ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ছায়ানট-শিল্পকলার আয়োজন

লোকগানের সুরে আব্বাসউদ্দীন আহমদকে ফিরে দেখা

লোকগানের সুরে আব্বাসউদ্দীন আহমদকে ফিরে দেখা
×
×

ছবি: দ্রোহী তারা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:৩৪

‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ কিংবা ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’– গানের সুরে ও আবেগে ভিন্নতা থাকলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠের স্মৃতি। নদী, জনপদ, বিরহ ও বৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় মাটির মানুষের অনুভূতিকে গানে ধারণ করা এই শিল্পীর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বসে দুটি স্মরণ আয়োজন।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছায়ানট মিলনায়তনে ছিল বিশেষ শ্রোতার আসর। অন্যদিকে, সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনেও ছিল আব্বাসউদ্দীন আহমদ স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠান।

শিল্পী-শ্রোতাদের আলোচনায় উঠে আসে উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়াসহ লোকসংগীতকে গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী গান জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে আব্বাসউদ্দীনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা।

ছায়ানটের আসরে ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, ‘আব্বাসউদ্দীন আহমদের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে, সমৃদ্ধ লোকগীতিকে বাংলার নাগরিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাঁর গাওয়া অনেক গান কয়েক দশক পরও জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। সময়ের পরিবর্তনেও এসব গানের আবেদন অটুট থাকা শিল্পীর কাজের ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দেয়।’

নজরুলের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আব্বাসউদ্দীনের অনুপ্রেরণা ও বারবার তাগিদে নজরুল অনেক ইসলামী গান রচনা করেন। ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ গানটি রচনার পেছনেও আব্বাসউদ্দীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ গানটি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।” সারওয়ার আলীর মতে, লোকগীতিকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন আব্বাসউদ্দীন।

কথার পর গানের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় ছায়ানটের আয়োজন। প্রিয়ন্তু দেবের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে’ ও ‘বসিয়া নদীকূলে, এলোচুলে কে উদাসিনী’ গান দুটি দিয়ে শুরু হয় পরিবেশনা। সুমন মজুমদার গেয়ে শোনান ‘খাতুনে-জান্নাত ফাতেমা জননী’, ‘তোমার আকাশে উঠেছিল চাঁদ’ ও ‘সাধ জাগে মনে পর-জীবনে’।

মোছা. শরিফা খাতুনের পরিবেশনায় ছিল ‘ফাঁদে পড়িয়া বগা’ ও আবদুল করিমের লেখা ‘ও কি একবার আসিয়া’। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস পরিবেশন করেন ‘আমায় এত রাতে ক্যানে ডাক দিলি’, ‘গুরুর পদে প্রেম ভক্তি হলো না মন’ ও ‘আমার হাড় কালা করলাম রে’।

মো. আবুল কালাম আজাদ গেয়ে শোনান ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে’, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘আবো নওদারিটা মরিয়া’। চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে ছিল জসীম উদ্‌দীনের ‘প্রাণ সখী রে’, নজরুলের লেখা ও আব্বাসউদ্দীনের সুর করা ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা’ এবং ‘ওই না মাধবী বনেতে’।

শেষ পর্বে কিরণ চন্দ্র রায় পরিবেশন করেন ‘ও পরানের মাঝি’, ‘কোনবা রঙে বাইন্ধাছো ঘরখানি’ ও ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’।

পরিকল্পনায় ভাওয়াইয়া গানের উৎসব    

অন্যদিকে, শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে আব্বাসউদ্দীনের সংগীতজীবনের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে কথা বলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।     

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি জানান, আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের পাশাপাশি তাঁর ভাওয়াইয়া গান নিয়ে কয়েক দিনব্যাপী উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীরা অংশ নেবেন।

দেশের অন্যান্য সংগীতধারার প্রসারের পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বাউল ও লালন উৎসবের পাশাপাশি হাসন উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ রয়েছে।’ কুষ্টিয়ায় লালন উৎসব আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। যাত্রা ও সার্কাসকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে পরিবারসহ দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। মুখ্য আলোচক ছিলেন সংগীতশিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হারুন-অর-রশীদ।

সভাপতির বক্তব্যে হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘গ্রামীণ জনপদের পরিচিত আবেগকে সংগীতের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন। ভাওয়াইয়া সুরে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনধারাকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন, যা ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।’

শিল্পকলা একাডেমির সংগীতপর্বে শুরুতেই রেজাউল করিম লিমন পরিবেশন করেন ‘প্রাণ সখীরে, ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’ ও ‘পরের অধীন কইরাছে আমায়’। এর পর নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন রাহাত আরা গীতি। নোশীন লায়লার কণ্ঠে শোনা যায় ‘সে যেন কী করলো রে আমায়’ ও ‘আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি’। সালাউদ্দিন আহমদ পরিবেশন করেন ‘ভুলে যেও ভুলে যেও’ ও ‘কুঁচবরণ কন্যারে তোর মেঘবরণ কেশ’।

মুখ্য আলোচক অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল গেয়ে শোনান ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমির শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ও ‘বাওকুমটা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে’।

আরও পড়ুন

×