আনাসের লেখা চিঠির নেপথ্য গল্প
শহীদ শাহারিয়ার খান আনাস
ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর বড় পরিবর্তনের গায়ে লেপ্টে আছে তারুণ্যের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ২০২৪ সালে বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখেছে এই দেশের তরুণরাই। তাদেরই একজন শহীদ শাহারিয়ার খান আনাস। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার অতি সাধারণ এক কিশোরের অসাধারণ হয়ে ওঠা এবং তার লেখা আলোচিত চিঠিটি ধরে আমরা কথা বলেছি আনাসের বাবা-মায়ের সঙ্গে। দুঃসাহসী আনাসের আলোচিত সেই চিঠি ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া দিনের কথা তুলে এনেছেন ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র
৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্ট! সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঠিক সেই সময়, খাতার ভেতরে গুঁজে রাখা হচ্ছিল একটা কাগজ। কাগজে পরম যত্নে কিছু ভুল বানানে লেখা আকুতি, ক্ষমাপ্রার্থনা, আর এক কিশোরের অটল বিশ্বাস! কে জানতো এই চিঠিটি হয়ে উঠবে গোটা জাতির বিদীর্ণ প্রতীক; দেশপ্রেমের এক অনবদ্য দলিল! চিঠিটি লিখেছিল শহীদ শাহারিয়ার খান আনাস।
সাধারণ এক কিশোরের অসাধারণ হয়ে ওঠা
২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর জন্ম নেওয়া আনাস ছিল পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার অতি সাধারণ এক কিশোর। গেন্ডারিয়া আদর্শ একাডেমির বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা-মায়ের বড় ছেলে। ছোট দুই ভাই সাফওয়ান ও সুফিয়ানের কাছে সে ছিল অনুকরণীয় একজন। প্রতিবেশীরা তাকে চিনতেন শান্ত, ভদ্র আর হাসিখুশি ছেলে হিসেবে। শিক্ষকরা জানতেন মনোযোগী শিক্ষার্থী হিসেবে। বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার ইচ্ছা ছিল আনাসের। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে ছিল অদম্য কৌতূহল।

অন্য এক কিশোর
২০২৪ সালের জুলাই তাকে জাগিয়ে তুলে অন্য এক কিশোর হিসেবে। আন্দোলনের প্রতিটি খবর সে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখত। সংবাদপত্র পড়ত, সামাজিক মাধ্যমে চোখ রাখত, শহীদ ও আহতদের খবর তাকে অস্থির করে তুলত। বাইরে থেকে যতটা নীরব ছিল, ভেতরে ততটাই তোলপাড় চলছিল তার। বাবাকে বারবার বলছিল আন্দোলনে নিয়ে যেতে। বাবা নিয়ে যাননি। অনুমতিও দেননি। সন্তান হারানোর ভয়ে। অথচ! এখন বাবা কাঁদে আন্দোলনে নিয়ে যেতে না পারায়। মাফ চান শহীদ সন্তানের কাছে।
কেবল চিঠিই নয়...
শুধু এক চিঠিতেই নয়; খাতার পর খাতাজুড়ে লিখে রেখেছিল নিজের অনুভূতি, নিজের প্রশ্ন, নিজের ক্ষোভ। বাবা-মা জানতেন না, তাঁদের ছেলের মন আন্দোলনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কি ঠিক? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যদি আজ কেউ না দাঁড়ায়, ভাইদের হত্যার মুখে যদি না দাঁড়ায় তাহলে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে? কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত মানুষ একাই নেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ভোরে আনাস নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। বের হওয়ার আগে একটি চিঠি লিখে রেখে যায়। চিঠির প্রতিটি শব্দে ছিল দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ, পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং গভীর দেশপ্রেম।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে
সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় আনাস। সে প্রথমে যায় তাঁতীবাজারে। সেখানে কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় হয়। একজন তার বড় ব্যাগ দেখে অবাক হয়ে জানতে চান, ‘এত বড় ব্যাগ কেন?’ আনাস মৃদু হেসে উত্তর দেয়, ‘বাসায় ফিরে গেলে আর বের হতে দেবে না। তাই কাপড় নিয়েছি। যদি কারও বাসায় থাকতে পারি, তাহলে আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় থাকব।’ তার কাছে আন্দোলনের শেষ মানেই ছিল স্বৈরশাসক হাসিনার পতন।
মানুষের ছুটে চলা আর তার থেমে যাওয়া
পরে যায় চানখাঁরপুলে। চারদিকে টিয়ার গ্যাস শেলের ধোঁয়া, রাবার বুলেটের শব্দ, মানুষের ছুটে চলা। একপর্যায়ে একটি রাবার বুলেট তার শরীরে আঘাত করলেও সে পিছু হটেনি। দুপুরের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পুলিশ বাহিনী নবাব কাটারার একটি সরু গলির দিকে অগ্রসর হয়। যেখানে ছিল আনাস। আন্দোলনকারী অন্যরা আশপাশের বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, একটু দূরে নিরাপদ দূরত্বে পারলেও আনাস আর সেখান থেকে বের হতে পারেনি। এক দোকানের শাটারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সে। প্রথম গুলিটি লাগে শাটারে। পরের গুলিটি বিদ্ধ করে তার বুক। দুই হাত দিয়ে বুক চেপে কয়েক কদম এগিয়েই রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে আনাস, থরথর করে কাঁপতে থাকে তার শহীদি দেহ। চারপাশের মানুষ ছুটে আসে। একদিকে জোহরের আজান, অন্যদিকে রিকশায় করে কয়েকজন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তার হৃদস্পন্দন।
মায়ের ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল
দুপুরে আনাসের মায়ের ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ‘আপনাদের কেউ কি আন্দোলনে গিয়েছিল?’ মা উত্তর দেন, ‘আমার ছেলে সকাল থেকে বাসার বাইরে।’ ওপাশ থেকে শুধু বলা হয়, ‘দ্রুত মিটফোর্ড হাসপাতালে আসুন।’ হাসপাতালে পৌঁছে বাবা-মা দেখেন, তাঁদের আদরের ছেলে নিথর হয়ে শুয়ে আছে। অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া যায়নি। রিকশায় করেই ছেলেকে বাড়ি নিয়ে আসেন তাঁরা। পরে জুরাইন কবরস্থানে দাদির কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় আনাসকে। যে দাদিকে কিছুদিন আগেই নিজ হাতে দাফন করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই দাদির কবরেই অন্তিম ঠিকানা হয় তার।

বাবা-মায়ের চাওয়া
শহীদ আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তির কাছে জানতে চাইলাম সেদিনের কথা। তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের এই দিনগুলোতে যেসব শহীদ সন্তানের জন্য কেঁদেছি, দোয়া করেছি, কখনও ভাবিনি–মাত্র দুদিন পর আমার নিজের সন্তানের রক্তও সেই শহীদদের সারিতে শামিল হবে। তবুও যারা বর্তমানে নানান প্রেক্ষাপট তৈরি করে এই আত্মত্যাগকে ভুলিয়ে দিতে চায়, তাদের বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম। তিনিই সর্বোত্তম বিচারক!’
শহীদ আনাসের//// বাবা শাহারিয়ার খান পলাশ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগ যেন কখনও বিস্মৃত না হয়। জুলাই সনদ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। শহীদ পরিবার ও আহতদের মর্যাদা ও প্রাপ্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক। আর আনাসের চিঠিটি পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলামে পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এটাই আমার চাওয়া।’
আমরাও চাই, আনাসরা জাগ্রত থাকুক লাল-সবুজের ইতিহাসে!
- বিষয় :
- শহীদ