সাধারণ নাগরিককে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থেকে বিচ্যুত করে রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ ও নিষ্ক্রিয় করে রাখে, অন্যদিকে সময়-সুযোগ বুঝে সামরিক কিংবা আর্থিক সহায়তা দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে ব্যবহৃত হয়। এই সাজানো সংঘাত পরে মার্কিন হস্তক্ষেপ, সামরিক উপস্থিতি এবং সম্পদ লুণ্ঠনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে, যার মূল মুখরোচক শিরোনাম দেওয়া হয় তাদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’।
কয়েক দশক ধরে এই ছক মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি আমাদের বাংলাদেশও এর বাইরে থাকতে পারেনি। আগে বিভিন্ন সময়ে তো বটেই, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরও আমরা নতুন করে সেই পুরোনো খেলা দেখতে পেয়েছি। 

এটা ঠিক, শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের প্রতি নতজানু। সেই শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যে কারণে আমাদের প্রতিবেশী দেশটির সমর্থনে ঘাটতি ছিল না। অভ্যন্তরীণভাবেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন দমনপীড়ন চালিয়েছে। কিন্তু এসব অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে এই দেশের তরুণ প্রজন্মই প্রদীপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সেই সংগ্রাম ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির অঘোষিত শর্ত এটি হতে পারে না– আমরা বাংলাদেশকে কোনো নব্য সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির থাবায় সঁপে দেব কিংবা কোনো অন্ধকারাচ্ছন্ন উগ্রবাদী ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেব।

আমরা দেখেছি, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে গঠিত অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে পশ্চিমা রাজনৈতিক মহল ও প্রভাবশালীদের গভীর সম্পর্ক ছিল। ওই সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠতা জনমনে যে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য, এমনকি হস্তক্ষেপের শঙ্কা তৈরি করেছিল, তা মোটেও অযৌক্তিক ছিল না। গণরায়ের মাধ্যমে নতুন নির্বাচিত সরকার আসার পর রাজনৈতিক চিন্তার ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু এই স্পর্শকাতর সময়ে দেশীয় বিভাজনে জড়ানো বা একে অপরকে খলনায়ক বানানো কেবল বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কৌশলগত সুযোগকেই ত্বরান্বিত করবে।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের তল্পিবাহকদের বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, কেবল মাজার-দরগা নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোও ভাঙচুর করা হলো। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়া বা বিকৃত করার অপচেষ্টা এখনও চলছে। এসব প্রবল বা প্রচ্ছন্ন, যে কোনো চক্রান্তকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নস্যাৎ করা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

ভুলে যাওয়া চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের মহান স্মৃতিকে মুছে ফেলা কেবল পাকিস্তানের গণহত্যাকেই আড়াল করার ব্যাপার নয়; বরং ১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে গণহত্যার পক্ষে দাঁড়ানো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নৈতিক পরাজয়কেও স্মৃতির আড়াল করে দেওয়ার অপচেষ্টা।

​তাই তরুণ প্রজন্মের কবি, চিন্তক ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি সুস্পষ্ট আহ্বান– ইতিহাসের সত্যকে পুনর্পাঠ করুন এবং নিজস্ব প্রজ্ঞার আলোয় দীপ্ত হোন। প্রয়োজনে প্রচলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করুন, যেন কোনো কৃত্রিম মতাদর্শ আমাদের আত্মার স্বাধীনতাকে হরণ করতে না পারে। কোনো আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী বা বিদেশ-ঘেঁষা চরমপন্থি গোষ্ঠী যেন আমাদের দেশকে নিজেদের কৌশলগত দাবা খেলার ছক বানাতে না পারে। আমাদের একমাত্র ধ্রুবতারা– বাংলাদেশের অখণ্ড সার্বভৌমত্ব ও স্বনির্ভর স্বাধীনতা।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×