স্থানীয় সরকার নির্বাচন
সরকারের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের ত্বরিত পিঠটান
সরকার কিছুই জানে না– বললেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণের একক এখতিয়ার কমিশনের নেই– সরকারের এই ভাষ্যের পর পিঠটান দিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। যদিও দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে গত সোমবার জানিয়েছিল, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে হবে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোট।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষণার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ইউপি নির্বাচনের দিনক্ষণ বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। এর পরপরই ইসি বলে, সোমবার যে তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা প্রাথমিক। আগামী বৃহস্পতিবার ইসি আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। যদিও দুই মাস আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তথ্য নিয়ে ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বলেন, সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এর বাইরে আইনে প্রদত্ত অন্যান্য নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্বও পালন করার কথা বলা আছে। স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে আইনের মধ্যে এমন কিছু নেই যে, সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া ‘ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না’ বলে গতকাল মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি।
এই বক্তব্যের পর গতকাল ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটি শিরোধার্য। এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না।’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে শিরোধার্য আখ্যা দেওয়ায় ইসির জ্যেষ্ঠ সচিবের সমালোচনা করছে বিরোধী দলগুলো। সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যের পর স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ থেকে সরে আসাকে নির্বাচন কমিশনের নতজানু আচরণ বলছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনতা দিলেও তারা যে আসলে সরকারের অধীনে– তা বোঝা যাচ্ছে। সংবিধানে বলা হয়েছে, ইসি আইন অনুযায়ী নির্বাচন করবে। আইনে কোথাও বলা নেই, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করতে ইসিকে সরকারের সম্মতি নিতে হবে। কিন্তু মন্ত্রীদের বক্তৃতা শুনে যে ইসি নিজের অবস্থানে ঠিক থাকতে পারে না; তারা সুষ্ঠু নির্বাচন কতটা করতে পারবে– তা এখনই বোঝা যাচ্ছে।
ইসির ভূমিকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এনসিপি। এক বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘শিরোধার্য’ মেনে ইসি সচিবের চুপসে যাওয়া প্রমাণ করে, কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রভাব ও চাপে পড়ে নির্বাচন কমিশন একেক সময় একেক রকম কথা বলে চরম খামখেয়ালিপনা প্রদর্শন করছে, যা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম গ্যারান্টিও ধ্বংস করছে।
সরকারের কাছে তথ্য নিয়েছিল ইসি
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই স্থানীর সরকার বিভাগে ইসি কার্যালয়ের উপসচিব মনির হোসেনের সই করা চিঠিতে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়। আইনের ২৯(৩) ধারা তুলে ধরে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথাও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সীমানা বা ওয়ার্ড বিন্যাস দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়।
শুধু ইউনিয়ন পরিষদই নয়; ইসি পৃথক চিঠিতে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোর বিষয়েও সরকারের কাছে তথ্য চেয়েছিল। জবাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব জিয়াউর রহমান গত ২ আগস্ট ইসির কার্যালয়কে চিঠিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান সুস্পষ্টভাবে চারটি দায়িত্ব দিয়েছে। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং ভোটার তালিকা প্রণয়ন ইসির কাজ। এর বাইরে অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ১১৯ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, যেভাবে আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে, ইসি সেভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২০০৯ সালের আইন রয়েছে। এর ২৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সাধারণ নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে।’ ২০২১ সালে ছয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল। এই হিসেবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে। আইনে কোথাও বলা নেই, নির্বাচন আয়োজনে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।
নির্বাচন আয়োজনে আর্থিক বরাদ্দ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের সহায়তা প্রয়োজন হয় নির্বাচন কমিশনের। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই সহায়তা দেওয়া সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া জুলাই সনদে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো হবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে। বিএনপিও এ প্রস্তাবে একমত ছিল। বরং জামায়াতের অবস্থান ছিল– সংবিধানে এ প্রস্তাব যুক্ত না করে আইনের মাধ্যমে ইসিকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হোক।
জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল আলীম সমকালকে বলেন, নির্বাচন তাড়াতাড়ি হয়ে যাওয়াটা ভালো। সরকার ও ইসির মধ্যে নির্বাচন নিয়ে চিঠি চালাচালি হয়ে থাকলে যোগাযোগ হয়েছেই। যোগাযোগ হওয়ার পর বক্তব্যে এমন দূরত্ব থাকা অনুচিত।
জনপ্রতিনিধিশূন্য, সরকারের আগ্রহ কম
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ আমলের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করেছিল। বিশেষ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
তবে ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের সরায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। যেসব চেয়ারম্যান অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের পরিবর্তে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে সরকার এ পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি ইউপিতে প্রশাসক বসিয়েছে। এদের সবাই সরকারি কর্মকর্তা নন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী কিছু জায়গায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। এ ধারা অনুযায়ী ১২০ দিনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করেছে বিএনপি সরকার। সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সরকারি কর্মচারীরা দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা ও পৌরসভায়।
জামায়াত, এনসিপি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই স্থানীয় নির্বাচন দাবি করছে। বিএনপির অবস্থান ছিল সংসদের পর স্থানীয় নির্বাচন। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকে বিএনপি বারবার জানিয়েছে, শিগগির হবে স্থানীয় নির্বাচন। এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সরকারের মন্ত্রীরা।
তবে সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, বিএনপির এমপিদের উপজেলা এবং পৌর নির্বাচনে আপত্তি রয়েছে। এ কারণে এ দুই স্তরে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়নি। উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনে এমপি অনেকেই উপজেলা ব্যবস্থার বিলোপ চান।
সরকার ও কমিশন যা বলছে
গত সোমবার ইউপি নির্বাচন নিয়ে ইসির প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছিলেন, ১২ নভেম্বর দেশের ৮০টি উপজেলার
সব ইউপির ভোট দিয়ে এ নির্বাচন শুরু হবে। আগামী বছরের ২৭ মে সপ্তম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে ইউপি নির্বাচন শেষ করার ‘প্রাথমিক পরিকল্পনা’ রয়েছে।
তবে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা যে তারিখ ঘোষণা করেছি, তা প্রাথমিক।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সরকারের চিঠি পেয়েছে কিনা– জানতে চাইলে মাছউদ বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
এর আগে সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার-বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটাতে নির্বাচন কমিশনের একক কোনো এখতিয়ারও নেই।
ইসি ঘোষিত সময়সূচিকে কেন্দ্র করে সরকার ও কমিশনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি সংঘাত বা দূরত্ব হিসেবে দেখার কারণ নেই। সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তারিখ এগিয়ে নেওয়া, পিছিয়ে দেওয়া বা পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে।