ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রেরণা

প্রযুক্তির বিস্তার ও অদেখা শক্তির প্রভাব

প্রযুক্তির বিস্তার ও অদেখা শক্তির প্রভাব
×

প্রযুক্তির বিস্তার আমাদের দূরত্ব কমিয়ে আনলেও অনুভবের গভীরতা বাড়ায়নি... ছবি : সাহস

এম এম মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৬:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন সাফল্যের প্রচলিত সূত্রগুলো নীরবে ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একসময় বিশ্বাস করা হতো; যার বুদ্ধ্যঙ্ক বা আইকিউ বেশি, পরীক্ষার ফলাফল যার উজ্জ্বল এবং যার ডিগ্রি দামি, তার পথই সবচেয়ে প্রশস্ত। এমনকি নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির কেন্দ্রে ছিল মেধার এই দৃশ্যমান পরিমাপ। বাস্তব জীবন বারবার প্রমাণ করেছে যে, এই হিসাব অসম্পূর্ণ। সমান যোগ্যতার দুজন মানুষের জীবন কেন ভিন্ন পরিণতির দিকে যায়? কেন কেউ সামান্য চাপে ভেঙে পড়েন, আবার কেউ একই পরিস্থিতিতে স্থির থাকেন?

বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা 
এই বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে এক গভীর অথচ অদৃশ্য শক্তির মুখোমুখি হই, যার নাম ‘আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা’ বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। এটি এমন এক সক্ষমতা, যা শুধু চিন্তাশক্তিকে শানিত করে না; বরং মানুষকে শেখায় কীভাবে অনুভব করতে হয়, কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে অন্যকে বুঝতে হয় এবং সংকটের মধ্যেও কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। এ সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গোলম্যান বলেন, ‘আইকিউ আপনাকে সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাই আপনাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়।’ 

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলগত শক্তি
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা কেবল কোনো অলংকারধর্মী গুণ নয়; এটি একটি কৌশলগত শক্তি। এটি মানুষের বিচারবোধকে গভীর করে, আচরণে সংযম আনে, যোগাযোগকে অর্থবহ করে এবং নেতৃত্বকে দেয় এক মানবিক ভিত্তি। যে ব্যক্তি নিজের আবেগকে চিনতে পারেন, তিনি অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থির থাকতে পারেন; যিনি অন্যের অনুভূতি উপলব্ধি করেন, তিনি সম্পর্ককে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। যিনি নিজের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, তিনি হয়ে ওঠেন আস্থার প্রতীক।
নিজের ভেতরের জগৎ সম্পর্কে জানা
এই সক্ষমতার শুরু ‘আত্মসচেতনতা’ থেকে। আমরা বাইরের পৃথিবীকে জানতে যতটা আগ্রহী, নিজের ভেতরের জগৎ সম্পর্কে ততটা নই। অথচ ভেতরের মানচিত্র না জেনে বাইরের পথচলা কখনোই ফলপ্রসূ হয় না। এই আত্মপরিচয়ের অভাব বা অসহিষ্ণুতা একটি সঠিক সিদ্ধান্তকে দুর্বল করে এবং একটি মধুর সম্পর্ককে করে তোলে ভঙ্গুর। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে প্রাচীন সেই দার্শনিক আহ্বান–‘নিজেকে জানো।’ 

চাপ ও চ্যালেঞ্জ
এরপর আসে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’, যেখানে মানুষের প্রকৃত শক্তির প্রকাশ ঘটে। প্রাত্যহিক জীবন নানা চাপ ও চ্যালেঞ্জে পূর্ণ। কর্মক্ষেত্রের জটিলতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা–এসবের মুখে মানুষের প্রতিক্রিয়াই তার প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করে।

অনুভবের গভীরতা
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার তৃতীয় স্তম্ভ ‘সহমর্মিতা’। প্রযুক্তির বিস্তার আমাদের দূরত্ব কমিয়ে আনলেও অনুভবের গভীরতা সবসময় বাড়ায়নি। আমরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শিখেছি, কিন্তু মন দিয়ে শুনতে শিখিনি। আমাদের ধৈর্যের প্রবল ঘাটতি পরতে পরতে দৃশ্যমান। এই ঘাটতি পূরণ করে সহমর্মিতা; যা মানুষকে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতা দেয়। 
সামাজিক দক্ষতা
এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত চতুর্থ ধাপ ‘সামাজিক দক্ষতা’, যা এই প্রভাবের মূল ভিত্তি। একটি সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরির সামর্থ্য কেবল ক্ষমতা থেকে আসে না; বরং এটি আসে মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা থেকে; যিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারেন, দ্বন্দ্বে সেতুবন্ধ গড়তে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে প্রভাবশালী। 

আবেগ সামলাতে না পারার অদক্ষতা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনার তাৎপর্য অনেক গভীর। আমরা দীর্ঘদিন ফলাফলকে বা জিপিএ-কে গুরুত্ব দিয়েছি, কিন্তু আবেগীয় সক্ষমতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিইনি। অথচ সমাজের বহু সমস্যার মূলে রয়েছে আবেগ সামলাতে না পারার অদক্ষতা। এখন সময় এসেছে ‘আবেগীয় সাক্ষরতা’ বা ইমোশনাল লিটারেসিকে গুরুত্ব দেওয়ার, যেখানে মানুষ কেবল জানবে না, বরং গভীরভাবে অনুভব করতে শিখবে। আমরা কী অর্জন করেছি, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আমরা মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছি। 

লেখক: ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক

আরও পড়ুন

×