যে সমাজ সকলের
বাকস্বাধীনতা খর্ব হতে পারে দুইভাবে
হাসনাত আবদুল হাই
হাসনাত আবদুল হাই, কথাসাহিত্যিক প্রাবন্ধিক
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক পদ্ধতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা পালন করে থাকেন। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা যে সংবিধান প্রণীত হয়, সেখানে অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মধ্যে বাক্স্বাধীনতা অন্যতম। জনগণের বাক্স্বাধীনতার এই সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব এবং ক্ষমতা অর্পিত হয় রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ সরকারের ওপর। দায়িত্বটা সাংবিধানিক এবং এই দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয় আইনের মাধ্যমে।
বাক্স্বাধীনতা খর্ব বা হরণ করা হতে পারে দুইভাবে। প্রথমত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শক্তি প্রদর্শন করে একজন নাগরিককে বা একদল নর-নারীকে তাদের মতপ্রকাশে বাধা দিতে পারে। যেমন– প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে না দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সরকার নিজেই সভা-সমিতি নিষিদ্ধ করে বা গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে। বাক্স্বাধীনতার ওপর সরকারের এই হস্তক্ষেপ নির্বাহী আদেশে হতে পারে কিংবা এই উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন করা হতে পারে। দুটির মধ্যে যেভাবেই হোক, সরকার যখন নিজেই জনগণের বাক্স্বাধীনতা হরণ করে, সেইসব ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়িত্ব অমান্য করা হয় এবং আইনগত ক্ষমতা অপব্যবহার করা হয়। বাক্স্বাধীনতা হরণ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার বিশেষ আইন প্রবর্তন করলে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হলে আদালত সরকারের সেই আইন সাংবিধানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন। সেই জন্য সরকারের এই দায়িত্বহীনতা এবং ক্ষমতার এই অপব্যবহারের প্রতিকারের জন্য ক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উচ্চ বিচারালয়ের শরণাপন্ন হতে পারে। কিন্তু উচ্চ বিচারালয় সরকারের প্রভাবের অধীনে থাকলে প্রতিকার প্রার্থীর আবেদন নাকচ করে দিতে পারে। বিচারালয়ের ওপর সরকারের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে আদালত সরকারের গৃহীত কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রায় দিতে ইতস্তত করে। বাক্স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করলে তা এই কারণে অকার্যকর হয়ে যায়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকার সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং ডিজিটাল মিডিয়ার (সোশ্যাল মিডিয়া) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব বা হরণ করার উদ্দেশ্যে এমন আইন করতে পারে, যার জন্য এইসব মাধ্যমের ‘বাক্স্বাধীনতা’ হুমকির মধ্যে পড়ে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। নির্বাহী আদেশেও খবর ছাপা বা প্রচারের আগে ছাড়পত্র বা প্রি-সেন্সরশিপ প্রয়োগ করে গণমাধ্যমের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব বা হরণ করা হয়ে থাকে। তিনটি দেশের সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করে সরকারের পক্ষ থেকে বাক্স্বাধীনতা খর্ব বা হরণের দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন যে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেল খবর প্রচার বা টক শোতে মন্তব্য করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ তাদের নিবন্ধীকরণ বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাঁর এই ঘোষণার পর ফেডারেল কমিউনিকেশন কাউন্সিল (এফসিসি) থেকে গণমাধ্যমের নিবন্ধীকরণ সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এই সতর্কীকরণ ছিল এতই নগ্ন যে প্রেসিডেন্টের নিজ দলের সিনেটর টেড ক্রুজ এর জন্য এফসিসির চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেন। ধরা যাক ট্রাম্পবিরোধী সমালোচনার জন্য সত্যিই কোনো টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। প্রতিকার প্রার্থনা করে সেই টিভি চ্যানেলের কর্তৃপক্ষ যদি উচ্চ আদালতে মামলা করে, তাহলে মামলার রায় তাদের পক্ষে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর কারণ উচ্চ আদালতের বিচারকগণ নিযুক্ত হোন রাজনৈতিক বিবেচনায়। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট তাঁর দলের সমর্থক, যিনি তাঁকেই উচ্চ আদালতের বিচারকের শূন্য পদে নিয়োগ করেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট হলে উচ্চ আদালতের শূন্য পদে একইভাবে নিয়োগ পান সেই দলের সমর্থক বিচারক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে মেজরিটি বিচারক রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। সুতরাং কোনো টিভি চ্যানেল নিবন্ধীকরণ বাতিলের জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করলে তাঁর রায় বিপক্ষেই যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আমেরিকার সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার পৃথক্করণের ওপর জোর দিলেও বিচারক নিয়োগের পদ্ধতির কারণে বিচার বিভাগের সুপ্রিমেসি সত্ত্বেও কোনো মামলার রায় দিতে গিয়ে বিচারকদের রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে। আমেরিকায় বাক্স্বাধীনতা বিল অফ রাইটস-এর তালিকায় প্রাধান্য পেলেও ক্ষমতার পৃথক্করণ নিশ্চিত না হওয়ায় কার্যত জনগণের সেই স্বাধীনতা ভোগ করা নিশ্চিত হয়ে যায়নি।
আরও বিশদ করে বললে– রাষ্ট্রের যে তিনটি অঙ্গ– সংসদ, বিচারালয় এবং সরকার, এদের মধ্যে ক্ষমতার পৃথক্করণ না থাকলে অপশাসনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়; যার ফলে বাক্স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার থেকে জনগণ বঞ্চিত হতে পারে। অবশ্য এই পৃথক্করণের ফলে সংসদের ওপর সরকারের প্রভাব চলে যাবে না। কেননা, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের সদস্যরাই সরকার গঠন করে এবং সেই সরকারপ্রধানই সংসদে তাদের নেতা হন। আর যদি তিনি সংসদে নেতা নাও হন, যেহেতু দলীয় নেতা হিসেবেই তাঁকে সরকারপ্রধান করা হয়, সেই কারণে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের জন্য সরকারপ্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে একমাত্র উচ্চ বিচারালয়ের স্বাধীনতাই পারে অন্যান্য সাংবিধানিক অধিকারের মতো বাক্স্বাধীনতা ভোগে জনগণকে নিশ্চিতি দিতে। কিন্তু উচ্চ আদালতের এই ভূমিকা ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হয়ে যায় বিচারকদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ফলে পক্ষপাতপূর্ণ রায়ের জন্য।
গণতন্ত্রের মডেল যুক্তরাষ্ট্রে বাক্স্বাধীনতা বা কোনো মতবাদে বিশ্বাসী হওয়ার স্বাধীনতার অভাব প্রমাণিত হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে, যখন বামপন্থি আদর্শের প্রতি অনুগত থাকার অভিযোগে অনেক বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীর জীবিকা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে কারাগারেও যেতে হয়। এখন যেমন, তখনও উচ্চ আদালতের স্বাধীনতার অভাবে আদালতে গিয়ে এর প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের অভিযোগে অনেক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে যারা বিদেশি, তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সরকারের এসব পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ উপায়ে বাক্স্বাধীনতার অধিকার অস্বীকার ও হরণের দৃষ্টান্ত হয়ে প্রমাণ করছে যে মার্কিন জনগণের নির্বাচিত সরকার অর্থাৎ গণতন্ত্র থাকলেও এবং তার সংবিধানে বিল অব রাইটসের মধ্যে বাক্স্বাধীনতা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে বাক্স্বাধীনতা সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও এবং সংবিধানে বাক্স্বাধীনতাসহ বিল অব রাইটস রক্ষার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তালেও প্রকৃতপক্ষে বাক্স্বাধীনতার অধিকার খর্ব অথবা হরণ করা হয়।
ইংল্যান্ডে লিখিত সংবিধান নেই। সে দেশে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় ‘কমন ল’ নামে পরিচিত অতীত থেকে চলে আসা আইনকানুন এবং পার্লামেন্টের প্রবর্তিত আইনের ভিত্তিতে। ১৯৯৮-এর আগে কমন ল অথবা পার্লামেন্টের কোনো আইনে বাক্স্বাধীনতাসহ মানবিক অধিকার সংক্রান্ত কোনো বিধান ছিল না। ১৯৯৮ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হিউম্যান রাইটস মানদণ্ড অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে প্রথম মানবিক অধিকার আইন পাস করা হয়। কিন্তু বাক্স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এই আইনের বিধানের সঙ্গে ১৯৮২ সালের পাবলিক অর্ডার আইনের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। শান্তিভঙ্গের যুক্তিতে পুলিশ এই আইনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও বক্তৃতা নিষিদ্ধ করতে পারে। এর বিরুদ্ধে আদালতে গেলে তারা বড়জোর বলতে পারে যে এই আদেশ হিউম্যান রাইটসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কোর্টের এমন রায় আমলে নিলে পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে আইনটির সংশোধন করতে পারে। তা না করলে আদালতের কিছু বলার নেই। এর কারণ যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্টই সার্বভৌম, আদালত তার ওপরে নয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত পার্লামেন্ট এবং সরকার (পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের গঠিত) থাকলেও সে দেশে শান্তি- শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যে আইন (১৯৮২) রয়েছে তার প্রয়োগ করে বাক্স্বাধীনতা খর্ব বা নিষেধের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। অতি সম্প্রতি লন্ডনের রাস্তায় গাজায় জেনোসাইড-বিরোধী বিক্ষোভ সভা নিয়মিত হয়ে যাওয়ার পর লেবার সরকার পুলিশকে ১৯৮২-এর আইনের অধীনে বাড়তি ক্ষমতা দিয়ে একই স্থানে একই ধরনের বিক্ষোভ সভা অনুষ্ঠান নিষেধের ক্ষমতা দিয়েছে। এর ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতপ্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে বিক্ষুব্ধ জনগণ। