র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৬
ছোট উদ্যোগ থেকে বড় সাফল্য
তরুণ উদ্যাক্তাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন রুনা খান ছবি: ফ্রেন্ডশিপের সৌজন্যে
জিলফুল মুরাদ
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
৩১ আগস্ট ঘোষণা করা হয়েছে এশিয়ার নোবেলখ্যাত ৬৮তম র্যামন মন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৬। এবার এই পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। দুর্গম চর ও নদীবেষ্টিত এলাকার প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দিতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফ্রেন্ডশিপ নামের একটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। লিখেছেন লিখেছেন জিলফুল মুরাদ
৩১ আগস্ট ঘোষণা করা হয় এশিয়ার নোবেলখ্যাত ৬৮তম র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৬। এবার এই পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। দুর্গম চর ও নদীবেষ্টিত এলাকার প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দিতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছে তাঁর উদ্যোগ–ফ্রেন্ডশিপ। এ বছর রুনা খানের সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তি এ পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁরা হলেন সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক, আইনজীবী, অধ্যাপক ও লেখক টমি কোহ ও মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী, সাবেক রাজনৈতিক বন্দি বো চি। ২০০২ সালে একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যাত্রা শুরু ফ্রেন্ডশিপের। শুরু থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা, জীবিকা, নাগরিক অধিকারসহ নানান ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে ফ্রেন্ডশিপ।
র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার
র্যামন ম্যাগসাইসাই ছিলেন ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক মর্মান্তিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মারা যান। একই বছর র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে তাঁর নামে এ পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ৩১ আগস্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিন। প্রতি বছরের ৩১ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের এমন কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, যা র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিরস্থায়ী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়।
প্রশ্ন থেকে যে উদ্যোগের যাত্রা
কখনও কখনও একটি বড় প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় খুব ছোট একটি প্রশ্ন থেকে। কেন কেউ চিকিৎসা পাবে, আর কেউ পাবে না? কেন একটি শিশুর জন্মস্থান তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে? কেন নদীভাঙন, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বা দারিদ্র্যের কারণে একজন মানুষ চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? প্রায় ২৫ বছর আগে বাংলাদেশের চরাঞ্চলে গিয়ে রুনা খান এমনই কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই প্রশ্ন থেকে শুরু হয়েছিল ফ্রেন্ডশিপের যাত্রা।
শুরুর গল্পটা সহজ ছিল না। বরং শুরু থেকে ছিল অবিশ্বাস, সংশয় এবং একের পর এক বাস্তব চ্যালেঞ্জ। একটি জাহাজে হাসপাতাল হবে, সেখানে অপারেশন থিয়েটার থাকবে, চিকিৎসকরা দুর্গম চরাঞ্চলে গিয়ে সেবা দেবেন তখন অনেকের কাছে ধারণাটি ছিল প্রায় অসম্ভব। অর্থ কোথা থেকে আসবে, দক্ষ জনবল কীভাবে পাওয়া যাবে, অনিশ্চিত নদীপথে সেবা কীভাবে নিয়মিত রাখা যাবে, এমন প্রশ্ন ছিল অসংখ্য। কিন্তু রুনা খান শুরু থেকে একটি বিষয় বিশ্বাস করতেন, কাজের আগে বিশ্বাস চাইতে হয় না, কাজের ফল বিশ্বাস তৈরি করে। তাঁর ভাষায়, মানুষকে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে বোঝানোর চেয়ে কাজ করে দেখানো অনেক বেশি শক্তিশালী।
তারুণ্যের শক্তি
এই ২৫ বছরের যাত্রায় তরুণরা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফ্রেন্ডশিপের উন্নয়নদর্শনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে থেকে গিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়; বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে তারা নিজেরা নিজেদের সমাজের পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। ফ্রেন্ডশিপের হাত ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য তরুণ-তরুণী, শিক্ষক, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, প্যারালিগ্যাল, দুর্যোগ স্বেচ্ছাসেবক, কারিগরি কর্মী, উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকায় উঠে