ঠিকাদার লাপাত্তা, শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ বন্ধ
ডাবুয়া ধর বাড়ি দরগা সড়কে কংক্রিট-বালু দেওয়া হলেও কার্পেটিং বাকি। বর্ষার বৃষ্টিতে সড়কটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা সমকাল
প্রদীপ শীল, রাউজান (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ায় রাউজানে প্রায় শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর (এলজিইডি) বিশেষ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় উপ-ঠিকাদার নিয়োগ করে অর্ধেকের বেশি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছে। তবে অর্ধসমাপ্ত পাঁচটি সড়ক নিয়ে বিপাকে পড়েছে এলজিইডি। এসব সড়কের কোনোটির কার্পেটিং বাকি, কোনোটির কাজ হয়েছে মাত্র ১০-২০ শতাংশ।
এলজিইডি বলছে, পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা ঠিকাদারদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিছু ঠিকাদার উপ-ঠিকাদার নিয়োগ (কাজ বিক্রি) করায় কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেসব ঠিকাদার চূড়ান্ত নোটিশ পেয়ে ফিরছেন না, তাদের চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে। ইতোমধ্যে একটি সড়কের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের চুক্তিপত্র বাতিল করা হয়েছে।
অসমাপ্ত পাঁচ সড়কের মধ্যে একটি দক্ষিণ রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নে ব্রাহ্মণ হাট-পাঁচখাইন সড়ক। ২০২৩ সালে সড়কটি ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় টেন্ডার আহ্বান করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রমিতা কনসেন্ট্রেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছিল। এ সড়কটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ঠিকাদার শওকত হোসেন আত্মগোপনে চলে যান। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য সচিব। উপজেলা প্রকৌশলীর অফিস সূত্র বলছে, চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার পরও সড়কের কাজ শুরু না করায় ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। পুনঃদরপত্র আহবান করা হবে।
হলদিয়া ভিক্ষুভানুপুর সড়কটি ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় কার্যাদেশ পেয়েছিল কাসেম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে যান। পরে ঠিকাদার উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি সারজু মোহাম্মদ নাছেরের সঙ্গে চুক্তিবন্ধ হয়ে উপ-ঠিকাদার হিসেবে সড়কটির কাজ শুরু করেছেন উত্তর জেলা যুবদলের সহসম্পাদক খোরশেদ আলম জিকু। কিন্তু চার মাস ধরে কাজ বন্ধ। কাজের সময় বাড়িয়ে দিলেও কার্পেটিং করছেন না উপ-ঠিকাদার। চলতি মাসে সড়কের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল।
এ প্রসঙ্গে উপ-ঠিকাদার খোরশেদ আলম জিকু বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই অসমাপ্ত কাজ শুরু হবে। পাথর আনা হয়েছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বাজারে একদিকে বিটুমিনের সংকট, অন্যদিকে দাম বাড়ার কারণে এখনও নির্মাণ উপকরণ কিনতে পারিনি। সরকারিভাবে বিটুমিন ক্রয় করার আবেদন করা হয়েছে।’
উপজেলার ডাবুয়া ইউনিয়নের কান্দি পাড় সড়ক নির্মাণকাজের দরপত্র হয় ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে। তাসফিয়া এন্টার প্রাইজ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ পেয়েছিল। কাজটি ২০২৪ সালের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা। ঠিকাদার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন কংক্রিট–বালুর কাজ শেষ করে কার্পেটিংয়ের কাজ ফেলে লাপাত্তা। একই ইউনিয়নের ধর বাড়ি দরগা সড়কের কার্যাদেশ পেয়েছিল বায়েজিদ বোস্তামী এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার আত্মগোপনে থাকা রাউজান পৌরসভার মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ কাজ ফেলে লাপাত্তা। ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় এ সড়কের নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের শুরুর দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা যায়, সড়কটির কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে উপ-ঠিকাদারের মাধ্যমে করা হবে। ইতিমধ্যে আত্মগোপনে থাকা মেয়রের আরও দুটি সড়কের বাকি কাজ শেষ করেছেন উপ-ঠিকাদার বিএনপি নেতা বদিউল আলম। সড়ক দুটি হলো কলমপতি নাগেশ্বর গার্ডেন সড়ক ও ডাবুয়া গণির ঘাট সড়ক।
৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে হলদিয়া ইউনিয়নের রোস্তম শাহা সড়ক নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা। ঠিকাদার যুবলীগ নেতা সালাউদ্দিন লাপাত্তা হওয়ায় উপ-ঠিকাদার নিয়োগ হলেও কাজ শেষ হয়নি। এছাড়া, উপজেলার চিকদাইর আকবর শাহ সড়কের সেনশন-২ এর প্রায় ৫০০ ফুট কাজ অসমাপ্ত রেখে
পালিয়েছেন ঠিকাদার। ৩৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়কটির উন্নয়নকাজ না হওয়ায় মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন সাজ্জাদ অভিযোগ করেন, ঠিকাদার চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করছেন। তিনি ইচ্ছা করে শত শত মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী আবুল কালাম সমকালকে বলেন, ‘এলাকার মানুষের সহযোগিতায় ঠিকাদারের ফেলে যাওয়া অর্ধশত সড়ক, সেতু ও কালভাটের কাজ শেষ হয়েছে। সময় বাড়িয়ে দিয়ে অনেক উপ-ঠিকাদারকে কাজ করতে সহযোগিতা করেছি। বাকি ৫/৬টির কাজ চলমান আছে। বিটুমিন সংকট ও নির্মাণ সামহ্গ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণেও কাজে ধীরগতি হচ্ছে। তবে বর্ষার মৌসুম আসার আগেই বাকি সড়কের কাজ শেষ হবে।’
- বিষয় :
- সড়ক