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাত দিয়ে নির্ধারিত স্থানে একই দাবি নিয়ে বারবার সভা-মিছিল নিষিদ্ধ করার পেছনে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে তা বেশ স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ড গণতন্ত্রের দেশ। সেখানে জাতীয় সংসদে (কংগ্রেস ও পার্লামেন্ট) এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অবাধ, মুক্ত এবং নিরপেক্ষভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গণতন্ত্রের এটি অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্র সত্ত্বেও বাক্স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা ও রেকর্ড দৃষ্টান্তমূলক বলা যায় না। সুতরাং গণতন্ত্র হলেই বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, এ কথা বলার উপায় নেই। এই পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে, সেই প্রসঙ্গে আসার আগে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার কথা বলা দরকার। কেননা, এই দৃষ্টান্ত ভিন্ন এক রাজনীতির প্রেক্ষিত নিয়ে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির নাম রাখা হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’, ইংরেজিতে ‘পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’। ‘গণ’ কথাটির দ্বারা গণতন্ত্রের কথাই বলা হয়েছে, যার সর্বোত্তম সংজ্ঞা আব্রাহাম লিংকনের অমর বাক্য– ‘অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল’। কিন্তু গণতন্ত্রের যে প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত অবাধ ও মুক্ত নির্বাচন, তা বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকেই অচরিতার্থ থেকেছে। ১৯৭৫-এর মাঝামাঝি এসে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ওপর যবনিকাপাত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় একদলীয় শাসন। মিডিয়া এবং বিরোধী দলের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যা কিছু ছিল একদলীয় শাসনে তার অবসান ঘটে। এরপর উপর্যুপরি যে সামরিক শাসন আসে তাদের অধীনে বাক্স্বাধীনতা প্রথমে বিলুপ্ত এবং পরে নিয়ন্ত্রিত করা হয়। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের শাসনকালে মিডিয়া এবং বিরোধী দল ও নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের সরকার-সমালোচনা যুক্তিসংগত পর্যায়ে ছিল বলা যায়। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের বেশি সময়কালে বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেতে পেতে শেষ পর্যায়ে রহিত হয়ে যায়। এই সময়ে টেলিভিশন চ্যানেল থেকে একাধিক পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ হয় এবং বেশ কয়েকজন সম্পাদক-সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তা দেখে সরকার এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল আইন প্রবর্তন করে। সরকারের সামান্যতম সমালোচনার দায়ে এই আইনে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জামিন না দিয়ে জেলে রাখা হয়। একজন অভিযুক্ত কার্টুনিস্ট জেলেই মারা যান।
কী নির্বাচনের মাপকাঠিতে, কী অন্য বিবেচনায় শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন ছিল নির্ভেজাল স্বৈরাচারের। এই স্বৈরাচারে স্বাধীন, অবাধ ও অংশীদারমূলক নির্বাচনের অভাবে গণতন্ত্র যেমন বিলুপ্ত হয়েছে, অন্যান্য অধিকারের সঙ্গে বাক্স্বাধীনতাও হারিয়েছে জনগণ।
তিনটি দেশের দৃষ্টান্তের মধ্যে দুটি উন্নত দেশে দেখা যাচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র নিশ্চিত করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বাক্স্বাধীনতা বেশ সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের স্থানে স্বৈরাচারী শাসনে বাক্স্বাধীনতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতে দেখা গেছে। সুতরাং সহজেই এই উপসংহারে আসা যায় যে বাক্স্বাধীনতা সব পদ্ধতির সরকারেই বিপন্ন হতে পারে। এর আনুষঙ্গিক একটি উপসংহার হলো গণতন্ত্র বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। স্বাধীন ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে, তা বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করেনি। এই পরিস্থিতি নিরসনে বা প্রতিহতকরণে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা চিন্তা করা যায়। প্রথমত দেশের সংবিধানে নিশ্চিতি দিতে হবে নিঃশর্ত বাক্স্বাধীনতার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় এটাই যথেষ্ট নয়। এই অধিকার যেন জনগণ ভোগ করতে পারে তার জন্য দ্বিতীয়ত প্রয়োজন স্বাধীন আদালত, যেখানে বাক্স্বাধীনতা ব্যবহারে বাধাপ্রাপ্ত ক্ষুব্ধ মানুষ বা প্রতিষ্ঠান প্রতিকার প্রার্থনা করে মামলা করতে পারে। এটা নিশ্চিত করতে হলে আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য বিচারকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রণয়নে জাতীয় সংসদ (কংগ্রেস, পার্লামেন্ট ইত্যাদি) সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে কিন্তু সেই আইনের ব্যাখ্যার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকতে হবে উচ্চ আদালতের। বাক্স্বাধীনতা সংক্রান্ত আদালতের রায় বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক হতে হবে। চতুর্থত, যেহেতু গণতান্ত্রিক সরকারের তুলনায় স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয় সবচেয়ে বেশি, সেই জন্য স্বৈরাচার যেন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে তা নিশ্চিত করতে কোনো রাজনৈতিক দলকে পরপর দু’বারের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বিধান সংবিধানে রাখতে হবে।
বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সর্বশেষ পদক্ষেপ হবে জনগণের ‘চিরজাগ্রত প্রহরা’, যা সরকারের কার্যক্রমের বিশ্লেষণ করে দেখবে সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণের উদ্দেশ্যে সেসব বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা। এই উদ্দেশ্যে সরকারের গৃহীত সব পদক্ষেপ বা কর্মপদ্ধতিও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
গণতন্ত্র বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। কিন্তু বাক্স্বাধীনতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই রাখতে সাহায্য করে। যেসব সরকার বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না তারা গণতন্ত্রের আদর্শ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আগ্রহী নয়, এই উপসংহারে না এসে উপায় থাকে না। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়ে। বাক্স্বাধীনতায় সরকারের সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা, নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞাই এই বিষয়ের আলোচনায় প্রাধান্য পায়। কিন্তু বাক্স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ কখনও কখনও রাজনৈতিক কিংবা অন্য সংগঠনের পক্ষ থেকেও করা হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগের প্রতিবাদ করেছে সম্পাদক পরিষদ। এক বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি সব পক্ষকে তথ্যভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্পাদক পরিষদ উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’ উপলক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবশক্তি’ আয়োজিত ‘জাতীয় যুব সম্মেলন ২০২৫’-এ গণমাধ্যম সম্পর্কে ঢালাওভাবে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগ তোলা হয়েছে। সম্মেলনে অভিযোগ আনা হয়েছে ‘গণমাধ্যম গণঅভ্যুত্থানে জড়িতদের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে’ এবং শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আমলের মতো ‘গোয়েন্দা সংস্থার মুখপত্র’ হিসেবে কাজ করছে। সম্পাদক পরিষদ এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বরং গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লালন করেছে। বিশেষ করে অধিকাংশ মুদ্রণ গণমাধ্যম নির্ভীকভাবে তথ্য তুলে ধরে গণঅভ্যুথানের পক্ষে জনমত গঠনে বিশেষ অবদান রেখেছে এবং একই সঙ্গে অনেক ভয়ভীতির মধ্যে কাজ করেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বেশির ভাগ মুদ্রণ গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সমুন্নত রাখা ও সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখছে। (প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট)। অন্য একটি পত্রিকায় বলা হয়েছে, সম্প্রতি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। নোয়াবের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে গণমাধ্যম ও তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা দুঃখজনক। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা নিয়ে দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, সেখানে মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত এক বছরে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। টিআইবির প্রতিবেদনে আমরা দেখছি, গত এক বছরে (আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫) ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। কমপক্ষে ২৪ জন গণমাধ্যমকর্মীকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে, আটটি সম্পাদকপত্রের সম্পাদক এবং ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাপ্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অবাধ ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ দরকার জানিয়ে নোয়াব বলছে, কোনো সংবাদপত্র কিংবা গণমাধ্যমে ‘মব’ সৃষ্টি করে মালিকপক্ষকে হুমকি, ভয়ভীতি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। (বণিক বার্তা, আগস্ট ৮) বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় সেই গণমাধ্যম কেবল সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিপন্ন হয় না। তার ওপর হস্তক্ষেপ বা কার্যক্রমে অন্তরায় সৃষ্টি হতে পারে সিভিল সোসাইটি বা বিভিন্ন স্বার্থভিত্তিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় সরকারের ওপর।
- বিষয় :
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- বাকস্বাধীনতা
- গণতন্ত্র