এসেছে। কেউ নিজের জীবনের পথ বদলেছে, কেউ আবার পুরো কমিউনিটিতে নতুন পথ তৈরি করেছে। এই পথ যিনি দেখিয়েছেন তিনি রুনা খান। রাজ্যের স্বপ্ন নিয়ে ছোট্ট একটি উদ্যোগ শুরু করেছিলেন আজ থেকে ২৫ বছর আগে। সে স্বপ্ন দিনে দিনে বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে! রুনা খানের কাছে তরুণদের জন্য উন্নয়ন মানে শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়। বরং তাদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া, যেখান থেকে তারা নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্মাণ করতে পারে। শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত নয়, নেতৃত্ব দেওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার, সমস্যা চিহ্নিত করার এবং সমাধান তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলা।
যেসব কাজ করে ফ্রেন্ডশিপ
ফ্রেন্ডশিপের দীর্ঘ যাত্রায় তরুণদের জন্য মোটা দাগে যে কাজগুলো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি, কমিউনিটি স্বাস্থ্য, দুর্যোগ প্রস্তুতি, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশ। সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব কার্যক্রমে তরুণদের শুধু উপকারভোগী হিসেবে দেখা হয়নি; বরং পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রুনা খান বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ মানে অক্ষম নয়। বরং সমাজ যাদের পিছিয়ে পড়া বলে, তাদের মধ্যে অনেক সময় অসাধারণ জ্ঞান, শৃঙ্খলা, উদ্ভাবন এবং নেতৃত্বের গুণ থাকে। সুযোগের অভাব তাদের পিছিয়ে রাখে। তাই উন্নয়নের কাজ হওয়া উচিত মানুষের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, মানুষের সঙ্গে সিদ্ধান্ত তৈরি করা।’
কর্মসংস্থানের নতুন বাস্তবতা
বর্তমানে তরুণদের নিয়ে ফ্রেন্ডশিপের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, কর্মসংস্থানের নতুন বাস্তবতা এবং সামাজিক বৈষম্য একসঙ্গে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মকে শুধু প্রস্তুত কর্মী নয়, বরং চিন্তাশীল, উদ্ভাবনী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। আগামীতে তরুণদের জন্য ফ্রেন্ডশিপের স্বপ্ন আরও বড়। রুনা খান চান, তরুণরা যেন নিজেদের কমিউনিটির সমস্যাকে গভীরভাবে বুঝতে শেখে, স্থানীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে সমাধান তৈরি করে এবং সেই সমাধান অন্য এলাকাতেও প্রয়োগযোগ্য করে তোলে। একই সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ ২৫ বছরের মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সাফল্য ও ব্যর্থতা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়।
তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি
তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি তাঁর বার্তাও খুব সরল, কিন্তু গভীর। রুনা খান বলেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে তাদের উদ্ধার করতে যাচ্ছি এমন মানসিকতা নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। আগে শুনতে হবে, বুঝতে হবে এবং সম্মান করতে হবে। কারণ যার জন্য সমাধান তৈরি করা হচ্ছে, সেই মানুষের কাছে অনেক সময় সেই সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর জ্ঞান থাকে।’
আগামীর স্বপ্ন
ফ্রেন্ডশিপের আগামী দিনের স্বপ্ন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নয়। বরং ২৫ বছরে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ এবং কার্যকর পদ্ধতিগুলো আরও বহু মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং দেশের কাজে লাগানো। রুনা খান বলেন, ‘কোনো উন্নয়ন সংস্থা রাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। একটি সংগঠনের দায়িত্ব হলো যেখানে ঘাটতি আছে সেখানে কাজ করা, কীভাবে কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায় তা দেখানো, মানুষকে সক্ষম করা এবং সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সংযোগ তৈরি করা।’ শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্ন খুবই মানবিক; একজন শিশু চরাঞ্চলে জন্ম নিল, উপকূলে জন্ম নিল কিংবা ঢাকায় জন্ম নিল, তার ভবিষ্যৎ যেন কেবল জন্মস্থানের ওপর নির্ভর না করে।
ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে তরুণরা
ফ্রেন্ডশিপের ২৫ বছরের গল্প তাই শুধু একটি উন্নয়ন সংস্থার সম্প্রসারণের গল্প নয়। এটি একটি বিশ্বাসেরও গল্প। মানুষকে সুযোগ দিলে, মর্যাদা দিলে এবং দাঁড়ানোর মতো একটি দৃঢ় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিলে, মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বদলে দিতে পারে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তরুণ প্রজন্ম।
লেখক: সিনিয়র ম্যানেজার, জনসংযোগ, ফ্রেন্ডশিপ
- বিষয় :
- সাফল্য অর্জন